২২ আগস্ট ২০২৬, ১৩:১২

মহাসড়কের চলন্ত কফিন ‘স্লিপার বাস’, ৮২৯ গাড়ির অনুমোদন নেই একটিরও

সাম্প্রতিক স্লিপার বাসের মর্মান্তিক দুর্ঘটনার চিত্র  © টিডিসি সম্পাদিত

ঝা চকচকে ডিজাইন আর দারুন পেইন্টে নজর কাড়বে যে কারও। ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়বে আলোর ঝলকানি। মাঝে ছোট একটি করিডোরে কোনওমতে একজন চলাচল করতে পারেন। দুপাশে ওপরে ও নিচে রয়েছে ছোট ছোট খোপ। ওপরে একপাশে দুটি এবং একপাশে একটি করে শোবার উপযোগী আসন। নিচে কোনোটিতে একই ধরনের আসন, আবার কোনোটিতে চেয়ার। ‘স্লিপার বাস’ নামে পরিচিত এসব যানবাহন এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ঢাকা-কক্সবাজার-সিলেট-খুলনাসহ দেশের মহাসড়কগুলোয়।

আপাতদৃষ্টিতে দেখতে এগুলো বেশ বিলাসবহুল হিসেবে পরিচিত। কম খরচে শুয়ে শুয়ে দূরপাল্লার ভ্রমণের সুযোগ থাকায় বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে বাসগুলো। কিন্তু একটি বাসেরও অনুমোদন না থাকা এবং মহাসড়কে একের পর এক দুর্ঘটনা ও অগ্নিকাণ্ডে প্রশ্নের মুখে পড়েছে দোতলা স্লিপার বাসের নিরাপত্তা। মাত্র কয়েকদিনে সিলেট, কক্সবাজার, কুমিল্লা ও ফেনীতে স্লিপার বাস বা দূরপাল্লার বাসে অগ্নিকাণ্ড ও দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটেছে। কোথাও স্থানীয়দের তৎপরতায় যাত্রীরা রক্ষা পেয়েছেন। কোথাও আবার প্রাণ গেছে।

এর মধ্যেই অনুমোদনহীনভাবে সাধারণ বাসের কাঠামো পরিবর্তন করে স্লিপার কোচ তৈরির অভিযোগ সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সড়কে ‘চলন্ত কফিনে’ পরিণত হওয়া যানগুলো চলার ক্ষেত্রে আমদানিকারক, মালিক, বাসের বডি বিল্ডার্সসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের অসাধু কর্মকর্তা ও সড়ক নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষও সমানভাবে দায়ী। এতে প্রাণহানির পাশাপাশি দুর্ঘটনার শঙ্কাও দিন দিন বাড়ছে। মানুষের স্বপ্নের ভ্রমণ পরিণত হচ্ছে দুঃস্বপ্নে।

সড়ক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, একতলা বাসের চেসিসের ওপর অতিরিক্ত কাঠামো বসিয়ে আট শতাধিক দোতলা স্লিপার কোচ মহাসড়কে চলছে। এসব বাসের অনেকগুলোই অনুমোদন ছাড়াই তৈরি বা পরিবর্তন করা হচ্ছে। যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থাও নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে দুর্ঘটনা ঘটলে যাত্রীদের দ্রুত বের হয়ে আসার সুযোগ কম থাকে। এতে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। দূরপাল্লার সড়কে এ ধরনের বাস তাই ‘চলন্ত মৃত্যুফাঁদে’ পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

চলতি মাসের ৭ আগস্ট (শুক্রবার) সকালে সিলেটের ওসমানীনগরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে বেঙ্গল ও ইউনিক পরিবহনের দুই বাসের সংঘর্ষে ৯ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ২৪ জন। ড্যাশক্যামের ভিডিওতে দেখা যায়, বেঙ্গল পরিবহনের বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ইউনিক বাসকে ধাক্কা দেয়। ইউনিক বাসটি পরে সড়কের পাশের খাদে পড়ে যায়। নিহতদের মধ্যে এক শিশু ও বাউলশিল্পী পেহেলী ভৈরবীও ছিলেন।

এরপরই ১৭ আগস্ট (সোমবার) ভোরে কুমিল্লার দাউদকান্দির ইলিয়টগঞ্জে কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী রয়েল কক্সের একটি স্লিপার কোচে আগুন লাগে। সামনে থাকা একটি যানবাহনকে ধাক্কা দেওয়ার পর বাসটিতে আগুন ধরে যায়। পরে আগুন পুরো বাসে ছড়িয়ে পড়ে। সব যাত্রী নিরাপদে বের হয়ে যাওয়ায় হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। পুলিশ বাসটি উদ্ধার করে থানায় নিয়েছে।

