প্রার্থী চক্রবর্তীর মৃত্যু নিশ্চিতে ৪-৫ মিনিটের লড়াই, খুনির মুখের ভয়ংকর বর্ণনা শুনালেন পুলিশ
রংপুরের মাছুয়াপাড়ায় একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় ভয়াবহ বর্ণনা দিয়েছেন রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার (ডিআইজি) মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ। তার তথ্য অনুযায়ী, ২৫ বছর বয়সী প্রার্থী চক্রবর্তীকে হত্যার আগে চার থেকে পাঁচ মিনিট ধরে লড়াই করতে হয় দুই খুনিকে। একপর্যায়ে রশি দিয়ে তার গলা ও মুখ পেঁচিয়ে টান দেওয়ায় চোয়াল ভেঙে যায় এবং চোখ বেরিয়ে আসে।
আজ রবিবার (২৩ আগস্ট) এসব তথ্য জানান পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ।
তিনি বলেন, রংপুর মেট্রোপলিটন এলাকার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের মাছুয়াপাড়া এলাকায় সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ওরফে ভোলা, মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী এবং ১২ বছর বয়সী শিশু প্রিয়মকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনাটি তদন্তে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ, সিআইডি, ডিবিসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট, গোয়েন্দা সংস্থা, গণমাধ্যমকর্মী ও সমাজকর্মীরা সম্মিলিতভাবে কাজ করেছেন। অল্প সময়ের মধ্যেই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করা সম্ভব হয়েছে।
পুলিশ কমিশনার বলেন, গণপতি চক্রবর্তী একজন সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। তার পরিবারের সঙ্গে কারও কোনো কলহ বা বিরোধ ছিল না। পাশের ভবনের ছাদ দিয়ে দুই আসামি মুগ্ধস ও সিদ্ধার্থ তাদের বাড়ির ছাদে আসে। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে সেখানে বসে তারা ইয়াবা সেবন করছিল। ছাদে শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তী সেখানে যান। তিনি খালি গায়ে ছিলেন এবং কাঁধে একটি গামছা ছিল। ছাদে বসে আড্ডা দেওয়ার বিষয়ে তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করেন। এ সময় নিজেদের পরিচয় যাতে প্রকাশ না পায়, সে জন্য দুই আসামি তার গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করে।
ডিআইজি বলেন, গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যার সময় তার বাঁচার চেষ্টা ও শব্দ শুনে স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ওপরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। সিঁড়িতে তাকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। পরে তাদের ২৫ বছর বয়সী মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী এগিয়ে এলে তাকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়। প্রার্থী চক্রবর্তীকে হত্যা করতে চার থেকে পাঁচ মিনিট সময় লাগে। একপর্যায়ে আসামিরা রশি দিয়ে তার গলা ও মুখ পেঁচিয়ে ধরে জোরে টান দেয়। এতে তার চোয়াল ভেঙে যায় এবং চোখ বেরিয়ে আসে।
পুলিশ কমিশনার বলেন, এরপর নিচতলায় গিয়ে ১২ বছর বয়সী শিশু প্রিয়মকে গলায় কাপড় পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। একপর্যায়ে বালিশ চাপা দিয়েও তাকে হত্যা করা হয়। শিশুটির বয়স নিজের সন্তানের সমান হওয়ায় এ ঘটনা বলতে গিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
তিনি আরও বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর সকাল হয়ে গেলে আসামিরা ওই বাড়িতেই গোসল করে। প্রথমে সিদ্ধার্থ এবং পরে মুগ্ধ গোসল করে। এরপর তারা ডাইনিং টেবিলে বসে খেজুর খায়। তাদের কাছে থাকা এক পিস ইয়াবাও সেখানে বসে সেবন করে। ঘটনাস্থল থেকে ইয়াবা সেবনের আলামত পাওয়া গেছে।
এর আগে, শনিবার (২২ আগস্ট) রাত ১১টার দিকে নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় তালাবদ্ধ বাড়ি থেকে রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলা (৫০), মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী (২৫) এবং ছোট ছেলে প্রীয়ম চক্রবর্তী (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
জানা যায়, গত কয়েকদিন ধরে মোবাইল ফোনে পাওয়া যাচ্ছিলো না রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার পরিবারকে। শনিবার রাতে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে যান শ্যালিকা। সেখানে গিয়ে দেখেন বাড়ি তালাবদ্ধ। জানালা দিয়ে দেখেন এলোমেলো ঘর। বেশ কিছুদিন ধরে বাড়িটি ভেতর থেকে তালাবদ্ধ ছিল। শনিবার রাতে বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ হলে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন। পরে কোতোয়ালি থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বাড়ির তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে। স্থানীয়রা আরও জানান, নিহত গণপতি চক্রবর্তী শিক্ষকতা থেকে অবসর নেয়ার পর নিজ বাসায় হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার চেম্বার পরিচালনা করতেন।
পুলিশ জানায়, স্থানীয়দের দেয়া খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে তালা ভেঙে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে। এ সময় দুইতলা বাড়ির ছাদে পাওয়া যায় গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ। তার স্ত্রী ও কন্যার মরদেহ ছিল বাসার সিঁড়িতে আর ছেলের মরদেহ ছিল ঘরের ভেতর খাটের নিচে।