১৮ মে ২০২৬, ১১:০৭

তনু হত্যায় মিলল আরও এক ব্যক্তির ডিএনএ, তদন্তে নতুন মোড়

সোহাগী জাহান তনু   © টিডিসি ফটো

দীর্ঘ ১০ বছর পর কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলার তদন্তে নতুন মোড় এসেছে। তনুর মরদেহ উদ্ধারের সময় জব্দ করা এক টুকরো কাপড়ে রক্তের উপস্থিতি এবং সেখানে অজ্ঞাতনামা আরও এক ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া গেছে। এর ফলে মামলায় সন্দেহভাজনের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে চারজনে।

এর আগে তনুর ওড়না, সালোয়ার ও অন্তর্বাসে তিনজন ভিন্ন পুরুষের বীর্যের উপস্থিতি এবং তাদের পৃথক ডিএনএ প্রোফাইল শনাক্ত করেছিল সিআইডি। নতুন পাওয়া ডিএনএ প্রোফাইল আগের তিনজনের সঙ্গে মিলছে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক মো. তরীকুল ইসলাম আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনে জানান, নতুন একজন অজ্ঞাত ব্যক্তির ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়ায় তদন্তে নতুন দিক উন্মোচিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘নতুন একজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়ায় এখন সন্দেহভাজনের সংখ্যা ৪ জনে দাঁড়িয়েছে। আগের তিনজনের মধ্যে একজনকে গ্রেপ্তার করে ৩ দিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে এবং ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করে পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদন এখনো আসেনি। বাকি দুইজনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।’

‘এই দুইজন দেশ ছেড়েছেন বলে তথ্য রয়েছে’—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা যাচাই করে দেখছি। খোঁজখবর নিচ্ছি এবং গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছি।’

সিআইডির ডিএনএ পরীক্ষক নুসরাত ইয়াসমিনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ওড়না, সালোয়ার ও অন্তর্বাসে মানুষের বীর্যের উপস্থিতি শনাক্ত হয়। এসব আলামতের বিভিন্ন স্থানে তিনজন ভিন্ন ভিন্ন পুরুষের পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া যায়।’

আরও বলা হয়, ‘এক টুকরো কাপড়ে রক্তের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়। তাতে একজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির পূর্ণাঙ্গ ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া যায়। যা সালোয়ার, ওড়না ও অন্তর্বাসে পাওয়া বীর্যের সঙ্গে এই ডিএনএ প্রোফাইলের মিল নেই।’

প্রতিবেদন অনুযায়ী, তনুর দাঁত, কামিজ ও অন্তর্বাসে পাওয়া রক্তের ডিএনএ একই নারীর সঙ্গে মিলে গেছে, যা তনুরই বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে কামিজ, অন্তর্বাস, ভ্যাজাইনাল সোয়াব ও কাপড়ে বীর্যের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।

মামলার তদন্তে সন্দেহভাজন হিসেবে যাদের নাম এসেছে তারা হলেন কুমিল্লা সেনানিবাসের ১২ ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নের সার্জেন্ট মো. জাহিদুজ্জামান, স্ট্যাটিক সিগন্যালের ওয়ারেন্ট অফিসার মো. হাফিজুর রহমান এবং ২ সিগন্যাল ব্যাটালিয়নের সৈনিক মো. শাহিন আলম। এর মধ্যে হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে তিন দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। বাকি দুইজনের একজন বিদেশে এবং আরেকজন নিখোঁজ বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

নিহত তনুর বাবা ইয়ার হোসেন শুরু থেকেই অভিযোগ করে আসছেন, ‘আমার মেয়েকে হত্যায় সেনানিবাসের আরও অনেকে জড়িত।’ তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে হত্যায় সন্দেহভাজন তিনজন ছাড়াও আরও অনেকে জড়িত। আমি ছয়জনের নাম লিখিতভাবে দিয়েছি। তারা সেগুলো আমলে নেয় না। কারণ, এর তালিকায় শীর্ষ সেনাকর্মকর্তারা রয়েছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘ম্যাডাম আমার মেয়েকে হুমকি দিয়েছিল, দেখে নেবেন বলে। তাকে দিয়ে অনুষ্ঠান করাত। সে বলত, আমি তো এখন অন্য কলেজে পড়ি। যখন লাশ পাই, তখন আমার মেয়ের চুল কাটা ছিল। মেয়েকে উদ্ধার করে কুমিল্লা সিএমএইচ হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক বলেছিলেন— তাকে আবার কেন এনেছি, সে তো মারা গেছে। আমি তো শুনেই অবাক হয়েছি।’

২০১৬ সালের ২০ মার্চ রাতে কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকার কালভার্টের পাশের ঝোপ থেকে তনুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার পর দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। গত ১০ বছরে মামলাটি চারটি তদন্ত সংস্থা ও ছয়জন তদন্ত কর্মকর্তা তদন্ত করলেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। আগামী ৮ জুন মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য রয়েছে।