সড়ক পাকা হবে বলে এমপিকে দিয়ে উদ্বোধন, পরে পুরোনো ইট তুলে নিয়ে উধাও প্রতারকরা
এবার প্রতারণার ভিন্নধর্মী এক দৃষ্টান্ত দেখা গেল জামালপুরে। উন্নয়নের নামে খোদ সংসদ সদস্যকে (এমপি) দিয়ে সড়কের কাজ উদ্বোধন করিয়ে সেই সড়কের পুরোনো ইট তুলে বিক্রি করে দিয়েছে প্রতারক চক্র। বিষয়টি জানাজানি হলে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে জেলাজুড়ে। ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকার সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের ঘোষণা দিয়ে জাঁকজমকপূর্ণ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল।
সে উপস্থিত ছিলেন জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, আইনজীবী ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। কিন্তু সেই উদ্বোধনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই উন্নয়নকাজের বদলে পুরোনো সড়কের প্রায় ছয় লাখ ইট খুলে নিয়ে উধাও হয়ে যায় প্রতারক চক্রটি। ফলে সাড়ে তিন কিলোমিটার সড়কটি পরিণত হয়েছে কাদাময় ও চলাচল-অযোগ্য পথে।
সদর উপজেলার রশিদপুর ইউনিয়নের গজারিআটা গ্রামের এ ঘটনার পর এলাকাবাসীর অভিযোগ, উন্নয়নের নামে পরিকল্পিতভাবে পুরোনো সড়কের ইট সরিয়ে বিক্রি করা হয়েছে। অথচ প্রতিশ্রুত উন্নয়নকাজের কোনো অগ্রগতি নেই।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ভাঙ্গুরিঘাট থেকে ময়নার মোড় পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ ইটের সড়কটি পাকাকরণের ঘোষণা দিয়ে গত ১২ মে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়। তখন জানানো হয়েছিল, ৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে ঢাকার একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি বাস্তবায়ন করবে এবং স্থানীয়ভাবে সাব-ঠিকাদারের দায়িত্বে থাকবেন আব্দুল মান্নান।
উদ্বোধনের পরদিন থেকেই শ্রমিকরা পুরোনো সড়কের ইট খুলে ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহনে করে সরিয়ে নিতে শুরু করেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্রায় সব ইট অপসারণ করা হলেও এরপর আর কোনো নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে সড়কটি ফেলে রাখায় বর্ষায় কাদার কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সরেজমিনে দেখা যায়, পুরো সড়কের কোথাও একটি ইটও নেই। হাঁটুসমান কাদায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। শিক্ষার্থী, কৃষক, দিনমজুরসহ স্থানীয়দের প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
রহিমা বেগম বলেন, ‘বৃষ্টি হলেই পুরো রাস্তা কাদায় একাকার হয়ে যায়। ছোট ছোট সন্তানদের নিয়ে ঘর থেকে বের হওয়াই কঠিন। বাজারে যেতে কিংবা সন্তানকে স্কুলে পৌঁছে দিতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। রাস্তা নির্মাণের কথা বলে যারা ইট তুলে নিয়ে গেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।’
কৃষক মাইনুল ইসলাম বলেন, ‘এই রাস্তা দিয়েই প্রতিদিন জমিতে যাতায়াত করি। এখন কাদার কারণে কৃষিপণ্য বাজারে নিতে পারছি না, পাইকাররাও আর আসতে চান না। আমরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছি। রাস্তা পাকা করার কথা বলে উদ্বোধন করল, জিলাপি বিতরণ করল, তারপর একে একে সব ইট খুলে নিয়ে গেল। মানুষের সঙ্গে এমন প্রতারণা হবে, কখনো ভাবিনি। দ্রুত রাস্তা নির্মাণ এবং দায়ীদের কঠোর শাস্তি চাই।’
স্কুলশিক্ষার্থী জীবন আহম্মেদ বলেন, ‘প্রতিদিন স্কুলে যেতে কাদা মাড়াতে হয়। অনেক সময় জুতা হাতে নিয়ে হাঁটতে হয়। স্কুলে পৌঁছানোর আগেই কাপড় ও বই-খাতা নোংরা হয়ে যায়। আগে অন্তত ইটের রাস্তা ছিল, এখন সেটাও নেই। আমাদের সঙ্গে যে প্রতারণা করা হয়েছে, তার বিচার চাই। দ্রুত রাস্তাটি নির্মাণ করে দেওয়ার দাবি জানাই।’
