‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ আজ, ৫১ বছর আগের এই দিনে কি ঘটেছিল?
আজ ৭ নভেম্বর, জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও ঘটনাবহুল একটি দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সেনাবাহিনীর নিজেদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অভ্যুত্থান, সিপাহি ও সাধারণ জনতার অংশগ্রহণ এবং ক্ষমতার পালাবদলের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। এদিন বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। পরবর্তী সময়ে তিনি দেশের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন।
এদিন ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর থেকেই দেশে রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতা চলছিল। এর ধারাবাহিকতায় নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ঘটে একাধিক অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থান। দিনটি বিএনপির কাছে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পরিচিত। তবে এর ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য নিয়ে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রয়েছে ভিন্নমত।
যেভাবে শুরু হয়েছিল ৭ নভেম্বর:
শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর খন্দকার মোশতাক আহমদ শেখ মুজিব সরকারের ২৩জন মন্ত্রীর মধ্যে ২১জনকে সঙ্গে নিয়ে নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন। ওই সময় বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জড়িত কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করছিলেন। অন্যদিকে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরেও বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ ও দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।
এরই মধ্যে ২৪ আগস্ট মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহকে সরিয়ে জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান করা হয়। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিরোধ দিন দিন বাড়তে থাকে। এর পরিণতিতে ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীতে অভ্যুত্থান ঘটে। ওই অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধানের পদ থেকে সরিয়ে গৃহবন্দি করা হয়।
৩ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের মধ্যেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে। একই দিনে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে জড়িত কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান।
অন্যদিকে খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের পর দেশের সামরিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ পড়ানো হলেও সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থান ও মেজর জিয়ার মুক্তি:
৩ নভেম্বরের পরবর্তী কয়েক দিনে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের গণবাহিনী এবং সেনাবাহিনীর ভেতরে থাকা বিভিন্ন পক্ষ সক্রিয় হয়ে ওঠে। কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বে সেনাসদস্যদের মধ্যে সংগঠিত তৎপরতা শুরু হয়। সেনাবাহিনীর ভেতরে পদমর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা নিয়ে অসন্তোষও এ সময় প্রকাশ পেতে থাকে।
৬ নভেম্বর রাত থেকে ৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে সেনাসদস্যদের একটি অংশ বিদ্রোহে অংশ নেয়। এ সময় সেনানিবাসে বিভিন্ন স্লোগান ও তৎপরতার মধ্য দিয়ে অভ্যুত্থান ছড়িয়ে পড়ে। বিদ্রোহী সেনাসদস্যদের উদ্যোগে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন জিয়াউর রহমান। ৭ নভেম্বরের ঘটনায় কর্নেল তাহের ও তার নেতৃত্বাধীন জাসদের গণবাহিনীর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিবিসি বাংলার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সেনাবাহিনীর কয়েকটি ইউনিটের সদস্যরা জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেন। পরে তার সঙ্গে কর্নেল তাহেরের রাজনৈতিক ও সামরিক অবস্থান নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়।
৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের আরেকটি রক্তাক্ত অধ্যায় ছিল কয়েকজন সেনা কর্মকর্তার হত্যাকাণ্ড। ওই দিন সকালে ১০ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ, কর্নেল কে এন হুদা এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল এ টি এম হায়দার নিহত হন। তাদের হত্যার নির্দেশদাতা ও সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন ও বিতর্ক রয়েছে।
এরপর জিয়াউর রহমান দ্রুত দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে চলে আসেন। সামরিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তিনি রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন। পরবর্তী সময়ে তিনি উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
অন্যদিকে ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা কর্নেল আবু তাহেরের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ২৪ নভেম্বর ১৯৭৫ কর্নেল তাহেরকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে সামরিক আদালতে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে বিচার শেষে ১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ২০১৩ সালে হাইকোর্ট ওই সামরিক আদালতের বিচারকে অবৈধ ঘোষণা করেন।
দিবসটি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান:
৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হলেও দিনটির ব্যাখ্যা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। বিএনপি দিনটিকে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে পালন করে। দলটির মতে, ১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহি ও জনতার ঐক্যবদ্ধ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পথ সুগম হয়েছিল। এদিন জিয়াউর রহমানের মুক্তি এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনকে দলটি বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে।
অন্যদিকে জাসদ দিনটিকে ‘সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে পালন করে। দলটির রাজনৈতিক ইতিহাসে কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্ব এবং সেনাবাহিনীর ভেতরে বিদ্যমান বৈষম্য ও অসন্তোষের বিরুদ্ধে সৈনিকদের ভূমিকা বিশেষভাবে আলোচিত। এ ছাড় আওয়ামী লীগ দিনটিকে ‘মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক হত্যা দিবস’ হিসেবে আখ্যায়িত করে আসছে। দলটির ব্যাখ্যায় ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।
রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হচ্ছে দিবসটি:
দীর্ঘ বিরতির পর ২০২৫ সালে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস রাষ্ট্রীয়ভাবে পুনরায় পালিত হয়। ২০২৬ সালেও দিবসটি জাতীয়ভাবে পালনের জন্য সরকার ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। গত ৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ৭ নভেম্বর সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ৭ অক্টোবর এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
বিএনপির সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি:
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বিএনপি সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর অংশ হিসেবে আজ রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হবে। এতে নেতৃত্ব দেবেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন, শোভাযাত্রাটি নয়াপল্টন থেকে শুরু হয়ে কাকরাইল, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়, বাংলামোটর ও ফার্মগেট হয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে গিয়ে শেষ হবে। এর আগে সকালে শেরেবাংলা নগরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন প্রধানমন্ত্রীসহ দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা। দেশের বিভিন্ন জেলা ও মহানগরেও শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ও আলোকচিত্র প্রদর্শনীসহ নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে।
ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ এক দিন:
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ শুধু একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার কাঠামো ও ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসে। জিয়াউর রহমানের উত্থান, কর্নেল তাহেরের ভূমিকা, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তার হত্যাকাণ্ড সব মিলিয়ে দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে আলোচিত অধ্যায় হয়ে রয়েছে। প্রায় পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও ৭ নভেম্বরের ঘটনাবলি নিয়ে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক আলোচনা থেমে নেই।