গতকাল কক্সবাজারে একটি স্লিপার বাসের দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটেছে। এসব বাসের কাঠামো নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে সাধারণ একতলা বাসকে পরিবর্তন করে দোতলা বা স্লিপার বাসে রূপান্তরের অভিযোগও রয়েছে। বিষয়টি এখন আলোচনায় এসেছে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা যেহেতু শুরু হয়েছে, সেহেতু এ থেকে একটি সমাধান বের হবে বলে আমরা আশাবাদী।হাবিবুর রহমান খান, ডিআইজি অ্যাডমিন, হাইওয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স

তারপরই সর্বশেষ ২১ আগস্ট (শুক্রবার) দিবাগত রাত ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী আইকন পরিবহনের একটি এসি বাসে রামুর কলঘর বাজার এলাকায় আগুন লাগে। বাসটিতে ২৫ থেকে ৩০ জন যাত্রী ছিলেন। স্থানীয়রা জানালার কাচ ভেঙে যাত্রীদের বের করে আনেন। পরে ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। কেউ হতাহত হননি। প্রাথমিকভাবে যান্ত্রিক ত্রুটি ও ইঞ্জিন অতিরিক্ত গরমকে আগুনের কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শুধু এই মাসে নয় এর আগে গত ২২ মার্চ ফেনীর রামপুরে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকটি যানবাহনে দোয়েল পরিবহনের একটি স্লিপার বাস ধাক্কা দিলে তিনজন নিহত হন। এ ঘটনায় আহত হন আরও পাঁচজন। এর আগে শ্যামলী পরিবহনের একটি বাস অ্যাম্বুলেন্সকে ধাক্কা দেওয়াকে কেন্দ্র করে সেখানে যানজট তৈরি হয়েছিল। পরে দ্রুতগতির স্লিপার বাসটি দাঁড়িয়ে থাকা যানবাহনগুলোকে ধাক্কা দেয়। পুলিশ চারটি বাস ও দুটি মোটরসাইকেল জব্দ করে।

সাম্প্রতিক এসব মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর স্লিপার বাস নিয়ে সামনে এসেছে আরও উদ্বেগজনক তথ্য। জানা গেছে, বর্তমানে দেশের সড়ক-মহাসড়কে ৮২৯টি স্লিপার বাস চলাচল করছে। এসব বাসের কোনোটিরই ডাবল ডেকার স্লিপার কোচ হিসেবে চলাচলের অনুমোদন নেই বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

স্লিপার বাসের আরেকটি বড় ঝুঁকি হিসেবে অতিরিক্ত আসন সংযোজনের বিষয়টিও উঠে এসেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একটি সাধারণ এসি বাসে যেখানে প্রায় ৩২টি আসন থাকে। সেখানে কিছু দোতলা স্লিপার বাসকে যাদুর বলে রূপান্তর করা হয়েছে ৪৫ সিটে। অর্থাৎ, একই চেসিসের ওপর অতিরিক্ত কাঠামো তৈরি করে যাত্রী ধারণক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। এতে বাসের মোট ওজন বাড়ছে। একই সঙ্গে যাত্রী ও মালামালের সম্মিলিত ওজনের কারণে চেসিসের ওপরও অতিরিক্ত চাপ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

আমাদের দেশে বেশিরভাগই সিঙ্গেল ডেকার বাসগুলোকে স্লিপার বাস বানানো হয়। এতে করে দূর্ঘটনা অবশ্যই ঘটবে। কারণ বাসের ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী নেওয়া হলে সেটিতো অবশ্যই বিপদ ঘটবে।অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ, এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউট সহকারী, বুয়েট

যদিও এসব ঘটনার পর নড়েচড়ে বসেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। হাইকোর্টের কড়া নির্দেশনা ও অনুসন্ধানের পর রাজধানী যাত্রাবাড়ী, গাবতলী, আমিনবাজার ও মানিকনগরের অবৈধ বডি বিল্ডিং গ্যারেজগুলোতে যৌথ অভিযান চালিয়ে একাধিক প্রতিষ্ঠান সিলগালা ও লাখ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। উদ্ধার করা হয় ফিটনেসহীন ও রুট পারমিটবিহীন অসংখ্য অবৈধ স্লিপার বাস। এছাড়াও রাজধানীর বাহিরে কক্সবাজার, সিলেটসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় অভিযান পরিচালনা করে সংস্থাটি। যদিও এর স্থায়ী সমাধান নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।

