০৩ এপ্রিল ২০২৬, ১৮:০৩

আরাকান আর্মির দৌরাত্ম্যে বেকায়দায় টেকনাফের জেলেরা, ২ বছরে ৫০০ অপহরণ

শাহপরীর দ্বীপ  © সংগৃহীত

মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা কক্সবাজারের টেকনাফের নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর এলাকার জেলেদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলেদের কাছ থেকে অবৈধ মাসোহারা আদায়ে অলিখিত ‘চুক্তি’ চাপিয়ে দিতে চাইছে সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি। জেলেরা তা মানতে অস্বীকৃতি জানালে অপহরণের মতো ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। কখনও কখনও গুলি চালানো হচ্ছে মাছ ধরার ট্রলার লক্ষ্য করে। এমন পরিস্থিতিতে বেকায়দায় পড়েছেন টেকনাফের জেলেরা। 

সবশেষ গত শনিবারও তিনটি মাছ ধরার নৌকা লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছে। পরে অস্ত্রের মুখে ১৪ জেলেকে অপহরণ করা হয়। এতে সীমান্তবর্তী জেলে পল্লিতে ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক জেলেই এখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরে যেতে ভয় পাচ্ছেন। ফলে জীবিকা নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। যদিও তিনদিন পর দুই লাখ টাকার মুক্তিপণে এই ১৪ জেলে নিজেদের প্রচেষ্টায় শরীরে আঘাতের চিহ্ন নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ পশ্চিম সৈকতে এসে পৌছেন। তবে কেউ মুক্তিপণের বিষয়টি স্বীকার করেননি। 

সীমান্তের বন্দর ব্যবসায়ী ও জেলেরা জানান, এর আগেও আরাকান আর্মি মিয়ানমার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের পর গত বছর জানুয়ারির মাঝামাঝি টেকনাফ স্থলবন্দর ও সীমান্ত বাণিজ্যে পণ্যবাহী জাহাজ থেকে কমিশন দাবি করেছিল। তা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সে সময় মিয়ানমার ইয়াংগুন থেকে আসা পণ্যবাহী তিনটি জাহাজ আটকে রেখে ১৬ দিন পর ছেড়ে দেয়। ওই ঘটনার কিছু দিন পর থেকে সীমান্ত বাণিজ্য কার্যক্রম প্রায় ১১ মাস বন্ধ। এতে সরকার প্রায় ৫০০ কোটি টাকা রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। নতুন করে এবার জেলেদের লক্ষ্য করে ‘চুক্তি’ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।  

জেলেপল্লিতে আতঙ্ক

টেকনাফ পৌর শহর থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে শাহপরীর দ্বীপ। সেখানকার বাসিন্দাদের অধিকাংশের পেশা জেলে। নাফ নদী ও সাগরে মাছ ধরে তারা জীবিকা নির্বাহ করেন। শাহপরীর দ্বীপে আছে ছয়টি জেলে ঘাট। সেখানে ছোট-বড় সাত-আটশ মাছ ধরার নৌকা রয়েছে। তবে আরাকান আর্মির দাপটে এখন অনেক জেলেই মাছ ধরতে যাচ্ছেন না। 
  
এ ব্যাপারে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ পশ্চিমপাড়া ঘাটের বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল গফুর বলেন, ‘আরাকান আর্মির কারণে জীবিকা ও নিরাপত্তা দুটিই সংকটে। হাজারো জেলে পরিবারের জীবিকা এখন হুমকির মুখে। একদিকে অপহরণ ও গুলির ভয়, অন্যদিকে আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় দিশেহারা তারা।’

তিনি আরো বলেন, ‘নাফ নদীর নাইক্ষ্যংদিয়া ও সেন্টমার্টিন থেকে আরাকান আর্মি অস্ত্রের মুখে জেলেদের অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে। কারণ কিছু জেলে এক থেকে দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে ‘চুক্তি’ (পাস) করেছে। আরাকান আর্মির সদস্যরা চাইছে, বাকি জেলেরাও যাতে ‘চুক্তি’ করে। এ কারণেই চাপে ফেলতে অপহরণ ও গুলি চালানো হচ্ছে। আমরা সরকারে সুদৃষ্টি কামনা করছি। তা না হলে কেউই সাগরে যেতে পারব না। জেলেরা এখন জীবনের ভয় নিয়ে দিন কাটাচ্ছে।’

জেলে নুর আমিন বলেন, ‘আরাকান আর্মির দাপটে জেলেরা অতিষ্ঠ। কোনোভাবেই এর সুরাহা হচ্ছে না।’

মুক্তিপণে ফিরেছেন ১৪ জেলে! 

