২৩ মার্চ ২০২৬, ০৮:৪৭

বিসিবির সভাপতি মানেই যেন ‘স্বেচ্ছাচারী’

পাপন ও আমিনুল ইসলাম  © সংগৃহীত

দেশের ক্রিকেট পরিচালনায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতির পদটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী। জাতীয় দলের পারফরম্যান্স, ঘরোয়া ক্রিকেটের উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দেশের অবস্থান শক্তিশালী করার সঙ্গেও সরাসরি জড়িত। তবে এই পদকে ঘিরে সমালোচনাও কম নয়। রাজনৈতিক প্রভাবের উপস্থিতিও এই চেয়ারকে ঘিরে বছরের পর বছর ধরে চলছে। 

এই চেয়ারে বসা মাত্রই অনেকের আচরণে ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গঠনতন্ত্রে নানা নিয়মকানুন থাকলেও বাস্তবে দেখা যায়, বোর্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে অনেক সময় সেই নিয়মের তোয়াক্কা না করেই প্রায় একক সিদ্ধান্তে প্রতিষ্ঠান চালাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন সভাপতিরা। এতে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বদলে অনেক সময় ব্যক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় পরিণত হয় দেশের ক্রিকেটের নিয়ন্তা সংস্থাটি।

এই প্রবণতায় আলোচিত উদাহরণ সাবেক সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় দেশের ক্রিকেটকে শাসন করেছেন তিনি। সে সময়ে অঘোষিতভাবেই বোর্ডের ছোট-বড় সব সিদ্ধান্তই তার ইশারায় হতো। বোর্ডে বিভিন্ন কমিটি থাকলেও বাস্তবে এককভাবে সেসব সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতেন তিনিই। এতে বোর্ডের ভেতরে সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি খুব একটা শক্তভাবে গড়ে ওঠেনি, এমন অভিযোগ মাঝেমধ্যেই শিরোনাম হতো।

পাপনের সময়ে প্রশাসনিক ক্ষমতাও তাকে ঘিরেই আবর্তিত হতো। দল নির্বাচন থেকে কোচ নিয়োগ, শৃঙ্খলা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত কিংবা বোর্ডের নীতিনির্ধারণী নানা বিষয়—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার সরাসরি প্রভাব ছিল। মাঝেমধ্যে আরেকটি বিষয়ও আলোচনায় উঠে আসতো, দেশের বাইরে অবস্থান করলেও সভাপতির দায়িত্বও নিজের কাঁধেই রেখে দিতেন পাপন। দেশের বাইরে থেকেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে চূড়ান্ত অনুমোদন দিতেন। পাপনের সময়ে বহুবার এমন ঘটনা ঘটেছে। কয়েক বছর তো, সহ-সভাপতি হিসেবেই কাউকে দেখা যায়নি। এ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা-সমালোচনা চললেও সহ-সভাপতি দেওয়া হবে, হচ্ছে বলেও শেষমেশ পাপনের মেয়াদে আর কাউকেই এই পদে দেখা যায়নি।

বর্তমান সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুলের ঘটনাও সেই একই আলোচনার জন্ম দিচ্ছেন। বর্তমানে পারিবারিক কাজে অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থান করছেন তিনি। ক্রিকেটাঙ্গনে কানাঘুষা শোনা যাচ্ছে, ঈদের পর দেশে ফিরবেন। অর্থাৎ পরিবারের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করেই দেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক দায়িত্বে ফিরবেন। যদিও এই পুরো সময়জুড়ে দেশের বাইরে থেকেও অনলাইনের মাধ্যমে বিসিবির বিভিন্ন কার্যক্রম তদারকি করে যাচ্ছেন দেশের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান।

তবে শুধু তদারকি বললেও ভুল হবে। বোর্ডের জরুরি কাগজপত্রে স্বাক্ষর করার ক্ষেত্রেও নিজের ক্ষমতা প্রদর্শন করছেন তিনি। ডিজিটাল স্ক্যানিং পদ্ধতিতে সব কাগজে স্বাক্ষর করছেন বিসিবিপ্রধান। আধুনিক প্রযুক্তির এই ব্যবহার প্রশাসনিক কার্যক্রম চালিয়ে নিতে সহায়ক হলেও প্রশ্ন উঠছে, আদৌ প্রয়োজন ছিল এমন কিছুর? 

