রেলওয়ের নিরাপত্তা বাহিনীতে ‘দুই উল্লাহ’র নজিরবিহীন পদোন্নতি
রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) পদোন্নতির জ্যেষ্ঠতা তালিকায় সালামত উল্লাহ ছিলেন ১১ নম্বরে, আমান উল্লাহ সাত নম্বরে। তবু নিয়ম ভেঙে দুজনই বড় পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। সালামত হয়েছেন ‘অস্থায়ী সহকারী কমান্ডেন্ট’, আমান ‘অস্থায়ী সদর কমান্ডেন্ট’। অভিযোগ রয়েছে এই পদোন্নতি মিলেছে মোটা অঙ্কের লেনদেনে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সালামত ২০ বছর আর আমান ১৩ বছর ধরে ঘুরেফিরে চট্টগ্রামেই। সালামতের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি এবং মাসোহারার বিনিময়ে ২০ জনের বেশি সদস্যের ভুয়া হাজিরা ও ভ্রমণ ভাতা (টিএ) তুলতে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে। আমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ—ভুয়া টিএ বিল, মাদক ও টিকিট কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণ এবং জুলাই আন্দোলনের সময় আওয়ামী-সংশ্লিষ্ট এক নেতার পিস্তল হেফাজতে রাখা। দুজনই ছিলেন সাবেক প্রধান কমান্ডার মো. আশাবুলের ঘনিষ্ঠ। দুজনের এমন উত্থানে বাহিনীর ভেতরেই অসন্তোষ চলছে।
রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর নন-ক্যাডার কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জ্যেষ্ঠতা ও পদোন্নতি বিধিমালা, ২০১১-এর অনুচ্ছেদ ৭(১) অনুযায়ী ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবরের তালিকায় সালামত উল্লাহর নাম ছিল ১১ নম্বরে। কিন্তু দশজনকে ডিঙিয়ে ২০২৫ সালে তিনি ‘অস্থায়ী সহকারী কমান্ডেন্ট’ পদ পেয়েছেন।
বিধিমালা অনুযায়ী এ পদে বিবেচিত হতে ছয় বছর ইন্সপেক্টর ও তিন বছর চিফ ইন্সপেক্টরের দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা লাগে। যোগ্যদের মধ্য থেকে সৎ ও দক্ষদের বিবেচনা করার কথা। সালামত এর কোনোটিই পূরণ করেননি। অভিযোগ আছে, মোটা অঙ্কের লেনদেনের বিনিময়ে রেলওয়ে আরেকটি তালিকা তৈরি করে, যেখানে সালামত উঠে আসেন দুই নম্বরে।
একই ধরনের অভিযোগ আমানের বিরুদ্ধেও। ওই তালিকায় তাঁর নাম ছিল পাঁচ নম্বরে, আরেক তালিকায় সাত নম্বরে। তবু গত আগস্টে তিনি ‘অস্থায়ী সদর কমান্ডেন্ট’ পদ পান। অভিযোগ, এ পদও তিনি মোটা অঙ্কের লেনদেনের মাধ্যমে নিয়েছেন।
২০ বছর চট্টগ্রামেই সালামত
২০০৬ সালে আরএনবিতে উপপরিদর্শক (এসআই) হিসেবে লাকসামে যোগ দেন সালামত। সেখান থেকে আসেন পাহাড়তলীতে। ২০১৯ সালের ৪ এপ্রিল ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি পেয়ে লাকসাম থেকে সিআরবি গোয়েন্দা শাখায় আসেন। সেখানে হাবিলদার পংকজের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে আবার লাকসামে যান। পরে লাকসাম থেকে আসেন অস্ত্র শাখায়। সর্বশেষ ২০২৫ সালে পান ‘অস্থায়ী সহকারী কমান্ডেন্ট’ পদ।
সালামতের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতা, সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ আছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক অনুষ্ঠানেও তাঁকে দেখা গেছে। চট্টগ্রাম-১১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য লতিফের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও রয়েছে। দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম রেলওয়েতে থাকায় তিনি নানা অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন।
আশি সদস্যের অস্ত্র শাখায় ‘ভগবান ডিউটি’
চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের আরএনবি অস্ত্র শাখায় সদস্য আছেন ৮০ জন। অভিযোগ, এর মধ্যে ২০ জনের বেশি মাসের পর মাস কর্মস্থলে না এসেও পুরো বেতন ও ভ্রমণ ভাতা (টিএ/ডিএ) তুলছেন। ইন্সপেক্টর সালামত উল্লাহকে মাসোহারা দিয়ে এই অনিয়ম চলছে। আরএনবি সূত্র জানায়, অস্ত্র শাখায় ‘ভগবান ডিউটি’ নামে একধরনের অলিখিত বাণিজ্য চালু আছে।
আরএনবি সূত্র অনুযায়ী, নিয়মিত ডিউটিতে আসেন না হাবিলদার মো. ইউসুফ পাটোয়ারী, সিপাহী মো. আরিফুল ইসলাম, জিয়া উদ্দিন, মো. সোহেল রানা, কেশুয়া চন্দ্র কপালী, মো. নাজিম উদ্দীন চৌধুরী, মিঠুন চক্রবর্তী, আজিমুল হক সুমন ও মো. মিজানুর রহমানসহ ২০ জনের বেশি সদস্য।
আবার হাবিলদার মো. মনির হোসেন, হাবিলদার মো. জয়নাল আবেদিন, সিপাহী কেশুয়া চন্দ্র কপালী ও সিপাহী মোহাম্মদ মাহমুদুল ইসলাম মাসে মাত্র চার-পাঁচ দিন ডিউটি করে পুরো মাসের বেতন তোলেন।
আরএনবির একজন সদস্য জানান, ‘এই সুবিধার বিনিময়ে জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা করে ইন্সপেক্টর সালামত উল্লাহকে দিতে হয়।’
ভ্রমণ ভাতায় আরেক অনিয়ম
ডিউটিতে না থেকেও ২৬ থেকে ২৮ দিনের টিএ বিল করা হয়। যেমন: হাবিলদার মো. ইউসুফ পাটোয়ারীর নামে গত মার্চে ২৬ দিনের ভ্রমণ বিল দেখিয়ে ১৩ হাজার ৭৭৭ টাকা তোলা হয়েছে।
ট্রেনের স্কর্ট ডিউটিতেও জালিয়াতি
অনুসন্ধানে জানা যায়, সাত-আটটি ট্রেনের স্কর্ট ডিউটির নামে মোটা অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করা হয়। সিপাহী আজিমুল হক সুমন ও সিপাহী মো. মিজানুর রহমান কর্মস্থলে না থাকলেও তাদের নামে ‘ফাইভ আপ’ ট্রেনে ডিউটি দেখিয়ে ভুয়া ভ্রমণ ভাতা তোলা হয়েছে। আর সিপাহী ওমর ফারুক, মো. মতিয়ার, মো. শাহাদাত হোসাইন খোকন ও মো. এনামুল হোসেন ইন্সপেক্টরের বাসায় ব্যক্তিগত ফরমায়েশ খাটেন। অথচ তাদের নামেও নিয়মিত ভ্রমণ ভাতা তোলা হচ্ছে।
রেলের জমি দখলে মাসোহারা
টাইগারপাস ঘুরাইন্না গেট এলাকায় রেলওয়ে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে ৬০-৭০টি ভাসমান দোকান আছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি দোকান থেকে মাসে ৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়। পোস্তারপাড়ের বস্তিঘর ও ছাগলের বাজার থেকে মাসে নেওয়া হয় ১৩ হাজার টাকা।
সূত্র জানায়, শাহীন নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে টাইগারপাস এলাকা থেকে টাকা সংগ্রহ করা হয়। পরে তা নেন নিরাপত্তা বাহিনীর এসআই মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন, যিনি ‘সুন্দরী জসিম’ নামে পরিচিত। নগরীর আকবর শাহ এলাকার পাঞ্জাবি লেন ও শহীদ লেনে বাসা উচ্ছেদের ভয় দেখিয়ে ঘরপ্রতি ৪ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে এসআই জসিমের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, এসব চাঁদার বড় অংশ যায় ইন্সপেক্টর সালামত উল্লাহর পকেটে।
অভিযোগের বিষয়ে ইন্সপেক্টর মোহাম্মদ সালামত উল্লাহ বলেন, ‘সব অভিযোগ মিথ্যা। একটি গোষ্ঠী আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছড়াচ্ছে, কে ছড়াচ্ছে তা আমি জানি।’ পরে তিনি প্রতিবেদককে অফিসে চায়ের দাওয়াত দেন।
আমানের উত্থান
আমান উল্লাহ ২০১৩ সালের ১০ জানুয়ারি আরএনবিতে উপপরিদর্শক (এসআই) হিসেবে যোগ দেন। ওই বছরের ২৭ নভেম্বর প্রশিক্ষণ শেষে চট্টগ্রামের সিআরবি চৌকিতে যোগ দেন। কিছুদিন সেখানে দায়িত্ব পালনের পর যান পাহাড়তলী স্টোরে। এরপর চট্টগ্রাম জেনারেল ও সিজিপিওয়াই চৌকি হয়ে আবার চট্টগ্রাম জেনারেল শাখায় বদলি হয়ে আসেন। ২০১৮ সালের ৪ ডিসেম্বর তিনি ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি পান।
