দেশে ১ বছরে ঘুষ লেনদেন হয়েছে ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকার
দেশের সরকারি সেবাখাতগুলোর মধ্যে দুর্নীতি ও হয়রানির অভিযোগে সবচেয়ে শীর্ষে অবস্থান করছে পাসপোর্ট অফিস। এর ঠিক পরেই দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) পরিচালিত এক সাম্প্রতিক জরিপে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর ধানমণ্ডির মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘সেবাখাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’-এর চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করেছে টিআইবি।
টিআইবি’র জরিপ অনুযায়ী, দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে সেবা নিতে গিয়ে বিপুলসংখ্যক নাগরিককে নিয়মিত ঘুষ, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য, অযৌক্তিক সময়ক্ষেপণ এবং নানা ধরনের পদ্ধতিগত হয়রানির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। পাসপোর্ট সেবার ক্ষেত্রে আবেদন জমা, পুলিশ ভেরিফিকেশন এবং পাসপোর্ট ডেলিভারির প্রতিটি ধাপে অনিয়মের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে, ড্রাইভিং লাইসেন্স গ্রহণ, যানবাহনের নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) ও ফিটনেস সনদ সংক্রান্ত সেবা নিতে গিয়ে বিআরটিএ-তেও গ্রাহকেরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। টিআইবি’র পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, সরকার ডিজিটালাইজেশনের উদ্যোগ বাড়ালেও মাঠপর্যায়ে দালাল ও দুর্নীতির প্রভাব এখনো কমেনি।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন,‘বাংলাদেশ ইউএনডিপি’র গ্লোবাল ডিজিটাল গভর্ন্যান্স সূচকে অবকাঠামোগতভাবে ভালো অবস্থানে থাকলেও আমরা সেই ডিজিটাল সেবার সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছি না। সেবাখাতে ঘুষের এক ধরনের ‘প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ’ ঘটে গেছে। সেবাগ্রহীতাদের অনেকেই জানিয়েছেন, ঘুষ না দিলে কোনো সেবা পাওয়া যায় না, এটিকে একটি নির্মম বাস্তবতায় পরিণত করা হয়েছে।’
জরিপের সবচেয়ে আশঙ্কাজনক দিক হলো, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের (২০২৩ সাল) তুলনায় ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেবাখাতে দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশের সেবাগ্রহীতাদের ৮১.৬% কোনো না কোনো খাতে দুর্নীতির শিকার হয়েছেন, যা ২০২৩ সালের জরিপে ছিল ৭০.৯%।
এই দুর্নীতিকে বৈষম্যমূলক আখ্যা দিয়ে টিআইবি জানায়, যারা ক্ষমতার ব্যবহার করতে পারেন তারা পার পেয়ে যান, কিন্তু সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষ চরম বঞ্চিত হন। জরিপে দেখা গেছে, শহরাঞ্চলের (৫৮.৫%) তুলনায় গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী ৬৬% খানা (পরিবার) বেশি ঘুষের শিকার হয়েছে। তবে পরিমাণের দিক থেকে গ্রামীণ অঞ্চলের চেয়ে শহরের মানুষকে বেশি অঙ্কের ঘুষ দিতে হয়েছে। এছাড়া বেশ কিছু খাতে নারী, আদিবাসী ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী তুলনামূলক বেশি দুর্নীতির শিকার হচ্ছেন।
২০২৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে প্রাক্কলিত মোট ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২,৬৩৩.২ কোটি টাকা। এটি ২০২৩ সালের তুলনায় ১৫.৯% বেশি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত জাতীয় বাজেটের ১.৫৮%। ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে খানাপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ ৯.৮% কমলেও সামগ্রিকভাবে বিচার সংশ্লিষ্ট সেবা, ব্যাংকিং এবং ভূমি (ভূমি অফিস) খাতে গড় ঘুষের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও বিচারসংশ্লিষ্ট সেবায় দুর্নীতি ও ঘুষের উচ্চ হার অব্যাহত রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির প্রধান বাধা। পাশাপাশি কৃষি, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পাসপোর্ট ও বিআরটিএ-র মতো জনগুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতেও দুর্নীতি ও ঘুষের হার উচ্চ পর্যায়ে স্থির রয়েছে।
দুর্নীতি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অকার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টিআইবি। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, শাস্তির কোনো নিশ্চয়তা না থাকায় দুর্নীতিবাজরা আশকারা পাচ্ছে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রায় ২৬% মানুষ দুদক সম্পর্কে জানলেও, অনিয়মের বিরুদ্ধে দুদকে অভিযোগ জানিয়েছেন মাত্র ০.৯% মানুষ। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে, সাধারণ জনগণের মাঝে দুদকের ওপর এখনো কোনো কার্যকর আস্থা তৈরি হয়নি।
সেবাখাতকে দুর্নীতি ও হয়রানিমুক্ত করতে টিআইবি ১০টি সুনির্দিষ্ট সুপারিশমালা পেশ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, প্রতিটি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে আধুনিক ও যুগোপযোগী আচরণবিধি প্রণয়ন করা এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সেবা প্রদান নিশ্চিত করা। সেবা গ্রহণের পর নাগরিকদের তাৎক্ষণিক মতামত (ফিডব্যাক) নেওয়ার ব্যবস্থা করা, যা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বার্ষিক কর্মমূল্যায়নের ভিত্তি হিসেবে গণ্য হবে। হয়রানি কমাতে সরকারের অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে আরও সহজ, ব্যবহারবান্ধব এবং এর ব্যাপক প্রচারণা চালানো। প্রতিটি অফিসে ডিজিটাল অভিযোগ বাক্স স্থাপন, এসএমএস, ই-মেইল এবং ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অভিযোগ গ্রহণ চালু করা।
এছাড়া দুর্নীতি দমনে টোল-ফ্রি হটলাইন ব্যবস্থা কার্যকর করা এবং দুদকের ‘১০৬’ হটলাইনের কার্যকারিতা বাড়িয়ে জনগণের মাঝে এর ব্যাপক প্রচার নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। নাগরিকদের যদি অবিলম্বে হয়রানিমুক্ত ও স্বচ্ছ সেবা নিশ্চিত করা না যায়, তবে দেশ থেকে দুর্নীতির এই সংস্কৃতি দূর করা অসম্ভব হয়ে পড়বে বলে সংবাদ সম্মেলনে সতর্ক করা হয়।