বোমারু মামুনকে ধরতে সাভারে ভবন ঘিরে রেখেছে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী, গ্রেপ্তার আরিফ
রাজধানীর মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে ও সাভারের আশুলিয়ায় বোমা উদ্ধারের ঘটনায় জড়িত দুজনকে শনাক্ত করেছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। তাদের একজন মোহাম্মদ আরিফকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অপরজন নাজমুল হাসান ওরফে ‘বোমারু মামুন’কে গ্রেপ্তারে সাভারে অভিযান চলছে।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) রাতে সাভারের হেমায়েতপুরের শ্যামপুর এলাকায় আব্দুল জলিলের মালিকানাধীন একটি তিনতলা ভবন ঘিরে অভিযান শুরু করে সিটিটিসি। রাত ১২টা পর্যন্ত অভিযান চলছিল। ভবনটির ভেতর বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম রয়েছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সিটিটিসি ইউনিটের যুগ্ম কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, মতিঝিল ও আশুলিয়ায় বোমা উদ্ধারের ঘটনায় তদন্ত করে দুজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের একজন আরিফ। অপরজন মূলহোতা বোমারু মামুন।
সিটিটিসি সূত্র জানায়, মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সাভারের তেঁতুলঝড়া ইউনিয়নের শ্যামপুর এলাকায় আব্দুল জলিলের বাড়িটি ঘিরে অভিযান শুরু হয়। এ সময় মোহাম্মদ আরিফকে গ্রেপ্তার করা হয়। বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ কেমিক্যাল ও বিস্ফোরক তৈরির উপকরণ জব্দ করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি সাংবাদিকদেরও ভবনটির কাছাকাছি যেতে দেওয়া হয়নি। আশপাশের এলাকায় সাধারণ মানুষের চলাচলও সীমিত করে দেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সাভার মডেল থানার এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, স্থানীয় পুলিশকে অভিযানের কারণ আগে থেকে জানানো হয়নি। পরে অভিযানে সহায়তা করতে তাদের সেখানে পাঠানো হয়। এ বিষয়ে সিটিটিসি বিস্তারিত জানাবে।
সিটিটিসির এক কর্মকর্তা জানান, ভবনটির ভেতরে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। বাড়িটিতে তালা দেওয়া ছিল। সিটিটিসি সদস্যরা ভেতরে অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। অভিযানে সিটিটিসি ও স্থানীয় পুলিশের পাশাপাশি জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম বলেন, হেমায়েতপুর এলাকা থেকে একজনকে পাঁচটি ককটেল ও বিস্ফোরকসহ আটক করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই ওই বাড়িতে অভিযান চালানো হচ্ছে।
ওসি বলেন, বাড়িটি চলতি মাসের ১ তারিখে ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। সেখানে বিস্ফোরক রাখা হয়। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর কাজ বলে ধারণা করা হচ্ছে। অভিযানে বাড়ি থেকে জেএমবির কিছু লিফলেট, কয়েকটি ককটেলসদৃশ বস্তু এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বোমা তৈরির উপকরণ ও সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।
পরে রাত ১২টার দিকে ওসি জানান, আটক ব্যক্তির ব্যাগ থেকে বিশেষ কায়দায় তৈরি পাঁচটি শক্তিশালী পাইপ বোমা উদ্ধার করা হয়েছে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাড়িটির নিচতলার একটি কক্ষ থেকে একই ধরনের আরও নয়টি বোমা উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া বোমা তৈরির বিপুল পরিমাণ সরঞ্জামও পাওয়া গেছে।
রাত ১২টার দিকে একটি পাইপ বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিষ্ক্রিয় করা হয়। অভিযানে থাকা এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ভবন থেকে উদ্ধার করা পাইপ বোমার মূল উপাদান হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড।
এসব ঘটনায় বুধবার (১২ আগস্ট) দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাবেন ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (সিটিটিসি) মোহাম্মদ শামসুল হক।