বিআরটিএর তথ্য অনুযায়ী সর্বশেষ ১৯ আগস্ট (বুধবার) রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর সামির মৃধা জামে মসজিদসংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালায় বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত-৫। অনুমোদনহীন স্লিপার কোচের কাঠামো তৈরি, বাসের কাঠামো পরিবর্তন এবং অবৈধ গ্যারেজ পরিচালনার অভিযোগে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে মোট আড়াই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।

এর আগের দিন মঙ্গলবার রাজধানীর গাবতলীর আমিনবাজার ও মানিকনগর এলাকার বিভিন্ন বডি বিল্ডিং গ্যারেজে অভিযান চালায় বিআরটিএ। সংস্থাটির আদালত-৬ ও আদালত-৩-এর সমন্বয়ে পরিচালিত অভিযানে প্রায় ১০ থেকে ১২টি গ্যারেজ পরিদর্শন করা হয়। অনুমোদনহীন স্লিপার বাস মেরামত এবং প্রয়োজনীয় নিবন্ধন না থাকায় চারটি গ্যারেজকে ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অভিযানে মেরামতের সময় ৮টি গাড়ি ডাম্পিংয়ে পাঠানো হয় এবং চলাচলের অনুপযোগী দুটি স্লিপার বাস জব্দ করা হয়। এ সময় ‘নিউ ডিসেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস’ নামের একটি বডি গ্যারেজ সিলগালা করেন কর্মকর্তারা।

এছাড়াও ১৯ আগস্ট দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলা প্রশাসন, বিআরটিএ কক্সবাজার সার্কেল ও জেলা পুলিশের যৌথ উদ্যোগে একটি অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে অনুমোদনহীনভাবে আসনবিন্যাস ও কাঠামোগত রূপান্তর (মডিফিকেশন) করা এবং ফিটনেস সনদ না থাকার দায়ে লন্ডন এক্সপ্রেস, দোয়েল এক্সপ্রেস, সেন্টমার্টিন পরিবহন ও ইম্পেরিয়াল এক্সপ্রেসসহ পাঁচটি দূরপাল্লার বিলাসবহুল বাসের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। একই সঙ্গে ঘটনাস্থলেই সংশ্লিষ্ট পরিবহনগুলোর কাছ থেকে জরিমানার ১ লাখ টাকা আদায় করা হয়।

স্লিপার বাস চলাচলের জন্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) কোনো অনুমতি দেয়নি। বিআরটিএ বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে এ কথা জানিয়েছে। এমনকি আদালতেও লিখিতভাবে তারা জানিয়েছে, এ ধরনের বাস চলাচলের অনুমোদন তারা দেয়নি। বিআরটিএ চাইলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা সিভিল প্রশাসনের সহায়তায় যে কোনো সময় এসব বাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।— হুজ্জাতুল ইসলাম খান, রিটকারী আইনজীবী, হাইকোর্ট

এসব বিষয়ে বিআরটিএর এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি ছাড়া যেকোনো মোটরযানের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা, সিট বিন্যাস কিংবা মূল অবয়ব পরিবর্তন করা সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ অনুযায়ী সম্পূর্ণ দণ্ডনীয় অপরাধ। সম্প্রতি অনেক পরিবহন কোম্পানি আইনের তোয়াক্কা না করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে সাধারণ বাসকে স্লিপার বাসে রূপান্তর করে যাত্রী পরিবহন করে। যার কারণে মহাসড়কে বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করছে।

একই বিষয়ে বিআরটিএ কক্সবাজার সার্কেলের মোটরযান পরিদর্শক মো. আব্দুল্লাহ খান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, স্লিপার বাসের বিষয়ে এখনো কোনো স্থায়ী সমাধান নিয়ে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে বসা হয়নি। চেয়ারম্যানের নির্দেশনা অনুযায়ী বর্তমানে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। কীভাবে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

স্লিপার বাসের চলাচল ও এর বিরুদ্ধে অভিযান প্রসঙ্গে আব্দুল্লাহ খান বলেন, বিষয়টি নিয়ে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। স্লিপার বাসের বিষয়ে ১১ তারিখে চিঠি পাওয়ার পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালিত হয়েছে। কক্সবাজার সার্কেলেও ১৯ আগস্ট স্লিপার বাসের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযান পরিচালনা করা হয়।