দীর্ঘদিন চট্টগ্রামে থাকায় কর্তৃপক্ষ তাকে বদলির চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। ২০২২ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর তাকে লাকসামে বদলি করা হলে তৎকালীন রেলপথ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবিএম ফজলে করিমের ফোনে একইদিন লাকসামের বদলে তাকে চট্টগ্রাম জেনারেল শাখায় পাঠানো হয়। সেই থেকে আমান চট্টগ্রামেই আছেন।
চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন ও আশপাশের শাখায় থাকার সুযোগে মাদকের স্পট ও টিকিট কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণে তিনি নিজের একটি বাহিনী গড়ে তুলেছেন। টিএ-ডিএ বিলসহ এসব অবৈধ খাত থেকে মাসে তিনি দুই লাখ টাকা হাতিয়ে নেন—রয়েছে এমন অভিযোগও।
জুলাইয়ের অস্ত্র আমানের হেফাজতে
৪ আগস্ট চট্টগ্রামের পুরোনো রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় শিক্ষার্থীদের হামলায় আহত হন চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান আজিজ। স্টেশনের পার্সেল গেটের সামনে তাকে আহত অবস্থায় ফেলে চলে যান শিক্ষার্থীরা। সেখান থেকে আজিজকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান আমান। পরে আজিজের একটি পিস্তল উদ্ধার করে তিনি নিজের হেফাজতে রাখেন।
পরদিন ৫ আগস্ট পরিস্থিতি বদলে গেলে বিপদে পড়েন আমান। তখন আরএনবির এসআই আমিরুল ইসলামের মাধ্যমে ওই পিস্তল রেলওয়ে থানা পুলিশের কাছে জমা দেওয়া হয়। রেলওয়ে থানা পুলিশ তা গ্রহণ না করে কোতোয়ালি থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে।
আমানের কমিশন বাণিজ্য
জানা যায়, চট্টগ্রাম জেনারেল শাখায় আমানের অন্যতম সহযোগী এসআই সোলাইমান ও হাবিলদার ইউসুফ আলী। সোলাইমান প্রায় ১৪ বছর এবং ইউসুফ ২০ বছর ধরে চট্টগ্রামে আছেন। জেনারেল শাখায় থাকাকালে প্রায় ৩০ জনের ভুয়া টিএ বিল তুলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সেই বিল থেকে ২০ শতাংশ হারে কমিশন নিতেন আমান। হাবিলদার ইউসুফ আলীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে টিকিট কালোবাজারির অভিযোগও উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রক ছিলেন আমান।
বিতর্কের পর বদলি, তবু পদ
নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় ২০ আগস্ট আমানকে জেনারেল শাখা থেকে সিআরবির ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চে (আইবি) বদলি করা হয়। তবে ওই বদলির মধ্যেই মোটা অঙ্কের লেনদেনের মাধ্যমে তিনি ‘সদর কমান্ডেন্ট’ পদ বাগিয়ে নেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে আমান উল্লাহ বলেন, ‘এসব অভিযোগ মিথ্যা। আমার ক্ষতি করার জন্য আমার বিরুদ্ধে কোন একটা গোষ্ঠী অপপ্রচার চালাচ্ছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁঞা বলেন, ‘আরএনবির বদলি ও পদোন্নতি সংশ্লিষ্ট বিভাগ করে থাকে। এগুলো তাদেরই দেখার কথা। তবে আমার দপ্তরে এ সংক্রান্ত একটি কপি পাঠানো হয়, যা বদলি বা পদোন্নতির পরেই আমি জানতে পারি। সুতরাং, সেখানে আমার কোনো ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই। তবে বিভাগের অধীন দপ্তর হিসেবে আমি এ বিষয়ে ভূমিকা রাখতে পারি। কেউ দফতর বরাবর অভিযোগ দিলে, পরে সেটি দেখবো।
এই বিষয়ে জানতে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা বাহিনীর চীফ কমান্ডেন্ট মো. জহিরুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিক কল করলেও সাড়া মেলেনি।