তবে এসব দায়িত্বকে খুব সহজেই ‘অফলোড’ করে যেতে পারতেন বুলবুল। বিসিবির গঠনতন্ত্রে স্পষ্টভাবে বলা আছে, সভাপতির অনুপস্থিতিতে তার মনোনীত কোনো সহ-সভাপতি সাময়িকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। অর্থাৎ আইনি ও সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যেই দায়িত্ব হস্তান্তরের একটি সুস্পষ্ট পথ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই বিধান সবসময় কার্যকর হতে দেখা যায়নি।

সূত্র বলছে, বিসিবির দুই সহ-সভাপতি ফারুক আহমেদ ও শাখাওয়াত হোসেনের কেউই এখন পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পাননি। আমিনুল ইসলাম বুলবুল দেশের বাইরে যাওয়ার আগে নাকি স্পষ্টভাবে কাউকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেননি, তার অনুপস্থিতিতে কে কোন দায়িত্ব পালন করবেন, সেটিও নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি।

মূলত সভাপতির ডেপুটি হিসেবে সহ-সভাপতির পদটি রাখা হয়। ক্রিকেট কিংবা ফুটবলে যেমন অধিনায়কের পাশাপাশি সহ-অধিনায়ক থাকেন, অধিনায়ক অনুপস্থিত থাকলে বা মাঠের বাইরে গেলে নেতৃত্ব দেন সহ-অধিনায়কই। বোর্ড প্রশাসনের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য হওয়ার কথা। কেননা, সহ-সভাপতিরা শুধু নামমাত্র পদধারী নন; সভাপতির অনুপস্থিতিতে বোর্ডের কার্যক্রম সচল রাখাই তাদের অন্যতম দায়িত্ব।

যতদূর জানা গেছে, দায়িত্ব নেওয়ার পর এবার বিদেশ সফরে যাওয়ার আগে কোনো সহ-সভাপতিকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব দিয়ে যাননি বর্তমান সভাপতি। এতে বোর্ডের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনে এক ধরনের অনিশ্চয়তা চলছে। কিছু ক্ষেত্রে সাংগঠনিক শৃঙ্খলাও ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে।

ইতিমধ্যে বোর্ডের কয়েকজন কর্মকর্তা বিতর্কিত মন্তব্য করে সমালোচনার মুখেও পড়েছেন। অনেকের ধারণা, তাদের কর্মকাণ্ড তদারক করার মতো কার্যকর কোনো নেতৃত্ব বর্তমানে সামনে নেই। ফলে জবাবদিহিতার জায়গাটিও কিছুটা দুর্বল। সভাপতি অনুপস্থিত থাকায় অনেকে যেন নিজেদের মতো করেই কাজ করার চেষ্টা করছেন। সব মিলিয়ে বিসিবির ভেতরে এক ধরনের প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

যদিও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে দায়িত্বের একটি অংশ কিংবা পুরো দায়িত্ব সাময়িকভাবে কোনো সহ-সভাপতির কাছে খুব সহজেই অর্পণ করতে পারতেন বুলবুল। এতে বোর্ডের দৈনন্দিন কার্যক্রম আরও স্বাভাবিক ও গতিশীলভাবে পরিচালিত হতো। এ ছাড়া বিসিবির সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনায় সভাপতির স্বশরীরে উপস্থিত থাকা প্রয়োজন। কিন্তু আইনে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও প্রায়ই দেখা যায়, সেই আইন বা বিধানকে উপেক্ষা করেন সভাপতিরা।

এতে প্রশ্নটা বড় হয়েই সামনে আসছে, ক্রিকেট বোর্ড কি আসলেই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে পরিচালিত হচ্ছে, নাকি সভাপতির ব্যক্তিগত ক্ষমতার ওপরই নির্ভর করে যাচ্ছে? গঠনতন্ত্র যদি বাস্তবে প্রয়োগই না হয়, তবে সেই নিয়ম থাকার অর্থটাই-বা কোথায়? তবে ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ আরও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হলে হয়তো এই সংস্কৃতি বদলানো জরুরি বলেও মনে করছেন ক্রীড়া সংশ্লিষ্টরা।