২৮ জুন ২০২৬, ২২:৫৭

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় বেন স্টোকসের

বেন স্টোকস  © সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরে চলে যাচ্ছেন ইংল্যান্ডের টেস্ট অধিনায়ক বেন স্টোকস। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে চলমান সিরিজ নির্ধারণী তৃতীয় টেস্ট শেষেই অবসর নেবেন স্টোকস। ম্যাচের চতুর্থ দিনের শুরুতেই সতীর্থদের বিষয়টি জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। 

ইংল্যান্ডের ক্রিকেট ইতিহাসে সর্বকালের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার স্টোকস যখন ট্রেন্ট ব্রিজে নিজের বোলিং স্পেল করছিলেন, ঠিক তখনই তাঁর ১৫ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেওয়া হয়। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় টেস্টের চতুর্থ দিনে নিজের চেনা আগ্রাসী মেজাজে এক দীর্ঘ বোলিং স্পেল শেষ করার ঠিক ১৫ মিনিট পর, চা-বিরতির ঠিক আগমুহূর্তে এই ঘোষণা দেন তিনি।

লন্ডনের একটি নাইটক্লাবের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় জড়িয়ে পড়ার কারণে ব্ল্যাক ক্যাপসদের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে খেলতে পারেননি স্টোকস। নটিংহামে আবারও দলের অধিনায়কত্বে ফেরার আগে অবশ্য ৩৫ বছর বয়সী এই ক্রিকেটার ইঙ্গিতপূর্ণভাবে কেবল এই সপ্তাহে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা বলেছিলেন।

স্টোকসের অবসর নিয়ে ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ডের (ইসিবি) এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘বেন স্টোকস ইংল্যান্ড পুরুষ টেস্ট দলের অধিনায়কত্ব এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে নিজের অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। ট্রেন্ট ব্রিজে অনুষ্ঠিত চলতি তৃতীয় টেস্ট ম্যাচটি দিয়েই শেষ হবে স্টোকসের ইংল্যান্ড ক্যারিয়ার।’

বিবৃতিতে আরও বলা হয়,  ‘এর মাধ্যমে ২০১১ সালে সীমিত ওভারের ক্রিকেট দিয়ে শুরু হওয়া এক আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি ঘটতে যাচ্ছে। এরপর ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে অ্যাশেজ সিরিজে অ্যাডিলেডে তাঁর টেস্ট অভিষেক হয়েছিল। ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে তিনি ইংল্যান্ড টেস্ট দলকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।’

ইংল্যান্ডের ড্রেসিংরুমে কথা বলার সময় আবেগ ধরে রাখতে পারেননি স্টোকস। বিবিসি স্পোর্টস জানিয়েছে সতীর্থদের উদ্দেশে স্টোকস বলেন,  ‘কেন এমন সিদ্ধান্ত নিলাম, সেই কারণগুলো না হয় পরেই জানা যাবে। তবে এই দলটার জন্য, তোমাদের জন্য এবং আমার আগের সতীর্থদের জন্য অতীতে আমি বারবার নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছি; এবার শেষবারের মতো আরও একবার সেই লড়াইটা করতে চাই। তোমাদের কাছে আমার একটাই চাওয়া, দয়া করে তোমরাও প্রত্যেকে একই মানসিকতা দেখাও।’

স্টোকস আরও যোগ করেন,  ‘আমাদের সামনে এখনো অনেক কঠিন কাজ বাকি। ম্যাচের ফল যাই হোক না কেন, আমি শুধু এই বিশ্বাস নিয়ে মাঠ থেকে বিদায় নিতে চাই যে—শেষ দুটি দিন আমার এই দলটা নিজেদের শতভাগ উজাড় করে দিয়েছে। আমি শুধু এটাই চাই। সবাই যেন নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে লড়ো—স্বার্থপরের মতো কেবল আমার জন্য বলছি না, বলছি এই দলটার জন্য। মনের ভেতর জমে থাকা আবেগ আমি একপাশে সরিয়ে রেখেছি। এবার মাঠে নেমে কাজ করার পালা। দয়া করে তোমরাও আমার সাথে চলো।’

টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার হিসেবে স্টোকসের মর্যাদা তাঁর ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যানই স্পষ্ট করে দেয়—এখন পর্যন্ত তাঁর ঝুলিতে রয়েছে ৭,২৪৩ রান এবং ২৫১টি উইকেট। টেস্ট ক্রিকেটের সুদীর্ঘ ইতিহাসে কেবল ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি স্যার গারফিল্ড সোবার্স এবং দক্ষিণ আফ্রিকার জ্যাক ক্যালিসেরই এমন অলরাউন্ড ডাবল অর্জনের কীর্তি রয়েছে। এছাড়া টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর মারা ১৩৬টি ছক্কাও একটি বিশ্বরেকর্ড।

