২৩ আগস্ট ২০২৬, ১৩:৫৫

সিদ্ধার্থের ভাইয়ের খেলার সঙ্গী ছিল, এই পরিচয়ই ছোট্ট প্রিয়মের জীবনের কাল হলো

গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তান  © টিডিসি সম্পাদিত

রংপুর জিলা স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তান হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ নামের যুবককে আটক করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। রোববার ভোর ৫টা পর্যন্ত নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকা থেকে তাদের আটক করা হয়। প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে, তাদের বাড়ি একই এলাকায়। হত্যাকাণ্ডের পর ওই ভবনে বসে তাদের ইয়াবা সেবনের আলামত পাওয়া গেছে।

এদিকে ঘটনায় ১২ বছর বয়সী আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মকেও হত্যার জন্য বেছে নেয় খুনীরা। কেন এই হত্যা, ইতোমধ্যেই অনেক অঙ্ক মিলিয়ে ফেলেছেন পুলিশ। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ছোট ছেলেটাকে মারার কারণ হলো, সিদ্ধার্থের একটা ছোট ভাই আছে, অপূর্ব। অপূর্ব এই খুন হওয়া নিষ্পাপ শিশু প্রিয়মের সঙ্গে খেলাধুলা করে এবং প্রিয়ম এই খুনিদেরকে চিনে। প্রিয়ম এবং অপূর্ব ছোট ছোট শিশু, তারা বন্ধু-বান্ধব, একসঙ্গে খেলাধুলা করে।

এ কারণেই সিদ্ধার্থ সিদ্ধান্ত নেয়, প্রিয়মকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেবে। সিদ্ধার্থ এবং মুগ্ধ দুইজনে একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিষ্পাপ শিশুর ওপর। কাপড় পেঁচিয়ে হত্যা করে। তার চোখ ঠিকরে বের হয়ে যায়। এরপরে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করে। খুন শেষে তারা গোসল করে। গোসল করে ওখানে বসে খেজুর খায়, ওখানে বসেই ইয়াবা খায়। এরপর যখন দুপুরের দিকে ফাঁকা হয়ে যায়, পাশের বিল্ডিংয়ে ছাদ দিয়ে লাফিয়ে তারা চলে যায়। এর আগে ওরা ওখানেই চেয়ারে বসে রেস্ট নিচ্ছিল।

ভয়ংকর বর্ণনা পুলিশের
বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে, অর্থাৎ শুক্রবার ভোররাত থেকে শুরু হয়ে এই ঘটনাটা তারা সারাদিন ঘটায়। তারপরে তারা যাওয়ার সময় এই যে আমরা কিছু স্বর্ণালংকার ওদের দেখানো মতে উদ্ধার করেছি, এগুলো তারা নিয়ে যায়। এরপর ওরা মন্দিরের পেছনে একটা পরিত্যক্ত বাড়ির পরিত্যক্ত জায়গায় সেখানে রেখে দেয়। তাদের দেখানো মতে আজকে এই আলামতগুলো জব্দ করা হয়।

পুলিশ জানান, মুগ্ধের মামাতো ভাইয়ের ছেলে সিদ্ধার্থ। অর্থাৎ তারা দুইজন আত্মীয়। আর এই ঘটনা ঘটানোর আগে তারা একটা বাসায় বসে ইয়াবা সেবন করে। সেটা হলো সীমান্তের বাসায়। সীমান্ত খুনের সঙ্গে ছিল না, কিন্তু সীমান্তের বাসায় তারা বসে ইয়াবা সেবন করে।

ইয়াবা সেবন করার পরে তারা এই বাসার ছাদে এসে সেবন করে। মুগ্ধ সিটি বাজারে মাছের দোকানে কাজ করে, রামনাথের মাছের দোকানে। মুগ্ধের বাসার সামনে খুশি ওরফে প্রশান্ত নামক এক ইয়াবা ব্যবসায়ীর নাম পাওয়া গেছে, যে ইয়াবা ব্যবসা করে এবং তার থেকে ইয়াবা কিনে নেয়। প্রতি পিস ৩৫০ টাকা ধরে তারা ইয়াবা কিনে এবং যে বিল্ডিংটার ওপর দিয়ে তারা ওখানে যাতায়াত করে, সে বিল্ডিং হলো দেবুদের বিল্ডিং। পাশের বিল্ডিংটা গণপতি স্যারের বিল্ডিং। ছাদে বসে তারা এভাবে নেশা করে।

পুলিশের ভাষ্য, ছোট ছেলেটাকে মারার কারণ হলো, সিদ্ধার্থের একটা ছোট ভাই আছে, অপূর্ব। অপূর্ব এই খুন হওয়া নিষ্পাপ শিশু প্রিয়মের সঙ্গে খেলাধুলা করে। এবং প্রিয়ম এই খুনিদেরকে চিনে। প্রিয়ম এবং অপূর্ব ছোট ছোট শিশু, তারা বন্ধু-বান্ধব, একসঙ্গে খেলাধুলা করে।

