জনপ্রতি লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগ দিলেন এমপিওভুক্ত শিক্ষক!
ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য এবং চাকরিচ্যুত কর্মীদের সঙ্গে প্রতারণার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান আক্তারুজ্জামান (যিনি একই সাথে একটি কলেজের শিক্ষক) এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. হাসানুল হোসেনের যোগসাজশে এই সিন্ডিকেট পরিচালিত হচ্ছে বলে ভুক্তভোগীদের দাবি। এ ঘটনায় নিয়োগবঞ্চিত ১১ জন কর্মী প্রতিকার চেয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
গত বছর আউটসোর্সিংয়ে নিয়োগ পাওয়া ১১ কর্মীর মধ্যে ৯ জনকে বাদ দিয়ে মাত্র ২ জনকে পুনর্নিয়োগ দেয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হাসানুল হোসেন। নিয়োগ বাতিল হওয়া ৯ জনের দাবি, ১০০ টাকা মূল্যের তিনটি স্ট্যাম্পে তাদের নিয়োগ নবায়নের কাগজপত্র সম্পন্ন করা হয়। নবায়নের পর জনপ্রতি ৬০ হাজার টাকা দাবি করেন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।
নিয়োগবঞ্চিত বাবুর্চি মাহমুদুল হাসান সম্রাট বলেন, ‘আমরা ১৪ মাস ধরে কাজ করেছি। এর মধ্যে মাত্র চার মাসের বেতন পেয়েছি। সেই বেতন থেকেও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বিভিন্ন অজুহাতে জনপ্রতি ৪ হাজার টাকা কেটে নিয়েছেন। গত ১০ মাস বিনা বেতনে কাজ করেছি নতুন চাকরির আশায়। পরে নিয়োগ নিশ্চিত করেও আমাদের বাদ দিয়ে তার আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতদের এক থেকে দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’
চাকরিচ্যুত ল্যাব সহকারী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘নিয়োগ নিশ্চিত করার পর আমাদের কাছে ৬০ হাজার টাকা দাবি করা হয়। টাকা দিতে না পারায় আমাদের বাদ দিয়ে নতুন করে জনপ্রতি এক থেকে দেড় লাখ টাকা নিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার স্বজন ও পরিচিত লোকজন রয়েছেন।’
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার আত্মীয় সোমা আক্তার নামে একজন নতুন ল্যাব সহকারী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে ফোন করা হলে তিনি কল রিসিভ করলেও আত্মীয়তার বিষয় জানতে চাইলে লাইন কেটে দেন।
এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ড্রিন্স সার্ভিসেস লিমিটেডের মালিক আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘আমার পছন্দমতো কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। নিয়োগের বিষয়টি সিভিল সার্জন ও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলতে পারবেন। আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে আমি কিছু জানি না।’
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ফুলবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হাসানুল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘নিয়োগের বিষয়ে আমার কোনো হাত নেই। সব কার্যক্রম জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে সম্পন্ন হয়েছে।’ এরপর তিনি ফোন কেটে দেন। পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
ময়মনসিংহের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ফয়সাল আহমেদ বলেন, শুধু টেন্ডার প্রক্রিয়া আমার কার্যালয়ে হয়েছে। বাকি সব করেছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। নিয়োগ সম্পন্ন হওয়ার পর আমি অনুমোদন দিয়েছি। কে নিয়োগ পেল আর কে পেল না, তা উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা দেখবেন।
ময়মনসিংহ বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. প্রদীপ কুমার সাহা বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়োগ প্রক্রিয়া সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। তবে নিয়োগ নিয়ে কারও আপত্তি থাকলে তারা অভিযোগ দিতে পারেন। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পরে টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করায় ৯ জনের নিয়োগ বাতিল করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হাসানুল হোসেনের স্বজন ও ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের কাছ থেকে জনপ্রতি এক থেকে দেড় লাখ টাকা নিয়ে নতুন করে ৯ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
সম্প্রতি এ ঘটনায় নিয়োগবঞ্চিত ১১ আউটসোর্সিং কর্মী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, তারা ফুলবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিভিন্ন পদে আউটসোর্সিং কর্মচারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০২৬ সালের এপ্রিলে নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্ব পায় ড্রিন্স সার্ভিসেস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির মালিক আক্তারুজ্জামান।
তারা জানান, ২০২৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি নিয়োগ পাওয়ার পর প্রথম চার মাস বেতন পেলেও পরবর্তী ১০ মাস বিনা বেতনে কাজ করেছেন। তখন তাদের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব পেলে তাদের নিয়োগ নবায়ন করা হবে। পরে নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব পাওয়ার পর তারা সিভিল সার্জনের সঙ্গে চাকরি নবায়নের বিষয়ে দেখা করেন। সিভিল সার্জন তাদের চাকরি বহাল থাকবে বলে আশ্বস্ত করেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হাসানুল হোসেন জনপ্রতি ৬০ হাজার টাকা দাবি করেন। বিষয়টি সিভিল সার্জনকে জানালে তিনি বলেন, চাকরি নবায়নে কোনো টাকা লাগবে না এবং কেউ টাকা দিলে তার চাকরি থাকবে না। এরপর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চাকরি নবায়নের কথা বলে ১০০ টাকার তিনটি স্ট্যাম্পে কাগজপত্র সম্পন্ন করে। পরে দুইজনকে রেখে বাকি ৯ জনের নিয়োগ বাতিল করা হয়।
নিয়োগবঞ্চিতদের দাবি, তারা ১০ মাস বিনা বেতনে কাজ করেছেন এবং নিয়মিত হাজিরা দিয়েছেন, যার তথ্য উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কাছে সংরক্ষিত আছে। তবে নিয়োগ বাতিলের পর হাজিরা খাতা গোপন করা হয় এবং ১০ মাসের বেতনও দেওয়া হয়নি।
নিয়োগবঞ্চিত ৯ জন হলেন: ওয়ার্ড বয় শফিকুল ইসলাম, নাজমুল হোসেন, নাজমুল হাসান আকাশ, ল্যাব সহকারী মোস্তাফিজুর রহমান, বাবুর্চি মাহমুদুল হাসান সম্রাট, ওটি পরিচারক শুভ্র দেব, আয়া তাসলিমা আক্তার, পরিচ্ছন্নতা কর্মী মোরাদ আহমেদ ও নিরাপত্তা প্রহরী খাদেমুল হক।