০৪ মার্চ ২০২৬, ০৮:১২

চট্টগ্রামে স্বামীর বিরুদ্ধে গৃহবধু হত্যার অভিযোগ

চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলায় সংবাদ সম্মেলন করেন নিহতের পরিবার  © টিডিসি ফটো

তিন বছর আগের কথা। বিয়েতে বরযাত্রী আসার কথা ছিল সর্বমোট ৫০০ জন। কিন্তু তারা পর্যায়ক্রমে এসেছিল প্রায় ৭০০ জন। এতে খাবার শেষ হয়ে যাওয়ায় কনের পরিবার পুনরায় রান্না শুরু করেন। এ সময় খাবার পরিবেশন করতে দেরি হওয়ায় কিছু বরযাত্রী রাগান্বিত হয়ে চলে যান। এরপর বর ও তার পরিবারের লোকজন হইচই শুরু করেন। তখন থেকে কনের উপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতন। কথাগুলো বলছিলেন কনে আয়েশা সিদ্দিকা মুক্তার মা সাজু আক্তার।

গতকাল মঙ্গলবার (৩ মার্চ) চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার হাশিমপুর ইউনিয়নের বাগিচাহাটের একটি রেস্টুরেন্টের হলরুমে মেয়ে আয়েশা সিদ্দিকা মুক্তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগ তুলে তার স্বামী আরিফুল ইসলামের জিফাতকে গ্রেপ্তারপূর্বক আইনের আওতায় আনার দাবিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে এসব কথা বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, বিয়ের দিন থেকে এই তিন বছর আমার মেয়ে সংসার জীবনে সুখের দেখা পায়নি। অতিরিক্ত নির্যাতনের কারণে একপর্যায়ে মেয়েকে আমাদের বাসায় নিয়ে এসেছিলাম। তখন সে আমাদের সঙ্গে ৫ মাস ছিল। পরে সালিশি বৈঠকের মাধ্যমে আবার শ্বশুরবাড়িতে ফিরে যায়। এরপর থেকে তার স্বামী তাকে আমাদের বাড়িতে আসতে দেয়নি। আমরা বেশ কয়েকবার মেয়েকে আনতে গিয়েছিলাম। কিন্তু প্রতিবারই তার স্বামী আমাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছেন।

সাজু আক্তার বলেন, সর্বশেষ ৫ম রমজানে মেয়ে আমাকে কল করে ইফতার সামগ্রী নিয়ে যেতে বলেছিল। এরপর হঠাৎ করে সে আমাদেরকে জানায়, তার স্বামীর ব্যবসার জন্য টাকা প্রয়োজন। তখন মেয়েকে স্বামী ও শ্বশুরসহ আমাদের বাড়িতে আসতে বলেছিলাম। একপর্যায়ে খবর পাই আমার মেয়ে নাকি আত্মহত্যা করেছে। তার শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে দেখি মরদেহ হাসপাতালে না নিয়ে খাটের উপর ফেলে রাখা হয়েছে। সে এভাবে কোনদিনও মরতে পারে না। তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমরা ঘটনাটি তদন্তপূর্বক জড়িতদের শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।

নিহত আয়েশা সিদ্দিকা মুক্তার পিতা মো. মনির আহমদ বলেন, আমার মেয়ের ২ বছর বয়সী একটি ছেলে ও ৩ মাস বয়সী একটি কন্যা সন্তান রয়েছে। স্বামী ও শশুরবাড়ির লোকজন তাকে সবসময় নির্যাতন করত। আমদের ধারণা, গলাটিপে বা গলায় ওড়না পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে এবং এটাকে তারা আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিচ্ছে। এ ঘটনায় আমি বাদী হয়ে থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করার পরও পুলিশের সহযোগিতা পাইনি।

নিহতের মামাতো ভাই মো. জাহেদুল ইসলাম বলেন, আমি দাঁড়িয়ে থেকে আমার মামাতো বোনকে আমার শালার সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু তারা প্রায় সময় আমার মামাতো বোনকে নির্যাতন করত। আমি এসবের প্রতিবাদ করার ফলে তাদের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিন্ন হয়। মূলত বিয়ের সময় ৫০০ বরযাত্রীর জায়গায় ৭০০ বরযাত্রী হওয়ায় খাবার সংকট দেখা দেয়। এরপর থেকেই অমানুষিক নির্যাতন শুরু হয়েছে।

নিহত আয়েশা সিদ্দিকা মুক্তার প্রতিবেশী ও অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মো. নুরুল আবছার বলেন, শশুরবাড়ির পক্ষ থেকে মুক্তা আত্মহত্যা করেছে বলে দাবি করা হলেও তারা তাকে হাসপাতালে না নিয়ে বাড়িতে ফেলে রেখেছিল। আমরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। ঘটনাটি তদন্ত করলে হয়তো মূল রহস্য উদঘাটন হতে পারে।

চন্দনাইশ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ইলিয়াছ খান বলেন, এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যু রুজু করা হয়েছে। পরবর্তীতে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। আমরা অভিযোগটি তদন্ত করছি এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে আসলে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রসঙ্গত, গত (২৮ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় চন্দনাইশ পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের হাজীর পাড়ায় অবস্থিত আয়েশা সিদ্দিকা মুক্তার শ্বশুরবাড়ির একটি লাকড়ি ঘর থেকে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঘটনার কিছু সময় পর তার স্বামী আরিফুল ইসলাম জিফাত পালিয়ে যায়। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে এটিকে হত্যাকান্ড হিসেবে দাবি করা হলেও অভিযুক্তের পরিবার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।