গজারিআটার ঘটনায় সফল হওয়ার পর একই কৌশলে চাঁদপুর এলাকার আরেকটি সড়কের ইট সরানোর চেষ্টা করলে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। প্রকল্পের কাগজপত্র দেখাতে না পারায় মূলহোতা আব্দুল মান্নানসহ ১১ জনকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছিল।
পুলিশ জানায়, আব্দুল মান্নান সদর উপজেলার দিগপাইত ইউনিয়নের হবদেশ গ্রামের বাসিন্দা। তিনি নিজেকে ঠিকাদার পরিচয় দিয়ে প্রতারণার ফাঁদ পেতেছিলেন। চাঁদপুরের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় তাঁকে ও তাঁর সহযোগীদের কারাগারে পাঠানো হলেও বর্তমানে তাঁরা জামিনে রয়েছেন।
জামালপুরের নারায়ণপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মঞ্জুরুল খান বলেন, ‘গজারিআটা গ্রামের ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। তবে চাঁদপুর এলাকায় একই কৌশলে ইট তুলতে গিয়ে মূলহোতাসহ ১১ জনকে আটক করা হয়। পরে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। বর্তমানে মামলার তদন্ত চলছে।’
রশিদপুর ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য জামিল হাসান বলেন, ‘আমরা কিছুই বুঝতে পারিনি। বোঝার উপায়ও ছিল না। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এমপিসহ ইউনিয়ন বিএনপির অনেক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। এমন প্রতারণা হবে, সেটা কল্পনাও করিনি। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রামের মানুষ। এখন এই রাস্তা দিয়ে চলাচলের কোনো উপায় নেই।’
রশিদপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আবুল হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক আজহারুল ইসলাম উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘সংসদ সদস্য সেখানে যাচ্ছেন শুনে আমিও গিয়েছিলাম। তখন আমরা কেউই প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারিনি। এটি দুর্ধর্ষ চুরির ঘটনা। একই সঙ্গে বিষয়টি অত্যন্ত হাস্যকরও।’
আরও পড়ুন: ৫৯ জেলার এইচএসসি নিয়ে আগের সিদ্ধান্তই বহাল, ব্যাখ্যা দিল আন্তঃশিক্ষা বোর্ড
জামালপুর-৫ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য শাহ্ মো. ওয়ারেছ আলী মামুন বলেন, ‘রাস্তার উন্নয়নকাজের বিষয়টি প্রথমে স্থানীয় বাসিন্দারাই আমাকে জানান এবং উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে অনুরোধ করেন। তাই সেখানে গিয়েছিলাম। শুরুতে আমিও এটিকে একটি বৈধ প্রকল্প বলেই মনে করেছিলাম।’
একই ব্যক্তি আরেকটি রাস্তার কাজের কথা জানালে আমার সন্দেহ হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তখন এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে প্রকল্পটির দরপত্রের বিষয়ে জানতে চাই। তারা জানায়, ওই রাস্তার কোনো দরপত্রই হয়নি। এরপর আমি দ্রুত এলাকায় লোক পাঠিয়ে বিষয়টি যাচাই করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর দলীয় নেতাকর্মীদের সহায়তায় চক্রের মূল হোতাসহ ১১ জনকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করে কারাগারে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতারণার সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’
জামালপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নাজনীন আখতার বলেন, ‘উদ্বোধনের বিষয়টি আমি জানতাম না। পরে সংসদ সদস্য জানতে চাইলে খোঁজ নিয়ে দেখি সেখানে কোনো কাজই হচ্ছে না। বিষয়টি তাঁকে জানানো হয়। এরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রতারক চক্রকে গ্রেপ্তার করে এবং মামলা হয়।’
এলজিইডি জামালপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী রোজদিদ আহম্মেদ বলেন, ‘বিষয়টি আমি ফেসবুকের মাধ্যমে জেনেছি। ওই সড়কের কোনো উন্নয়নকাজের দরপত্রই হয়নি। ইট না থাকায় মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যে সড়কটি সংস্কারের উদ্যোগ নেব।’