চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের সেকেন্ড ইন কমান্ড ইমন ঢাকায় গ্রেফতার
গোয়েন্দা সংস্থার সরবরাহকৃত গোপন তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত অভিযানে চট্টগ্রামের বহুল আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের সেকেন্ড ইন কমান্ড মোবারক হোসেন ইমনকে ঢাকার গুলশান থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
সোমবার (২২ জুন) রাত প্রায় ১০টায় রাজধানীর গুলশান-২ এলাকার ‘হোটেল আমারি’ থেকে তাকে আটক করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে পলাতক থাকা এই কুখ্যাত সন্ত্রাসীর গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামের সংগঠিত অপরাধ নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।
গ্রেফতারকৃত মোবারক হোসেন ইমন চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার বাসিন্দা এবং মো. মুসার পুত্র। পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়, ইমন চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ডের এক পরিচিত ও ভয়ঙ্কর নাম। বিদেশে (ভারতে) পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের পক্ষে দেশের মাটিতে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও অস্ত্রবাজির মাধ্যমে চট্টগ্রাম মহানগরীর বড় ব্যবসায়ী ও বাণিজ্যপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে আসছিল সে। অপরাধ জগতে ইমন ‘অভিজ্ঞ শুটার’ ও ভাড়াটে খুনি হিসেবে কুখ্যাত।
৭টি মামলার আসামি, জোড়া খুনসহ গুরুতর অভিযোগ
মোবারক হোসেন ইমনের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানায় অন্তত ৭টি গুরুতর অপরাধমূলক মামলা বিদ্যমান। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো গত ৩০ মার্চ ২০২৫ তারিখে চট্টগ্রামের বাকলিয়া এলাকায় সংঘটিত জোড়া খুনের মামলা। এ ঘটনায় বখতিয়ার হোসেন ওরফে মানিক ও আব্দুল্লাহ আল রিফাত নামে দুজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া গত ২৩ মে ২০২৫ তারিখে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় কুখ্যাত সন্ত্রাসী ‘ঢাকাইয়া আকবর’ হত্যা মামলায়ও তার নাম রয়েছে। চাঁদাবাজি, অস্ত্রের ব্যবহার, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং অপরাধী নেটওয়ার্কে সহযোগিতার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
হাইকোর্টের জামিনে বেরিয়ে পলাতক
উল্লেখযোগ্য, চট্টগ্রামের বাকলিয়া থানার জোড়া খুনের মামলায় গত ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে হাইকোর্ট থেকে ছয় সপ্তাহের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পেয়েছিল ইমন। এই জামিন পাওয়ার পরপরই সে পলাতক হয়ে যায়। ভয়ঙ্কর এই সন্ত্রাসীর উচ্চ আদালত থেকে জামিন প্রাপ্তির ঘটনাটি সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল এবং বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
বড় সাজ্জাদ চক্রের বিস্তৃত অপরাধ সাম্রাজ্য
পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম নগরের চান্দগাঁও, বায়েজিদ বোস্তামী ও পাঁচলাইশ এবং জেলার হাটহাজারী, রাউজানসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় বড় সাজ্জাদের বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে আসছে। ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর বড় সাজ্জাদের নেটওয়ার্কের মাঠ পর্যায়ের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন মোবারক হোসেন ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান নামে দুজন। এই নেটওয়ার্কে অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছে বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে। ভারত থেকে বড় সাজ্জাদ তার অনুসারীদের নিয়মিত নির্দেশনা দিয়ে থাকে।
সাংবাদিককে ৫০ লাখ টাকার চাঁদার দাবি ও হত্যার হুমকি
সম্প্রতি মোবারক হোসেন ইমন নতুনভাবে আলোচনায় আসেন চট্টগ্রামের একজন সাংবাদিককে হুমকি প্রদানের ঘটনায়। চলতি বছরের ৯ মে বিদেশি নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপ কলে বেসরকারি টেলিভিশনের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক বিপ্লব দে পার্থের কাছে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গুলি করে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। পরে হোয়াটসঅ্যাপে একটি ভয়ঙ্কর অডিও বার্তাও পাঠানো হয়, যেখানে বলা হয়, 'পুরো শরীরে এমনভাবে গুলি করা হবে, বোলতার বাসা বানিয়ে ফেলব।' এ ঘটনায় ভুক্তভোগী সাংবাদিক চট্টগ্রামের কোতোয়ালি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের করেন।
গ্রেফতারের পর মোবারক হোসেন ইমনকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চট্টগ্রামের অপরাধচক্রের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ও অস্ত্র সরবরাহ সম্পর্কিত গোপন তথ্য উদ্ধারের আশা করছে পুলিশ। একইসঙ্গে বড় সাজ্জাদের আরেক শীর্ষ সহযোগী পলাতক সন্ত্রাসী মোহাম্মদ রায়হান এবং জঙ্গল সলিমপুরের সন্ত্রাসী ইয়াসিনকে গ্রেফতারেও অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জোর দিয়ে বলছেন, যেন কোনো অবস্থাতেই ইমন আর ছাড়া না পায়, সে বিষয়টি আদালতের মাধ্যমে নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
গোয়েন্দা সংস্থার গোপন তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত এই সফল অভিযান চট্টগ্রামের সংগঠিত অপরাধ নির্মূলে রাষ্ট্রের সম্মিলিত নিরাপত্তা কাঠামোর কার্যকারিতার প্রমাণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইমনের গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে বড় সাজ্জাদ চক্রের মেরুদণ্ড ভাঙার দিকে একধাপ এগিয়ে গেল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।