ব্যক্তিগত সব অর্জনের বাইরেও স্টোকস ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন তাঁর অনন্য নেতৃত্বশৈলীর জন্য। ২০২২ সালে হেড কোচ ব্র্যান্ডন ম্যাককালামের সাথে টেস্ট দলের দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁরা দুজনে মিলে শুরু করেছিলেন ‘বজবল’ বিপ্লব।

এর আগে খেলা ১৭টি টেস্টের মধ্যে মাত্র ১টিতে জয় পাওয়া এক দিকভ্রান্ত দলকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন স্টোকস ও ম্যাককালাম। রক্ষণাত্মক খোলস থেকে বের করে দলকে শিখিয়েছিলেন আক্রমণাত্মক ও ভয়ডরহীন ক্রিকেট খেলতে, যার তাৎক্ষণিক সাফল্যও হাতেনাতে পেয়েছিল ইংল্যান্ড। দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ১১টি টেস্টের মধ্যে ১০টিতেই জয়ের গৌরব অর্জন করেছিল এই স্টোকস-ম্যাককালাম জুটি।

অধিনায়ক হিসেবে স্টোকস তাঁর প্রায় ৫৬ শতাংশ টেস্ট ম্যাচেই জয় পেয়েছেন—যা গত ৪৫ বছরে যেকোনো ইংলিশ অধিনায়কের জন্য সেরা সাফল্যের হার। তবে বড় প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে তাঁর এই খেলার ধরন বা কৌশল প্রায়ই মুখ থুবড়ে পড়েছে।

দুর্দান্ত পারফরম্যান্স আর নেতৃত্বের জন্য প্রশংসা ‍কুড়ানোর সঙ্গে মাঠের এই বিশৃঙ্খলা আর বিতর্কের ধরনটা যেন স্টোকসের পুরো ক্যারিয়ারেরই এক চেনা প্রতিচ্ছবি। ২০১৭ সালে ব্রিস্টলের একটি নাইটক্লাবের বাইরে মারামারির ঘটনায় জড়ান। পরের বছর আদালত থেকে নির্দোষ প্রমাণিত হলেও এই খেসারতে মিস করেন ২০১৭-১৮ মৌসুমের অ্যাশেজ সফর।

এরপর ২০২১ সালে মানসিক স্বাস্থ্যের কারণে ক্রিকেট থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিরতি নেন এবং পরের বছর এক ডকুমেন্টারিতে বিশদভাবে তুলে ধরেন—ব্রিস্টল কাণ্ড এবং বাবা গেড স্টোকসের আকস্মিক মৃত্যু তাঁর মনে কতটা গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। মাঠের বাইরের এসব ঝামেলার পাশাপাশি একের পর এক গুরুতর ইনজুরিও স্টোকসের ক্যারিয়ারের পিছু ছাড়েনি; বিশেষ করে তাঁর বাম হাঁটুর চোট ২০২৩ ও ২০২৪ সালে তাঁর বোলিং ধার কমিয়ে দিয়েছিল মারাত্মকভাবে।

আগামী আগস্টে হেডিংলিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের পরবর্তী টেস্ট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে; আর সেই ম্যাচের আগেই স্টোকসের উত্তরসূরি হিসেবে নতুন অধিনায়কের নাম ঘোষণা করবে ইংল্যান্ড, যেখানে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন হ্যারি ব্রুক।

ইংল্যান্ডের হয়ে ১২২ টেস্ট, ১১৪ ওয়ানডে ও ৪৩ টি-টোয়েন্টি খেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় বলছেন স্টোকস। টেস্টে ১৪ সেঞ্চুরি ও ৩৭ ফিফটিতে এখন পর্যন্ত ৭২৪৩ রান করেছেন তিনি। পেস বোলিংয়ে উইকেট নিয়েছেন ২৫২টি।

২০১৯ সালে ওয়ানডে বিশ্বকাপ জেতা স্টোকস এই সংস্করণে ৫ সেঞ্চুরি ও ২৪ ফিফটিতে করেছেন ৩৪৬৩ রান; উইকেট ৭৪টি। আর ২০২২ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জেতা এই ক্রিকেটার দেশের জার্সিতে এই সংস্করণে রান করেছেন ৫৮৫, উইকেট নিয়েছেন ২৬টি।