৫০ হাজার টাকা অনুদানের জন্য ঘুষ নিতেন ২০ হাজার, সুস্থ মানুষকে বানাতেন ক্যান্সার রোগী
সুস্থ মানুষদের ক্যান্সার-সহ বিভিন্ন জটিল রোগে অসুস্থ দেখিয়ে ভুয়া চিকিৎসাপত্র দাখিল করে ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে সরকারের কল্যাণ তহবিলের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে সমাজসেবা অফিসের এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে। সম্প্রতি এক ভুক্তভোগীর অভিযোগের পর এমনই এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে।
এই অভিনব প্রতারণায় অভিযুক্ত কর্মচারীর নাম মোবারক হোসেন। তিনি পাবনা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের অফিস সহায়ক পদে কর্মরত। ২০১৮ সালে এই পদে যোগদান করেন তিনি। অভিযুক্ত মোবারক বেড়া উপজেলার রানীগ্রামের বাসিন্দা জহির খানের ছেলে।
ভুক্তভোগী শাকিল খান জালিয়াতির এ ঘটনার প্রতিকার চেয়ে গত ২০ জুন রাজশাহী বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের পরিচালকের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ করেন। শাকিল খান বেড়া উপজেলার জাতসাখিনী ইউনিয়নের রানীনগর গ্রামের বাসিন্দা।
অভিযোগের ভিত্তিতে বেড়া উপজেলার তৎকালীন সমাজসেবা কর্মকর্তা মোতালেব সরকার তদন্ত করে রাজশাহী বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ে একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন। সেই প্রতিবেদনে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
জানা যায়, প্রতিবেশী হওয়ার সুবাদে ২০২২ সালে শাকিল খানের স্ত্রী লিপি খাতুনের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও ছবি কৌশলে সংগ্রহ করেন মোবারক হোসেন। সম্প্রতি শাকিল পারিবারিক প্রয়োজনে স্ত্রীর নামে একটি নতুন ব্যাংক হিসাব খুলতে গিয়ে জানতে পারেন, রুপালি ব্যাংকের নগরবাড়ী ঘাট শাখায় তার স্ত্রীর নামে আগেই একটি অ্যাকাউন্ট খোলা রয়েছে।
পরবর্তীতে সংগৃহীত ব্যাংক স্টেটমেন্ট থেকে দেখা যায়, ২০২৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ওই অ্যাকাউন্টে সরকারি অনুদানের ৫০ হাজার টাকা জমা হয় এবং এর দুইদিন পরেই ৭ সেপ্টেম্বর রুপালি ব্যাংক পাবনা করপোরেট শাখা থেকে সেই টাকা তুলে নেওয়া হয়। পুরো প্রক্রিয়ার চেক বইটিও মোবারক নিজের জিম্মায় রেখেছিলেন।
এই ঘটনার পর শাকিল বেড়া উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, তার সুস্থ স্ত্রী লিপি খাতুনকে কাগজপত্রে ক্যান্সার আক্রান্ত জটিল রোগী সাজিয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিশেষ তহবিল থেকে এই অনুদান অনুমোদন করানো হয়েছিল।
ভুক্তভোগী লিপি খাতুনের স্বামী শাকিল খান বলেন, আমি লেখাপড়া জানি না। পরিচিত ও প্রতিবেশী হওয়ার সুবাদে মোবারক আমাকে না জানিয়ে আমার স্ত্রীর কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি সংগ্রহ করেছিলেন। পরে আমার সুস্থ বউকে খাতা-কলমে ক্যান্সার রোগী বানিয়ে টাকা তুলেছে। আমার স্ত্রী লিপি খাতুন সম্পূর্ণ সুস্থ এবং তিনি কখনও ক্যান্সার বা অন্য কোনো মরণব্যাধীতে আক্রান্ত হননি। এ ঘটনার বিচার চেয়ে আমি অভিযোগ দিয়েছি।
অভিযোগের পর তৎকালীন বেড়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোতালেব সরকার তদন্ত করেন এবং প্রাথমিকভাবে জালিয়াতির প্রমাণ উঠে আসে। গত ২৫ জুন তিনি বিভাগীয় কার্যালয়ে প্রতিবেদন পাঠান। প্রতিবেদনে লিপি খাতুনের নামে সরকারি অনুদানের অর্থ উত্তোলনের প্রমাণাদি সংযুক্তি দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে মোবারকের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ বারবার এসেছে বলেও উল্লেখ করেছেন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মোবারকের এই জালিয়াতি এটিই প্রথম নয়। ক্যান্সার, কিডনি বা লিভার সিরোসিসের মতো জটিল রোগীদের জন্য বরাদ্দ অনুদানের সরকারি চেক পাইয়ে দিতে তিনি গ্রামের অসহায় দরিদ্র মানুষদের কাছ থেকে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায় করতেন। আর সুস্থ মানুষদের ভুয়া মেডিকেল সার্টিফিকেট তৈরি করে, তাদের অজান্তে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে সমাজসেবা অধিদপ্তরে বরাদ্দকৃত টাকা নিজেই তুলে নেন তিনি।
রানীগ্রামের বাসিন্দা কামরুল ইসলাম জানান, ২০২২ সালে তার ক্যান্সার আক্রান্ত বাবা রেজাউলের জন্য ৫০ হাজার টাকা সরকারি অনুদান মঞ্জুর হলে, অর্থ ছাড় করার জন্য মোবারক অগ্রিম ২০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছেন তার কাছ থেকে।
একই গ্রামের গৃহবধূ হাসি আক্তার জানান, মোবারক আত্মীয় হওয়া সত্ত্বেও আমার সাথেও প্রতারণা করেছে। আমার স্বামী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন, তার কাগজপত্র নিয়ে মাসের পর মাস মোবারকের পেছনে ঘুরেও কোনো সরকারি অনুদান পাইনি। অথচ আমার দেবর সাব্বির কোনো রোগে আক্রান্ত না হলেও ২০২২-২৩ সালে তার নামে ৫০ হাজার টাকার চেক তুলে মোবারক নিজে হজম করেছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত মোবারক হোসেন বলেন, আমি এমন অবৈধ কাজের সঙ্গে জড়িত না। একটি কুচক্রী মহল আমার ক্ষতি করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে ষড়যন্ত্র করছে। প্রমাণের কথা উল্লেখ করতেই আর কোনো মন্তব্য না করেই তিনি মোবাইলের সংযোগ কেটে দেন।
দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পাবনা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক আব্দুল কাদের বলেন, চলতি অর্থ বছরে অনুদানের অর্থ নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই। অনুদানের অর্থ প্রদানে জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জন ও সমাজসেবা অফিসের ঊর্ধ্বতনদের নিয়ে যাচাই কমিটি রয়েছে। ভুয়া কাগজে অনুদানের সুযোগ নেই। টাকা যায় সরাসরি ভাতাভোগীর অ্যাকাউন্টে। আর একজন পিয়ন কীভাবে অনুদান মঞ্জুর করবে?
তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, এটা আপনি পেলেন কী করে? অফিসের যে লোক আপনাকে এটা দিয়েছে, আমি তার বারোটা বাজাবো।
বেড়া উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের নবাগত কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমি নতুন যোগদান করেছি, এখনো দায়িত্ব বুঝে নেওয়া হয়নি। স্যার আমার কাছে কাগজপত্র পাঠিয়েছেন। আগামী রোববারে আসেন, কাগজপত্র দেখে কথা বলতে পারবো।
পাবনা জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি তার নজরে এসেছে। সরকারি অনুদানের বিষয়ে যেহেতু অনিয়মের অভিযোগ এসেছে, তা অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করতে হবে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।