অপহরণ আতঙ্কে সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের হচ্ছে না টেকনাফের মানুষ
কক্সবাজারের টেকনাফে ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে আবারও পাহাড়কেন্দ্রিক অপহরণের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকা ও দুর্গম জনপদগুলোতে সাধারণ মানুষের মাঝে বাড়ছে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা। বিশেষ করে পাহাড়ঘেঁষা বাহারছড়া ইউনিয়নের গ্রামগুলোতে সন্ধ্যার পর মানুষের চলাচল কমে গেছে। স্থানীয়দের দাবি, বিগত ঈদগুলোতেও টেকনাফের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় একাধিক ব্যক্তি অপহরণের শিকার হয়েছেন। অনেককে মুক্তিপণের মাধ্যমে ফিরে আসতে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনার কারণে ঈদ এলেই সাধারণ মানুষের মাঝে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়। জাহাজপুরার স্থানীয় বাসিন্দা মৌলানা জাকের হোসেন জানান, ঈদকে সামনে রেখে পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় অপহরণের আতঙ্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।
টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গেল বছর টেকনাফ সদর, বাহারছড়া,হ্নীলা ও হোয়াইক্যং ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে অপহণের শিকার হয়েছে অন্তত দেড় শতাধিক ব্যক্তি। পাহাড়ি এলাকাগুলোতে অপহরণের ঘটনা ঘটছে বেশি। অপহরণের শিকার হচ্ছেন কৃষক, শ্রমিক, কাঠুরিয়া, বনকর্মী সিএনজি অটোরিকশা ও টমটম চালক, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ ব্যবসায়ীরা। অপহরণের পর অনেকেই মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের মুখে ফিরতে পারলেও কেউ কেউ হয়েছেন গুম-খুনের শিকার। টেকনাফের এসব পাহাড়ি এলাকায় অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায় নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। অপহরণকারীদের হাতে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় মারণাস্ত্র।
কচ্ছপিয়া এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা রহিম উল্লাহ জানান, ‘গত ১৮ মে কচ্ছপিয়া নিজ বাড়ি থেকে তার চাচাকেও অপহরণকারীরা তুলে নিয়ে যায়। পরে পরিবারের সদস্যরা অনেক চেষ্টা ও যোগাযোগের পর ৮ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে তাকে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন। তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনার কারণে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ঈদকে সামনে রেখে সাধারণ মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় যাতায়াতেও ভয় পাচ্ছেন।’
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি পাহাড়কেন্দ্রিক সন্ত্রাসী ও অপহরণকারী চক্রের তৎপরতা বৃদ্ধির গুঞ্জনে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। কৃষক, জেলে, প্রবাসী, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা প্রয়োজন ছাড়া পাহাড়ি এলাকায় সন্ধ্যার সময় সাহস পাচ্ছেন না।
গত ১৬ মে নোয়াখালী পাহাড়িপাড়ার একটি ঝুপড়ি ঘরে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েন অপহৃত হোছেন আলীর স্ত্রী রুজিনা বেগম। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘গভীর রাতে হঠাৎ দরজায় জোরে জোরে ধাক্কা দেওয়া হচ্ছিল। এত রাতে কারা এসেছে জানতে চাইলে বাইরে থেকে বলা হয়। আমরা শামলাপুর পুলিশ ফাঁড়ি থেকে এসেছি, দরজা খোলেন। পুলিশ পরিচয় দেওয়ায় ভয় পেয়ে দরজা খুলে দিই। সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্রধারী ছয়জন ঘরে ঢুকে আমার স্বামীকে ধরে বাইরে নিয়ে যায়। অপহৃতের স্ত্রী রুজিনা বেগম বলেন, আমি চিৎকার করতে চাইলে একজন আমার মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে ভয় দেখায়। পরে তিনজন মিলে আমার স্বামীকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যেতে থাকে। আমি দৌড়ে সামনে গিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তারা তিন রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এরপর আমার স্বামীকে নিয়ে পাহাড়ের দিকে চলে যায়।’
স্থানীয় এক ইউপি সদস্য মোহাম্মদ রফিক বলেন, ‘ঈদ সামনে রেখে সাধারণ মানুষের মাঝে ভয় কাজ করছে। বিশেষ করে পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় যাতায়াতকারী মানুষ আতঙ্কে আছে।’
টেসাসের আহ্বায়ক মমতাজুল ইসলাম মনু জানান, ‘বিশেষ করে পাহাড়কেন্দ্রিক এলাকাগুলোতে মানুষের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও তৎপরতা ও সমন্বিত অভিযান প্রয়োজন, যাতে সাধারণ মানুষ স্বস্তিতে চলাফেরা করতে পারে এবং ঈদকে ঘিরে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়।’
বাহারছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বলেন, ‘ঈদের আগে অপহরণের আশঙ্কা রয়েছে। খবর নিয়ে জানা যায় বর্তমান মহেশখালী থেকে ডাকাত দলের একটি টিম পাহাড়ে অবস্থান করছে। এই ডাকাত দলের বিষয়ে আমি প্রশাসন কে অবগত করেছি। প্রশাসন তাদের শনাক্ত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। টেকনাফ মডেল থানার ওসি বলেন, পাহাড়কেন্দ্রিক যে কোনো অপরাধ দমনে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় টহল টিম জোরদার করা হয়েছে। অপহরণ বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিষয়ে কেউ কোনো তথ্য পেলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোর অনুরোধ করছি।’