সর্বশেষ গত শনিবার আরাকান আর্মির হাতে অপহৃত জেলে পরিবারের সদস্যরা প্রিয়জন ফেরার প্রতীক্ষায় দিন শেষ হয়েছে। তারা স্থানীয় কিছু লোকজনের সহতায় রাতের আঁধারে টেকনাফে ফিরেছেন। অভিযোগ উঠেছে,  দুই লাখ টাকার মুক্তিপণে তারা ফিরে এসেছেন। তবে এবিষয়ে কেউ কথা বলতে রাজি হয়নি।  কিন্তু ফেরত আসা জেলেদের অনেকের শরীরের বিভিন্ন আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। 

ফেরত আসা জেলে রহিম উল্লাহ বলেন, ‘আমরা মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি। কেননা এখনো আরাকান আর্মির জিম্মি দশায় অনেক জেলে রয়েছে। তাই আমরা সৌভাগ্যবান। তবে ওই গুলি ছুঁড়ে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর ব্যাপক মারধর করা হয়েছে, খাবারও দেওয়া হয়নি। খুব কষ্টেয় ছিলাম। পরে পরিবারের প্রচেষ্টায় আমরা ফিরে এসেছি।' 

এ বিষয়ে শাহপরীর দ্বীপ পশ্চিমপাড়া জেলে সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল গফুর বলেন, ‘রাতের আঁধারে জেলেরা ফিরে এসেছে। তবে তাদের মুক্তির পেছনে 'টাকার  লেনদেন' রয়েছে এতে কোন সন্দেহ নেই। কেননা ধরে নিয়ে যাওয়ার পর খুব কম সময়ে ছেড় দেওয়ার নজির নেই। যদিও খুশি হয়েছি জেলেরা পরিবারের মাঝে ফিরে আসায়।’ 

কিছু পরিবারের থামছে না কান্না

গত সাত মাস আগে মাছ শিকারের সময়ে নাফনদী থেকে ধরে নিয়ে গেছে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ মাঝের পাড়া বাসিন্দা কবির আহমেদ রবি আলম। এছাড়া আরও অনেক পরিবার রয়েছে স্বজনদের অপেক্ষায়। 

অপহৃত জেলে রবি আলমের বাব আবদুল আজিজ বলেন, ‘ছেলের আয়ে আমাদের সংসার চলতো। কিন্তু সাত মাস ধরে ছেলে মিয়ানমারে আরাকান আর্মির হাতে বন্দী রয়েছে। আমাদের দিন কাটে খেয়ে-না খেয়ে। পরিবার সন্তানদের জন্য সারা দিন কাঁদতে থাকে। তাদের সান্তনা দেওয়ার মতো কোন জবাব নেই আমার। আমার একটাই দাবি, যে কোনো মূল্যে সন্তানরা যেন আমার কোলে ফিরে আসে।’

বন্দিদশায় অমানুষিক নির্যাতন

এদিকে গত দুই বছরে বিভিন্ন সময়ে আরাকান আর্মি অন্তত ৫০০ জেলেকে অপহরণ করেছে। এর মধ্যে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) প্রচেষ্টায় ৩০০ জেলেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। সর্বশেষ গত ১৬ ফেব্রুয়ারি বিজিবির উদ্যোগে আরাকান আর্মির হেফাজত থেকে ৭৩ জেলেকে ফেরত আনা হয়। এসব জেলের মধ্যে অনেকেই দীর্ঘদিন অমানুষিক নির্যাতন, অপুষ্টি ও শারীরিক দুর্বলতায় ভুগেছেন।

শাহপরীর দ্বীপের জেলে নূরুল আলম, যিনি সম্প্রতি আরাকান আর্মির জিম্মিদশা থেকে ফিরে এসেছেন; তাঁর কথায় উঠে এসেছে ছয় মাসের বন্দিজীবনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। নূরুল আলম বলেন, ‘ছয় মাস পর দেশে ফিরতে পেরে স্বস্তি লাগছে। তবে সেই কষ্ট ভুলতে পারছি না। মাছ ধরে ফেরার পথে আমাদের তুলে নিয়ে যায় আরাকান আর্মি। প্রথমে মারধর, এরপর ভীতিকর পরিবেশে বন্দি রাখা হয়। অনেক সময় না খেয়েই দিন পার করতে হয়েছে। এতে আমরা কঙ্কালসার হয়ে পড়েছিলাম।’ 

তিনি আরো বলেন, ‘শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েছিলাম। প্রতিদিন কঠিন কাজ করতে বাধ্য করা হতো। দিন কাটত ভয় আর অনিশ্চয়তার মধ্যে। এখনও অনেক জেলে সেখানে বন্দি।’
 
জেলেদের ফেরত আনার চেষ্টা চলছে

টেকনাফের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমামুল হাফিজ নাদিম বলেন, ‘যেসব জেলে ওপারে আটকা আছে, তাদের ফেরত আনার চেষ্টা চলছে। কিছুদিন আগে ৭৩ জেলেকে ফেরত আনা গেছে। তবে কেউ যদি মাছ ধরার বিষয়ে ‘চুক্তি’ করে সেটি পুরোপুরি অবৈধ। এর সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি জেলেরা যাতে মাছ শিকারের সময় সীমান্ত অতিক্রম না করে সে জন্য সচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে।’

রামুর বর্ডার গার্ডের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘কোনোভাবে যাতে জেলেরা সীমান্ত অতিক্রম না করে সে জন্য বারবার সতর্ক করা হচ্ছে। পাশাপাশি আটক থাকা জেলেদের ফেরত আনার চেষ্টা চলছে।’