লর্ডস টেস্টের মাঝেই ইমরান খানের ছেলেদের সাক্ষাৎকার, তীব্র প্রতিবাদ পাকিস্তানের
লর্ডসে পাকিস্তান ও ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় টেস্ট চলার মাঝেই পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও কিংবদন্তি ক্রিকেটার ইমরান খানের দুই ছেলে সুলাইমান ও কাসিম খানের সাক্ষাৎকার প্রচার করেছে স্কাই স্পোর্টস। ইংল্যান্ডের সাবেক ক্রিকেটার মাইকেল আথারটনের নেওয়া ওই সাক্ষাৎকারে ইমরান খানের কারাবাস ও শারীরিক অবস্থা নিয়ে বিস্ফোরক সব অভিযোগ করেন তাঁর দুই ছেলে। সাক্ষাৎকারটি নিয়ে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) আপত্তি জানালেও তা প্রচার করায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে পাকিস্তান।
বৃহস্পতিবার লর্ডসে দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম সেশন শেষ হওয়ার পর মধ্যাহ্নবিরতিতে সাক্ষাৎকারটি প্রচার করা হয়। পিসিবির পক্ষ থেকে আগে থেকেই স্কাই স্পোর্টসকে সাক্ষাৎকারটি প্রচার না করার অনুরোধ করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। তবে সেই আপত্তি উপেক্ষা করে নির্ধারিত সময়েই সাক্ষাৎকারটি সম্প্রচার করে ব্রিটিশ সম্প্রচারমাধ্যমটি।
সাক্ষাৎকারে সুলাইমান ও কাসিম তাদের বাবার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন। তারা দাবি করেন, পাকিস্তান সরকার ইমরান খানকে কারাগারের ভেতরে হত্যা করার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে তারা অভিযোগ করেন, ইমরানকে প্রতিদিন ২৩ ঘণ্টারও বেশি সময় একটি ছোট কক্ষে একা রাখা হচ্ছে এবং তাঁর প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও ঠিকমতো দেওয়া হচ্ছে না।
ইমরান খানের শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে এরই মধ্যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের কাছে কয়েকটি চিঠি পাঠানো হয়েছে। সাবেক ইংল্যান্ড ক্রিকেটার মাইকেল আথারটনসহ বেশ কয়েকজন সাবেক ক্রিকেট অধিনায়ক ওই চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন। সেখানে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষকে ইমরান খানের সঙ্গে মানবিক আচরণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সাক্ষাৎকারে কাসিম খান বলেন, পাকিস্তানের কারাগারে বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক বন্দী মারা গেছেন। তাঁর দাবি, সরকার একই পরিণতি তাঁর বাবার ক্ষেত্রেও ঘটাতে চাইছে।
কাসিম বলেন, ‘তারা এখন আর কোনো কৌশল অনুসরণ করছে বলেও মনে হচ্ছে না। তারা কী করছে, সেটিও খুব পরিষ্কার নয়। মনে হচ্ছে, তারা সেখানে তাকে সরাসরি হত্যার চেষ্টা করছে। যতটা সম্ভব তাকে সেখানে আটকে রাখা এবং তাকে নীরব করে রাখাই যেন তাদের লক্ষ্য। শেষবার যখন সে আমাদের আন্টিদের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছিল, তখন সে বলেছিল, সাম্প্রতিক সময়ে কারাগারের পরিস্থিতি অনেক খারাপ হয়েছে। কারাগারে নিহত বা মারা যাওয়া অন্য রাজনৈতিক বন্দীদের সঙ্গে নিজের অবস্থার তুলনাও সে করেছে। এই মুহূর্তে পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে খারাপ। তাকে প্রতিদিন ২৩ ঘণ্টারও বেশি সময় একটি কক্ষে একা রাখা হচ্ছে।’
ইমরান খানের শারীরিক অবস্থার কথাও তুলে ধরেন কাসিম। তিনি জানান, তাঁর বাবার চোখে সমস্যা দেখা দিয়েছে এবং তাঁকে চোখে প্যাচ লাগিয়ে রাখতে হয়েছে।