এরই মধ্যে স্লিপার কোচের বৈধতার বিষয়টি গড়িয়েছে উচ্চ আদালত পর্যন্ত। ২০২৫ সালে এ বিষয়ে হাইকোর্টে রিট করেন আইনজীবী হুজ্জাতুল ইসলাম খান। চলতি বছরের ২০ আগস্ট মামলার শুনানিতে বিআরটিএ আদালতকে জানিয়েছে, বর্তমানে দেশের সড়কে ৮২৯টি অবৈধ স্লিপার বাস চলাচল করছে। একই সঙ্গে সংস্থাটি তাদের সাম্প্রতিক অভিযানের বিষয়েও আদালতকে জানান।

হাইকোর্টে রিটকারী আইনজীবী হুজ্জাতুল ইসলাম খান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, স্লিপার বাস চলাচলের জন্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) কোনো অনুমতি দেয়নি। বিআরটিএ বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে এ কথা জানিয়েছে। এমনকি আদালতেও লিখিতভাবে তারা জানিয়েছে, এ ধরনের বাস চলাচলের অনুমোদন তারা দেয়নি। বিআরটিএ চাইলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা সিভিল প্রশাসনের সহায়তায় যে কোনো সময় এসব বাসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।

স্লিপার বাসকে অনুমোদনহীন বলছে বিআরটিএ কিন্তু সেগুলোর বিরুদ্ধে কোন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এটি বিআরটিএর দ্বিমুখী আচরণ। যদি সত্যিই এসব বাস অনুমোদনহীন হয় এবং কর্তৃপক্ষের বক্তব্যই যদি এমন হয়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।— সাইদুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক, রোড সেফটি ফাউন্ডেশন

হুজ্জাতুল ইসলাম খান বলেন, আইন অনুযায়ী একটি বাসের চেসিস আমদানি বা দেশে আসার পর প্রথমে চেসিসের অনুমোদন নিতে হয়। এরপর ওই চেসিসের ওপর বডি তৈরি করা হলে সেটিও বিআরটিএ থেকে অনুমোদন নিতে হয়। কিন্তু স্লিপার বাসের ক্ষেত্রে এই নিয়ম অনুসরণ করা হচ্ছে না। একটি অসাধু প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব বাসের রেজিস্ট্রেশন নেওয়া হচ্ছে। প্রথমে সাধারণ একতলা বাস হিসেবে বডি অনুমোদন নিয়ে রেজিস্ট্রেশন করা হয়। পরে গ্যারেজে নিয়ে নিজেদের মতো করে বডি পরিবর্তন করে একতলা বাসকে দোতলা বা স্লিপার বাসে রূপান্তর করা হচ্ছে। এসব বাসের অনেকগুলো স্থানীয় গ্যারেজে তৈরি বা পরিবর্তন করা হচ্ছে। এসব গ্যারেজের টেকনিশিয়ানদের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম ও যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা নেই। অনেক ক্ষেত্রে শুধু টাকার বিনিময়ে বডি তৈরি বা পরিবর্তন করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, এ কারণে কোনো বাসে আগুন লাগলে বা দুর্ঘটনা ঘটলে যাত্রীদের দ্রুত বের হয়ে আসার সুযোগ খুবই সীমিত। অধিকাংশ স্লিপার বাসে সামনের দিকে, অর্থাৎ চালকের পেছনে, একটি দরজা থাকে। দুর্ঘটনার সময় চালক, সহকারী ও সুপারভাইজার সাধারণত দ্রুত বেরিয়ে যেতে পারলেও যাত্রীরা ভেতরে আটকা পড়ার ঝুঁকিতে থাকেন।

কক্সবাজারে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, সেখানেও চালক, হেলপার ও সুপারভাইজার আগুনের বিষয়টি বুঝতে পেরে গাড়ি থেকে বের হয়ে যেতে পেরেছিলেন। এভাবে যদি ব্যবস্থা চলতে থাকে, তাহলে এসব স্লিপার বাসকে চলন্ত কফিন ছাড়া আর কিছু বলা যায় না।

