ছাত্রীকে ছুরিকাঘাত করছিল যুবক, দেখছিল সবাই—এগিয়ে এলো না কেউ
রাত সাড়ে ৯টা। রাজধানীর রায়েরবাজারের সরু গলি, হায়দার হোটেলের পাশের অল্প আলো-অন্ধকারে হঠাৎ ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক। এক কিশোরী প্রাণ বাঁচাতে ছুটছে, আর তার পেছনে হাতে ছুরি নিয়ে ধাওয়া করছে এক যুবক। চারপাশে মানুষ ছিল, দোকান খোলা ছিল, পথচারী ছিল কিন্তু কেউ এগিয়ে আসেনি। কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে রক্তে ভিজে যায় গলি। অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী শাহরিয়ার শারমিন বিন্তীর (১৪) জীবন থেমে যায় সেখানেই।
রাজধানীর হাজারীবাগ থানাধীন রায়েরবাজার এলাকায় বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে ৯টার দিকে হায়দার হোটেলের পাশের একটি গলিতে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। নিহত বিন্তী রায়েরবাজার হাই স্কুলের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। এ ঘটনায় একই স্কুলের সিয়াম নামে এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। বৃহস্পতিবার ভোরে রাজধানীর কাঠালবাগান এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এ সময় হত্যায় ব্যবহৃত অস্ত্র ও রক্তমাখা পোশাক জব্দ করা হয়েছে।
পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, শরীয়তপুরের সখীপুর উপজেলার কাছিকাটা গ্রামের মাছ ব্যবসায়ী বেলাল হোসেনের মেয়ে শারমিন পরিবারের সঙ্গে হাজারীবাগের হায়দার আলী হোটেলের পাশে ভাড়া বাসায় থাকতেন। বুধবার রাত ৮টার দিকে তিনি ছোট ভাই নাবিলকে নিয়ে বাসা থেকে বের হন। নাবিল বাজার থেকে তরকারি কিনে বোনের হাতে দিয়ে বাসার নিচে এগিয়ে দেয় এবং নিজে মসজিদে চলে যায়। এর কিছুক্ষণ পর এলাকায় হঠাৎ হইচই শুরু হয়।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, এক তরুণের সঙ্গে হেঁটে যাচ্ছিলেন বিন্তি। প্রথমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক মনে হলেও পরে উত্তেজনা তৈরি হয়। আরেকটি ভিডিওতে রক্তমাখা ছুরি হাত দিয়ে মুছতে দেখা যায় এক তরুণকে। একই সঙ্গে এক কিশোরীর আর্তচিৎকার শোনা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আশেপাশে অনেক মানুষ থাকলেও কেউ এগিয়ে এসে মেয়েটিকে রক্ষা করার চেষ্টা করেননি।
আরও পড়ুন: রাজধানীতে স্কুলছাত্রীকে ছুরিকাঘাতে হত্যার মূল অভিযুক্ত যুবক গ্রেপ্তার
ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত অবস্থায় জীবন বাঁচাতে পাশের বাসার এক নারীর গায়ে ঢলে পড়েন বিন্তি। শেষ শক্তি দিয়ে হামলাকারীর নাম বলেন তিনি। ওই নারী জানান, ‘আমি জড়িয়ে ধরলে সে বলে—সিয়াম ছুরি দিয়ে আঘাত করেছে।’ স্থানীয় লোকজনের কাছেও রক্তাক্ত অবস্থায় বিন্তি একই নাম উল্লেখ করেন।
গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে স্থানীয় শিকদার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এর জরুরি বিভাগে নেওয়া হলে প্রায় এক ঘণ্টা পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
বাবা বেলাল হোসেন বলেন, শারমিন তার ছোট ভাইকে নিয়ে বাসা থেকে বের হয়। ছোট ভাইকে মসজিদে দিয়ে সে কিছু কিনতে গিয়েছিল। এর মধ্যে কে বা কারা তাকে ছুরিকাঘাত করে ফেলে রাখে। খবর পেয়ে দ্রুত তাকে উদ্ধার করে রক্তাক্ত অবস্থায় প্রথমে স্থানীয় শিকদার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে রাত সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত বিন্তির মা নাদিয়া বেগম বলেন, রাত ৮টার দিকে বিন্তি ও তার ভাই নাবিল একসঙ্গে বাসার বাইরে যায়। নাবিল বাজার থেকে তরকারি কিনে বোনের হাতে দিয়ে বাসার নিচে এগিয়ে দেয় এবং নিজে মসজিদে চলে যায়। এর কিছুক্ষণ পর হঠাৎ হইচই শুনে নিচে নেমে দেখি বিন্তিকে ঘিরে অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয় লোকজনের কাছে রক্তাক্ত অবস্থায় বিন্তি নিজেই জানিয়েছে, সিয়াম নামে এক যুবক তাকে কুপিয়েছে।
বিন্তির মা আরও বলেন, তিন-চার বছর আগে থেকে সিয়াম মোবাইলে আমার মেয়েকে ডিস্টার্ব করত। একদিন আমি নিজেই তাকে মোবাইলে বকাবকি করি। আজকে আমার মেয়েকে কুপিয়ে মেরে ফেলেছে। আমি আমার মেয়ে হত্যার বিচার চাই। খুনি সিয়ামের ফাঁসি চাই।
এদিকে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ (পরিদর্শক) মো. ফারুক মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, নিহতের কাঁধ ও পিঠে একাধিক জখমের চিহ্ন রয়েছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। ঘটনার বিষয়ে হাজারীবাগ থানা পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।
ডিএমপির রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. মাসুদ আলম বলেন, কিছু সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গেছে। কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে আগে থেকে সঙ্গে আনা ছুরি দিয়ে মেয়েটিকে আঘাত করে অভিযুক্ত। এটি পূর্বপরিকল্পিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আশেপাশে অনেক লোকজন থাকলেও কেউ এগিয়ে আসেনি।
হাজারীবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমান বলেন, প্রাথমিকভাবে প্রেমঘটিত বিরোধের জেরে হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঘটনার পরপরই তদন্ত শুরু করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে মূল সন্দেহভাজন সিয়ামকে আটক করা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হত্যার পেছনের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।