তখন সিদ্ধার্থ সিদ্ধান্ত নেয় যে, প্রিয়মকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেবে। সিদ্ধার্থ এবং মুগ্ধ দুইজনে একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে নিষ্পাপ শিশুর ওপর। কাপড় পেঁচিয়ে হত্যা করে। তার চোখ ঠিকরে বের হয়ে যায়। এরপরে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করে। খুন শেষে তারা গোসল করে। গোসল করে ওখানে বসে খেজুর খায়, ওখানে বসেই ইয়াবা খায়। এরপর যখন দুপুরের দিকে ফাঁকা হয়ে যায়, পাশের বিল্ডিংয়ে ছাদ দিয়ে লাফিয়ে তারা চলে যায়। এর আগে ওরা ওখানেই চেয়ারে বসে রেস্ট নিচ্ছিল।

পুলিশ জানান, মামলাটা সঠিক তদন্তের মাধ্যমে, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে আমরা যেন অতি দ্রুত আমাদের পুলিশের যে করণীয় অংশটুকু, চার্জশিট দাখিল করতে পারি এবং প্রকৃত আসামিদের যেন বিচারের আওতায় আনতে পারি, আমরা সে চেষ্টা করে যাব, ইনশাআল্লাহ।

পুলিশ কমিশনার বলেন, গণপতি চক্রবর্তী একজন সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। তার পরিবারের সঙ্গে কারও কোনো কলহ বা বিরোধ ছিল না। পাশের ভবনের ছাদ দিয়ে দুই আসামি মুগ্ধস ও সিদ্ধার্থ তাদের বাড়ির ছাদে আসে। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে সেখানে বসে তারা ইয়াবা সেবন করছিল। ছাদে শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তী সেখানে যান। তিনি খালি গায়ে ছিলেন এবং কাঁধে একটি গামছা ছিল। ছাদে বসে আড্ডা দেওয়ার বিষয়ে তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করেন। এ সময় নিজেদের পরিচয় যাতে প্রকাশ না পায়, সে জন্য দুই আসামি তার গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করে।

ডিআইজি বলেন, গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যার সময় তার বাঁচার চেষ্টা ও শব্দ শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ওপরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। সিঁড়িতে তাকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। পরে তাদের ২৫ বছর বয়সী মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী এগিয়ে এলে তাকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। প্রার্থী চক্রবর্তীকে হত্যা করতে চার থেকে পাঁচ মিনিট সময় লাগে। একপর্যায়ে আসামিরা রশি দিয়ে তার গলা ও মুখ পেঁচিয়ে ধরে জোরে টান দেয়। এতে তার চোয়াল ভেঙে যায় এবং চোখ বেরিয়ে আসে।

পুলিশ কমিশনার বলেন, এরপর নিচতলায় গিয়ে ১২ বছর বয়সী শিশু প্রিয়মকে গলায় কাপড় পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। একপর্যায়ে বালিশ চাপা দিয়েও তাকে হত্যা করা হয়। শিশুটির বয়স নিজের সন্তানের সমান হওয়ায় এ ঘটনা বলতে গিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

রংপুর কোতোয়ালি থানার ওসি নাজমুল জানান, চারজনের হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযানে নামে। অভিযানের একপর্যায়ে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে আটক করা হয়। আটকদের মধ্যে একজন পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে পালিয়ে পাশের রেশম উন্নয়ন বোর্ডের তুতবাগানে লুকিয়ে থাকেন। পরে পাশের দখীগঞ্জ শ্মশান এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। স্থানীয় যুবকদের একটি দল ডাকাতির উদ্দেশে বাড়িতে ঢুকে এই নৃশসং হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

এর আগে শনিবার রাতে মাছুয়াপাড়ার নিজ বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনের গলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত অন্য ব্যক্তিরা হলেন—গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী পার্থী (২৪) এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়ম (১২)।

রংপুর সিআইডি কার্যালয়ের ইনচার্জ সুমিত চক্রবর্তী জানান, ঘটনাটি দুই থেকে তিন দিন আগে ঘটে থাকতে পারে। বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল এবং আসবাবপত্রের ড্রয়ার ও স্বর্ণালংকার রাখার স্থানগুলো ভাঙা পাওয়া গেছে। প্রাথমিকভাবে ডাকাতির বিষয়টি সামনে এলেও প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত চলছে।

রংপুর মহানগর পুলিশের মুখপাত্র ও উপ-কমিশনার (ডিবি) সনাতন চক্রবর্তী জানান, প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে তাদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। বাড়ি তছনছ করার ধরন দেখে মূল্যবান জিনিসপত্র লুটপাট করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে এবং দ্রুতই ঘটনার মূল রহস্য উন্মোচন ও জড়িতদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।