১২ মার্চ ২০২৬, ১৯:৫৯

শিক্ষা-সংস্কৃতির নগরী ময়মনসিংহ এখন ছিনতাইয়ের হটস্পট

ময়মনসিংহে ব্যাপক হারে বেড়েছে ছিনতাইয়ের ঘটনা   © টিডিসি ফটো

ময়মনসিংহ, শিক্ষা ও সংস্কৃতির নগরী হিসেবে খ্যাত হলেও সাম্প্রতিক সময়ে এটি ছিনতাই, চুরি ও ডাকাতির জন্য পরিচিত ‘হটস্পট’ হিসেবে পরিণত হয়েছে।

নাগরিকরা জানাচ্ছেন, দিন কিংবা রাত কোনো সময়ই নিরাপত্তা নেই। নগরীর বিভিন্ন প্রান্তে ছিনতাইকারীরা চলন্ত অটোরিকশা, জনসমাগমপূর্ণ মার্কেট, নির্জন রাস্তাসহ সর্বত্র দৌরাত্ম্য চালাচ্ছে।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালে জেলায় মোট ১১১টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে অন্তত ১৮-২০টি ছিনতাই-সংক্রান্ত। একই বছরে ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা হয়েছে ৬০টি; ৪৬৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও বাস্তবে প্রতিটি মাসে নগরীতে গড়ে প্রায় এক হাজারের বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।

সাম্প্রতিক কিছু ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে। চলতি বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি পুরোনো ত্রিশাল বাসস্ট্যান্ড এলাকায় চলন্ত অটোরিকশায় শিক্ষার্থী মোবাশ্বির ইসলাম সাদকে চার ছিনতাইকারী আক্রমণ করে। তার মানিব্যাগ ও মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়া হয়। যাত্রীদের ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করতে পারেনি। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ব্রহ্মপুত্র নদের চরে ঘুরতে গিয়ে আনন্দ মোহন কলেজের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নুরুল্লাহ শাওন (২৬) ছিনতাইকারীদের ধাওয়ায় নদীতে ঝাঁপ দেন। দু’দিন পরে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল ও পুলিশ সুপারের কার্যালয় ঘেরাও করে দ্রুত খুনিদের গ্রেপ্তারের আলটিমেটাম দেন।

গত ১৪ ফেব্রুয়ারি এনজিওকর্মী শামীম মিয়া নগরের পাটগুদাম ব্রিজ মোড়ে ছিনতাইয়ের শিকার হন। তার মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়া হয়, থানায় অভিযোগ সত্ত্বেও এখনও প্রতিকার পাননি। ২৩ অক্টোবর দিঘারকান্দা-রহমতপুর বাইপাস সড়কে বাকপ্রতিবন্ধী অটোরিকশা চালক মাছুমকে ছিনতাইকারীরা পিঠ ও গলায় ছুরিকাঘাত করে যানটি ছিনিয়ে নেয়।

জানা গেছে, নগরীর শম্ভুগঞ্জ, ব্রিজ মোড়, কেওটখালী, বাকৃবি শেষ মোড়, সানকিপাড়া, মীরবাড়ি, কলেজ রোড, মাদ্রাসা কোয়ার্টার, কাশর রোড, বাইপাস মোড়, গাঙ্গিনারপাড়, স্টেশন রোড, পুরোহিতপাড়া, বাঘমারা, চরপাড়া, মাসকান্দা এবং জয়নুল আবেদীন পার্ক ছিনতাই প্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত।

অপরাধের ধরন অনুযায়ী দেখা গেছে, এখন কেবল নির্জন স্থানেই নয়, বরং প্রচণ্ড ভিড়ের মাঝে অটোরিকশা বা বাজারে দৌরাত্ম্য চলছে। আশপাশে থাকা যাত্রীরা ভয়ে প্রতিবাদ করতে পারছে না। জেলার আশপাশ থেকে আসা শিক্ষার্থীরাও প্রধান লক্ষ্যবস্তু।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত বছর ছিনতাইয়ের ঘটনায় আটক ৪৬৭ জনের মধ্যে ৩৬২ জনই স্টেশন রোড, পুরোহিতপাড়া, সানকিপাড়া ও মীরবাড়ি এলাকার বাসিন্দা। ৩০০ জন পেশাদার ছিনতাইকারী কারাগার থেকে বের হয়ে আবারও অপরাধে লিপ্ত হয়েছেন। তাদের অধিকাংশ বয়স ১৪-৩০ বছরের মধ্যে। অনেকে শিক্ষার্থী ও মাদকাসক্ত।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, গত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চারবার ছিনতাইয়ের শিকার হয়েছেন। সর্বশেষ ৫ ফেব্রুয়ারি কলেজ রোডে মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া হয়। আরেক ভুক্তভোগী টাঙ্গাইল পলিটেকনিকের ছাত্র রুবেল আহমেদ স্বাধীন গনমাধ্যমকে জানান, ২৩ ডিসেম্বর চলন্ত অটোরিকশায় উঠার সময় তার গলায় ছুরি ধরে মোবাইল ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া হয়।

ভুক্তভোগী ধোবাউড়া উপজেলার আবু রায়হান জয়নাল আবেদীন পার্কে ঘুরতে এসেও ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন। জীবন বাঁচাতে চিৎকার করলে দু’টি মোবাইল ফোন নিয়ে পালিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা।

আইনজীবীরা জানিয়েছেন, দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩৭৯, ৩৮৫, ৩৮৬ ও ৩৯২ ধারায় ছিনতাইয়ের মামলা হলেও সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাব, দীর্ঘসূত্রিতা ও অসুবিধার কারণে অনেক আসামি খালাস পেয়ে বা সহজে জামিন পান। ফলে অপরাধ দমনে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না।

সুশীল নাগরিক ও সামাজিক সংগঠনগুলো সিভিল পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি, সিসিটিভি স্থাপন, মোবাইল আইএমইআই ট্র্যাকিং, বিট পুলিশিং সক্রিয়করণ এবং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি ছিনতাই করা পণ্য কেনাবেচায় জড়িত অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছেন।

নগরবাসী জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষকে নিরাপদ রাখতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া আগামী ঈদে ছিনতাই ও ডাকাতির ঝুঁকি আরও বাড়বে। বর্তমানে ময়মনসিংহে শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী, অটোরিকশা চালক সকলেই ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন।

ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবদুল্লাহ আল মামুন গনমাধ্যমকে জানিয়েছেন, শহরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত টহল ও সচেতনতা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে মহাসড়কে চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও ডাকাতি রোধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।