অনলাইন জুয়ায় আসক্ত স্বামীকে ফেরাতে ব্যর্থ আর্তির পর প্রাণ গেল স্ত্রীর
গাজীপুরের কালিয়াকৈরে স্ত্রীকে হত্যা করে আত্মহত্যা বলে চালানোর অভিযোগে দায়ের করা মামলার আসামি মিরাজুল ইসলাম রাসেলকে (৩৫) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সিঙ্গাপুরে পালানোর চেষ্টা করার সময় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি অনলাইনে জুয়ায় আসক্তি এবং স্ত্রীকে নির্যাতনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মামলার বাদী ও নিহত সম্পা আক্তার আরিফার বাবা মো. অহিদুজ্জামান বলেন, ‘অনলাইনে জুয়া খেলতে বাধা দেওয়াতেই আমার মেয়ের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। রাসেল আমার মেয়েকে হত্যা করে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে আত্মহত্যার নাটক সাজিয়েছে। এ ঘটনায় তার পরিবারের আরও কেউ জড়িত থাকতে পারে। সুষ্ঠু তদন্ত হলে সব সত্য বেরিয়ে আসবে।’
নিহতের স্বজনেরা বলছেন, জায়ান নামে তাদের পাঁচ বছরের একটি ছেলে রয়েছে। বাবার অনলাইন জুয়ার আসক্তির কারণে শিশুটি মাকে হারিয়েছে। রাসেলের আরও ছুটি বাকি ছিল। কিন্তু ঘটনার পরই সে তড়িঘড়ি করে সিঙ্গাপুরে পালানোর চেষ্টা করে।
রবিবার (১৯ জুলাই) দুপুরে ইমিগ্রেশন পুলিশের সহায়তায় রাসেলকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে কালিয়াকৈর থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এর আগে শনিবার ভোরে কালিয়াকৈরের সফিপুর আহম্মদ নগর চৌরাস্তা এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে রাসেলের স্ত্রী সম্পা আক্তার আরিফার (৩০) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।
পুলিশ ও নিহতের স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ১০ বছর আগে রাসেল ও আরিফার বিয়ে হয়। তাদের সংসারে জায়ান নামে পাঁচ বছর বয়সী একটি ছেলে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সিঙ্গাপুরে থাকা রাসেল অনলাইনে জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়েন। প্রায় এক মাস আগে ছুটিতে দেশে ফিরেও তিনি নিয়মিত অনলাইন জুয়া খেলতেন। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই বিরোধ হতো।
স্বজনদের অভিযোগ, আরিফার স্বামীকে জুয়া খেলতে বাধা দিলে তাকে নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো। গত শুক্রবার রাতেও একই বিষয় নিয়ে দুজনের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক হয়। একপর্যায়ে রাসেল মারধর করলে আরিফার মৃত্যু হয়। পরে পরিবারের কয়েকজনের সহায়তায় মরদেহ সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে আত্মহত্যার ঘটনা বলে প্রচারের চেষ্টা করা হয়েছে।
আরও পড়ুন: ১৫ জেলায় বাড়ছে নদীর পানি, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বন্যার পূর্বাভাস
এ ঘটনায় নিহত গৃহবধূর পরিবার কালিয়াকৈর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা দায়ের করেন। এরপরই রাসেলের বিদেশযাত্রা বন্ধে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে পুলিশ।
কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সহিদুল ইসলাম বলেন, ‘মামলার পর থেকেই আসামির অবস্থান শনাক্তে প্রযুক্তিগত তদন্ত চলছিল। একই সঙ্গে তার বিদেশযাত্রা ঠেকাতে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়। রবিবার দুপুরে তিনি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে সিঙ্গাপুরে পালানোর চেষ্টা করলে ইমিগ্রেশন পুলিশ তাকে আটক করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রাসেল অনলাইনে জুয়া খেলা এবং স্ত্রীকে নির্যাতনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। বর্তমানে মামলাটি আত্মহত্যায় প্ররোচনার ধারায় রয়েছে। তবে তদন্তে হত্যার প্রমাণ পাওয়া গেলে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হবে।’
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মামলা দায়েরের পর প্রযুক্তিগত সহায়তায় রাসেলের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা চলছিল। রবিবার দুপুরে তার অবস্থান হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায় নিশ্চিত হওয়ার পর ইমিগ্রেশন পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়। বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা থাকায় ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করার সময় তাকে আটক করা সম্ভব হয়েছে।