শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ডের ১৩ বছর—কী হয়েছিল সেদিন, বিচার কতদূর?
১৩ বছর আগে ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশকে ঘিরে দেশের আলেম ওলামা, মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক, মসজিদের ইমাম, মুসল্লিসহ ধর্মপ্রাণ মানুষের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নির্মমতার সেই দিন। হেফাজতে ইসলাম ১৩ দফা দাবিতে এ সমাবেশের আয়োজন করে। হেফাজতের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে দিনভর উত্তেজনা ও সহিংসতা ছড়ায় তখনকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সেই রাতে রাজধানীর অন্যতম বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিলের শাপলা চত্বর ঘিরে তৈরি হয়েছিল এক ভীতিকর পরিবেশ।
তৎকালীন রাতের অভিযানে ‘অপারেশন সিকিউর শাপলা’ নামের তিন বাহিনীর সমন্বিত অভিযান পরিচালিত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। রাত ২টা ১৫ মিনিটে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে অভিযান শুরু হয় বলে দাবি করা হয়। এরপর মতিঝিল এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয় বলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলো বলছে, ওই ঘটনায় বহু মানুষ নিহত ও আহত হন এবং বহু পরিবার চরম মানবিক সংকটে পড়ে। শহীদ আবু হানিফ, শাহ আলম, নিজামুল হক, ফারহান রাজা, মোয়াজ্জেমুল হক নান্নু ও সালাউদ্দিনের পরিবারের সদস্যরা এখনো দারিদ্র্য, সামাজিক দুর্ভোগ ও অভিভাবকহীন অবস্থায় জীবনযাপন করছেন।
একাধিক পরিবারের অভিযোগ, নিহতদের পরিবারগুলো দীর্ঘদিন ধরে অর্থকষ্ট, সামাজিক নিগ্রহ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। অনেক পরিবার ঋণের বোঝা ও চিকিৎসার অভাবে চরম দুর্দশায় দিন কাটাচ্ছে।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও আহতরা জানান, সেদিন হাজারো মানুষের ওপর বলপ্রয়োগ করা হয় এবং ব্যাপক গুলি ও টিয়ারশেল ব্যবহার করা হয়। তবে সঠিক মৃতের সংখ্যা আজও স্পষ্ট নয়। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ৫০-এর বেশি মৃত্যুর তথ্য দিলেও সরকারি পর্যায়ে তা অস্বীকার করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে ‘রক্তপাতহীন অভিযান’ হিসেবে দাবি করা হয় এবং মৃত্যুর অভিযোগ অস্বীকার করা হয়। মানবাধিকার সংস্থার প্রকাশিত তথ্য নিয়েও বিতর্ক দেখা দেয়।
১৩ বছর পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যা জানালো
২০১৩ সালের মে মাসে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে ৫৭ জনের হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩০ জনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম সম্প্রতি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতের সমাবেশকে কেন্দ্র করে দেশের তিনটি স্থানে হত্যাকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেছে। ঢাকায় দিনের বেলা ও রাতে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। পরদিন নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।
সে সময় ঢাকায় হত্যাকাণ্ডের শিকার ৩২ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জে ২০ জন এবং চট্টগ্রামে ৫ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন বলে সন্ধান পাওয়া গেছে। নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্তের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।
এ মামলার তদন্তকাজ শিগগিরই শেষ হবে। তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ৭ জুন দিন ধার্য আছে।
আলোচিত এ গণহত্যার আসামী যারা- সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক (টুকু) মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক, হাসান মাহমুদ খন্দকার ও বেনজীর আহমেদ, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার, পুলিশের সাবেক উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোল্যা নজরুল ইসলাম প্রমুখ।