২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৯:০০

স্কুলছাত্রকে হত্যা, ছাত্রদল কর্মীসহ ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড

শিক্ষার্থী আহনাফ আল মাঈন নাশিত  © সংগৃহীত

ফেনীতে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী আহনাফ আল মাঈন নাশিতকে (১০) অপহরণ ও হত্যা মামলায় ফেনী পৌর ছাত্রদলের কর্মীসহ তিন আসামির মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে জরিমানা অনাদায়ে আরও ৬ মাস করে বিনাশ্রম কারাদণ্ডে আদেশ দেওয়া হয়েছে। 

আজ বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) দুপুরে ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) এ এন এম মোর্শেদ খান এ রায় ঘোষণা করেন। এর আগে কারাগারে আটক তিন আসামিকে আদালতে আনা হয়। এজলাসে নেওয়ার সময় তারা সাংবাদিকদের ওপর ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন। রায় ঘোষণা শেষে আদালত আসামিদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন আশরাফ হোসেন তুষার (২২), মোবারক হোসেন ওয়াসিম (২২) ও ওমর ফারুক রিফাত (২২)। আশরাফ হোসেন তুষার ফেনী পৌর ছাত্রদলের সক্রিয় কর্মী এবং আরাফাত রহমান কোকো স্মৃতি সংসদের সহপ্রচার সম্পাদক ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জিয়া স্মৃতি সংসদের সাবেক ক্রীড়া সম্পাদক ছিলেন।  

আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর ফেনী শহরের একাডেমি এলাকার আতিকুল আলম সড়কে কোচিং শেষে স্থানীয় বায়তুল খায়ের জামে মসজিদে নামাজ পড়তে যায় নাশিত। নামাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে পূর্বপরিচিত আসামি তুষার ও তার সহযোগীরা নাশিতকে অপহরণ করে শহরতলির দেওয়ানগঞ্জ এলাকায় নিয়ে জুসের সঙ্গে ওষুধ মিশিয়ে অচেতন করেন। পরে নাশিতের ছবি তুলে তার বাবা মাঈন উদ্দিন সোহাগের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে পাঠিয়ে ১২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। একপর্যায়ে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে মরদেহ রেললাইনের পাশে ফেলে দেয়। মরদেহ যেন পানিতে ভেসে না ওঠে সে জন্য ওই শিক্ষার্থীর স্কুল ব্যাগে পাথর ভরে চাপা দেন তাঁরা।

এ ঘটনায় নাশিতের বাবা মাদিন উদ্দিন সোহাগ ২০২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ফেনী মডেল থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি করেন। তারপর দুই দিন ধরে একটি মোবাইল নম্বর থেকে নাশিতের বাবাকে কল করে ১২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন। পরে নিহতের বাবা সোহাগ পুলিশকে তুষার নামে একজনকে সন্দেহের কথা জানান। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সেদিন রাতে তুষারকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হলে তাঁর দেওয়া তথ্যমতে দেওয়ানগঞ্জ এলাকার একটি ডোবা থেকে নাশিতের স্কুল ব্যাগসহ মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত তুষারসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের মধ্যে আশরাফ হোসেন তুষার ছাগলনাইয়া উপজেলার রাধানগর ইউনিয়নের নিজপানুয়া গ্রামের ইকবাল হোসেন চৌধুরীর ছেলে। তিনি ফেনী পৌর ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। তুষার আরাফাত রহমান কোকো স্মৃতি সংসদের সহপ্রচার সম্পাদক ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ জিয়া স্মৃতি সংসদের সাবেক ক্রীড়া সম্পাদক ছিলেন। গ্রেপ্তার মোবারক হোসেন ওয়াসিম ফেনী পৌরসভার বারাহিপুর এলাকার বিল্লাল হোসেনের ছেলে। পেশায় তিনি সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক। অন্যজন ওমর ফারুক রিফাত লক্ষ্মীপুর জেলার সদর থানার কামালপুর এলাকার দুধমিয়া বাড়ির মো. শাহ আলমের ছেলে।

২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর সিনিয়র জুডিশিয়াল আদালতে নাশিতকে অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার তিন আসামি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। ২৫ জানুয়ারি যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে এ মামলার রায় ঘোষণা করেন আদালত।

নাশিতের বাবা মাঈন উদ্দিন সোহাগ বলেন, আসামিরা আমার স্কুলপড়ুয়া সন্তানকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। এ রায়ে আমি সন্তুষ্ট। দ্রুত সময়ের মধ্যে রায় কার্যকরের দাবি করছি।

ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতের পিপি মো. শাহাব উদ্দিন আহমদ বলেন, ৫ আগস্ট রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর আদালতে দ্রুত সময়ের মধ্যে এ মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। মামলায় ২২ জন সাক্ষীর মধ্যে সবাই সাক্ষ্য দিয়েছেন। ৬ জানুয়ারি আসামি পরীক্ষা ও ২৫ জানুয়ারি যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আজ রায় ঘোষণা করা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘোষিত এ রায় আইনের জন্যও দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।