আরও পড়ুন: ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের ওপর নিউমার্কেট যুবদলের হামলায় আহত ৮
বাড়ির মালিক আব্দুল জলিলের মেয়ে ইলমা বলেন, আব্বাস আলী নামের একজন ও আরেক ব্যক্তি বাড়িটি ভাড়া নিতে এসেছিলেন। গত ২ তারিখে তাদের বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়। তারা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে থাকবেন এবং পাশের একটি স্কুলে ছেলেমেয়েদের ভর্তি করাবেন বলে জানিয়েছিলেন। নিজেদের চালক হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন তারা। পরিবার মনে করেই তাদের বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। ভেতরে এত কিছু রাখা হয়েছে, তা তারা জানতেন না।
এর আগে গত ৩১ জুলাই সাভারের আশুলিয়ার একটি মুদি দোকানে ফেলে যাওয়া ভ্রমণব্যাগ থেকে বিশেষ কায়দায় তৈরি একটি বোমা উদ্ধার করে পুলিশ। পরে সিটিটিসির বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দল সেটি নিরাপদে নিষ্ক্রিয় করে।
এরও আগে গত ২৪ জুলাই রাজধানীর মতিঝিল মেট্রোরেল স্টেশনের নিচ থেকে একটি বোমা উদ্ধার করে সিটিটিসি। এ ঘটনায় বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা হয়। বোমাটি কারা সেখানে রেখেছিল, এর উৎস কী এবং এর সঙ্গে কোনো উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কের সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখছিল তদন্তকারী দল।
এ ছাড়া কেরানীগঞ্জে উদ্ধার হওয়া বোমা এবং যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ ও কুমিল্লায় সাম্প্রতিক বিস্ফোরণের ঘটনাগুলোর সঙ্গে মতিঝিলের ঘটনার কোনো যোগসূত্র আছে কি না, সেটিও তদন্ত করা হচ্ছিল।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার বা দণ্ডপ্রাপ্ত আলোচিত জঙ্গিদের অনেকে কারাগার থেকে মুক্তি পায়। কেউ কেউ কারাগার থেকেও পালিয়ে যায়। তাদের একটি অংশ আবার সক্রিয় হয়ে ছোট ছোট সেল গঠন, নতুন সদস্য সংগ্রহ, অর্থের উৎস তৈরি এবং বিস্ফোরক তৈরির সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে বলে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে।
মতিঝিলে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উল্টো রথযাত্রার পথে শক্তিশালী ছাতাবোমা উদ্ধারের ঘটনা তদন্ত করতে গিয়ে নাজমুল হাসান ওরফে ‘বোমারু মামুন’-এর নাম সামনে আসে।
২০১৭ সালের ১৫ আগস্ট রাজধানীর পান্থপথের হোটেল ওলিও ইন্টারন্যাশনালে নব্য জেএমবির সদস্যরা আস্তানা গড়েছিল। সিটিটিসি সেখানে ‘অপারেশন আগস্ট বাইট’ নামে অভিযান চালায়। অভিযানের সময় আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণে সাইফুল ইসলাম নামের এক মূল হামলাকারী নিহত হন। ২০১৯ সালের ১১ আগস্ট ওই সন্ত্রাসী হামলা মামলার অভিযোগপত্র ও পুলিশের তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বোমারু মামুনের নাম আসে।
এর আগে ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর রাজধানীর উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টর থেকে মামুনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সে সময় তিনি নব্য জেএমবির শীর্ষস্থানীয় নেতা ও শুরা সদস্য ছিলেন। জঙ্গি সংগঠনের জন্য অর্থ সংগ্রহ, বিস্ফোরক তৈরি, প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং নাশকতামূলক হামলার পরিকল্পনার মতো দায়িত্বে তিনি ছিলেন বলে সে সময় ডিএমপির কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন।
গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মামুন কারাগার থেকে বের হয়ে কেরানীগঞ্জ ও সাভারে বসবাস শুরু করেন। তার সঙ্গে শেখ আল আমিন, মোহাম্মদ আরিফসহ অন্তত ১৫ জন যুক্ত হন। তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা করে বোমা তৈরির সরঞ্জাম, অর্থ ও জনবল সংগ্রহের কাজ শুরু করেন বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে। মোহাম্মদ আরিফকে গ্রেপ্তারের পর বোমারু মামুনকে ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।