রিটের বর্তমান অবস্থার বিষয়ে আইনজীবী বলেন, রিটটি এখন শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। গত বৃহস্পতিবারও শুনানির জন্য বিষয়টি তালিকায় ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে শুনানি শেষ করা সম্ভব না হওয়ায় সেদিন শুনানি হয়নি।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, স্লিপার বাসকে অনুমোদনহীন বলছে বিআরটিএ কিন্তু সেগুলোর বিরুদ্ধে কোন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। এটি বিআরটিএর দ্বিমুখী আচরণ। বিআরটিএ যখন বলছে এসব বাস অনুমোদনহীন, তখন প্রশ্ন হলো তাদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে না কেন? এসব বাস তো গোপনে কোথাও চলছে না। রাজধানীসহ সড়ক-মহাসড়কে প্রকাশ্যেই চলাচল করছে।

আরও পড়ুন: কুবির হলে ‘জেসিডি’ লেখা নিয়ে দ্বন্দ্ব, জুনিয়রদের নিয়ে শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ

সাইদুর রহমান বলেন, এসব স্লিপার বাস রাজধানী থেকে মহাসড়ক ধরে বিভিন্ন গন্তব্যে যাচ্ছে। পথে বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত, হাইওয়ে পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন। তাদের চোখের সামনেই বাসগুলো চলাচল করছে। তবু কেন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না, সেটিই বড় প্রশ্ন। স্লিপার বাস প্রায়ই দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। অথচ অনুমোদন ছাড়া বাস চলাচল বন্ধে ব্যবস্থা নিতে না পারা বিআরটিএর অযোগ্যতারও পরিচয়। যদি সত্যিই এসব বাস অনুমোদনহীন হয় এবং কর্তৃপক্ষের বক্তব্যই যদি এমন হয়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একদিকে বাসমালিক আইন লঙ্ঘন করছেন। অন্যদিকে বিআরটিএ নিজেই বলছে, এসব বাসের অনুমোদন নেই। 

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউট সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, আমাদের দেশে বেশিরভাগই সিঙ্গেল ডেকার বাসগুলোকে স্লিপার বাস বানানো হয়। এতে করে দূর্ঘটনা অবশ্যই ঘটবে। কারণ বাসের ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী নেওয়া হলে সেটিতো অবশ্যই বিপদ ঘটবে। তাই আমাদের সরকারী সংস্থাগুলোর উচিত তাদের নজরদারি বাড়ানো। যেহেতু বিআরটিএই বলছে বাসগুলো অননুমোদিত তাই তাদের উচিত এই বাসগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া। 

হাইওয়ে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের অ্যাডমিন ডিআইজি হাবিবুর রহমান খান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, স্লিপার বাস বৈধ নাকি অবৈধ, কোন যানবাহনকে লাইসেন্স দেওয়া হবে—এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মূল কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। তাই স্লিপার বাসের অনুমোদনের বিষয়টি বিআরটিএর আওতাভুক্ত। বিআরটিএ যদি কোনো যানবাহনকে অবৈধ ঘোষণা করে এবং এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য হাইওয়ে পুলিশকে জানায়, তাহলে পুলিশ অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। বিভিন্ন সময় বিআরটিএর নির্দেশনা অনুযায়ী হাইওয়ে পুলিশ এ ধরনের অভিযান পরিচালনাও করেছে।

হাবিবুর রহমান খান বলেন, হাইওয়ে পুলিশের মূল দায়িত্ব সড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কোন যানবাহন বৈধ বা অবৈধ—এটি নির্ধারণ করা হাইওয়ে পুলিশের মূল দায়িত্ব নয়। তবে বিআরটিএর পক্ষ থেকে কোনো নির্দেশনা বা অনুরোধ এলে তারা অবশ্যই সহযোগিতা করবে।

স্লিপার বাস নিয়ে সাম্প্রতিক অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গতকাল কক্সবাজারে একটি স্লিপার বাসের দুর্ঘটনার ঘটনাও ঘটেছে। এসব বাসের কাঠামো নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে সাধারণ একতলা বাসকে পরিবর্তন করে দোতলা বা স্লিপার বাসে রূপান্তরের অভিযোগও রয়েছে। বিষয়টি এখন আলোচনায় এসেছে। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা যেহেতু শুরু হয়েছে, সেহেতু এ থেকে একটি সমাধান বের হবে বলে আমরা আশাবাদী।

হাইওয়ে পুলিশের অবস্থান তুলে ধরে ডিআইজি হাবিবুর রহমান খান বলেন, বিআরটিএ এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা কর্তৃপক্ষ যেভাবে নির্দেশনা দেবে হাইওয়ে পুলিশ সেভাবেই দায়িত্ব পালন করবে।