কাসিম বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সে যেন যথাযথ চিকিৎসা পায়। চোখের সমস্যার কারণে তার চোখে একটি প্যাচ লাগানো ছিল এবং তাকে দৃশ্যত খুবই চাপের মধ্যে মনে হচ্ছিল। বিষয়টি আমাদের জন্য কল্পনা করাও খুব কঠিন। কারণ, আমি যতবার তাকে দেখেছি, এমনকি বন্দুকের মুখে পড়ার সময়ও, সে সব সময় খুব শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী থেকেছে। একবার আমরা যে গাড়িতে ছিলাম, সেটি ছিনতাই হয়েছিল। সেখানেও ডাকাতদের উপস্থিতির মধ্যেও সে ছিল সবচেয়ে শান্ত ব্যক্তি।’
তাদের দাবি, পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ ‘কারিগরি কারণ’ দেখিয়ে তাদের ভিসাও দিচ্ছে না।
ইমরানকে কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়ার ঘটনা নিয়েও কথা বলেন সুলাইমান। তাঁর ভাষ্য, বাবাকে বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাঁকে সরকারি একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়।
সুলাইমান খান বলেন, ‘আমরা সতর্কভাবে আশাবাদী ছিলাম। কিন্তু আমাদের আশঙ্কাই সত্যি হলো। তাকে যে বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়ার কথা ছিল, সেখানে না নিয়ে তাকে কয়েক ঘণ্টার জন্য একটি সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়। এরপর তাকে সরাসরি কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাস্তবে সরকারি কর্মকর্তারা মাত্র এক ঘণ্টা তার পরীক্ষা করেছেন। তারা বলেছে, ‘দারুণ, সে ঠিক আছে।’ এরপর তারা বলেছিল, এখন তাকে স্বাধীন হাসপাতাল শিফায় পাঠানো হবে। কিন্তু তারা সেখানে অপেক্ষা করা সব চিকিৎসককে এবং আমাদের আন্টিকেও, যিনি নিজেও একজন চিকিৎসক, অপেক্ষায় রেখে তাকে সরাসরি কারাগারে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।’
সুলাইমান ও কাসিমের সাক্ষাৎকার প্রচারের পর বিষয়টি নিয়ে আরও উত্তেজনা তৈরি হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড স্কাই স্পোর্টসের কাছে এ নিয়ে অভিযোগ জানিয়েছে। সাক্ষাৎকারটি প্রচার না করার জন্য পিসিবি আগে থেকেই আপত্তি জানিয়েছিল বলে জানা গেছে।
শুধু পিসিবিই নয়, সাক্ষাৎকারটি ঘিরে পাকিস্তান ক্রিকেট দলও আপত্তি জানিয়েছিল বলে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। এমনকি দ্বিতীয় টেস্টের প্রথম দিনের মধ্যাহ্নবিরতির পর পাকিস্তান দল মাঠে নামতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল বলেও খবর এসেছে।
পরে ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডের (ইসিবি) হস্তক্ষেপে পাকিস্তান দলকে আবার মাঠে নামতে রাজি করানো হয়। ফলে লর্ডস টেস্টের মাঝখানে ইমরান খানের দুই ছেলের সাক্ষাৎকারকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বিতর্কের পাশাপাশি পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড ও দলের সঙ্গে স্কাই স্পোর্টসেরও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
ইমরান খানের দুই ছেলের অভিযোগ নিয়ে পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে কী প্রতিক্রিয়া এসেছে, তা অবশ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। তবে সাক্ষাৎকারটি প্রচারের পর লর্ডস টেস্টের মাঠের লড়াই ছাপিয়ে ইমরান খানের কারাবাস, তাঁর শারীরিক অবস্থা এবং পাকিস্তান ক্রিকেটের সঙ্গে বিষয়টির যোগসূত্রই আলোচনার বড় বিষয় হয়ে উঠেছে।