০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৫৩

রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলন, হামিম গ্রুপের সব কারখানা বন্ধ

শ্রমিকদের আন্দোলন  © সংগৃহীত

ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ তিন দফা দাবিতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) শ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে রাজধানীর মিরপুর, সাভার-আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। শিল্পাঞ্চলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি বিএনপির নেতাকর্মীদেরও অবস্থান ও মিছিল করতে দেখা গেছে। শ্রমিক অসন্তোষের কারণে শতাধিক পোশাক কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।

আজ মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) হামিম গ্রুপের সব পোশাক কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শ্রমিকদের আন্দোলনের জেরে সোমবার পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের অন্তত ৬৭০ থেকে ৬৯০টি পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, সোমবার ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ ও সাভার-আশুলিয়া এলাকার ৫২৯টি কারখানার কার্যক্রম ব্যাহত হয়। এসব কারখানার প্রায় ৯ লাখ ৮৭ হাজার ১৯০ শ্রমিক কর্মস্থল ছেড়ে বেরিয়ে যান।

আশুলিয়ায় শ্রমিকদের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে হা-মীম গ্রুপের একটি কাভার্ডভ্যানে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। সোমবার সকালে নিশ্চিন্তপুর এলাকার নিউ এইজ পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা কর্মবিরতি শুরু করে পরে বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর সড়কের অনন্ত গার্মেন্টসের সামনে জড়ো হন। সেখান থেকে তারা হা-মীম গ্রুপের কারখানার সামনে গিয়ে বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে উত্তেজনা তৈরি হয়। পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করলে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ শুরু হয়। এ সময় নরসিংহপুরের নদী ফিলিং স্টেশনের সামনে হা-মীম গ্রুপের একটি কাভার্ডভ্যানে আগুন দেওয়া হয়।

এ ঘটনায় শিল্প পুলিশ-১-এর সহকারী পুলিশ সুপার শোয়েব আহম্মেদসহ পথচারী ও সাধারণ শ্রমিকদের অন্তত ২০ জন আহত হন বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কয়েক দফা টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। আশুলিয়া ও সাভারের বিভিন্ন কারখানায় সাধারণ ছুটিও ঘোষণা করা হয়।

সাভারের উলাইল এলাকায় আল-মুসলিমসহ কয়েকটি পোশাক কারখানার সামনে অবস্থান নেন বিক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা। তারা কারখানার ফটকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে ভেতরে কর্মরত শ্রমিকদের বের করে আনার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে তাদের সরিয়ে দেয়। আশুলিয়ার পলাশবাড়ী এলাকাতেও স্কাইলাইন কারখানার সামনে সড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকেরা।

গাজীপুরেও শ্রমিকদের বিক্ষোভ ঘিরে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। নলজানি, লক্ষ্মীপুরা, কোনাবাড়ী, মৌচাক, পল্লী বিদ্যুৎ, চন্দ্রা, ভোগড়া, নাওজোর ও সাইনবোর্ড এলাকায় শ্রমিকেরা বিক্ষোভ মিছিল ও সড়ক অবরোধ করেন। একপর্যায়ে নাওজোর এলাকার ফ্লাইওভারের ওপর পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। একই সময়ে শ্রমিকদের হামলায় সময় টেলিভিশনের একজন প্রতিবেদক ও ক্যামেরাপারসন আহত হন এবং তাদের ক্যামেরা ভাঙচুর করা হয়। পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় শ্রমিকদের ছোড়া ইটপাটকেলের আঘাতে এক বিজিবি সদস্যও আহত হন।

এদিকে রাজধানীর মিরপুরেও শ্রমিকদের বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। মিরপুর-১৪ নম্বর এলাকা থেকে শ্রমিকেরা মিছিল নিয়ে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। একপর্যায়ে ধাওয়া দিয়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়। মিরপুর-১০, ১১, ১২ ও ১৪ নম্বর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। আগের দিনের সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মিরপুরের বিভিন্ন থানায় পাঁচটি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় অজ্ঞাতনামা প্রায় ১৩ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে এবং ৬০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

শ্রমিকদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে নারায়ণগঞ্জেও। সোমবার বেলা ১১টার দিকে বিভিন্ন পোশাক কারখানার শ্রমিকেরা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের শিবু মার্কেট এলাকায় জড়ো হয়ে সড়ক অবরোধ করেন। এতে ওই সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা পর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে শ্রমিকেরা সড়ক থেকে সরে গেলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

পোশাকশ্রমিকদের প্রধান দাবি, মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ। বর্তমানে তাদের ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। এ ছাড়া শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ এবং কালো তালিকাভুক্ত না করার দাবিও জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

এরই মধ্যে শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে ছয় সদস্যের নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে সরকার। তবে বোর্ড গঠনের পরও শ্রমিকদের বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। শ্রমিকদের কাজে ফেরাতে মালিকপক্ষ ও সরকার নানা উদ্যোগ নিলেও শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা কাটেনি।

এছাড়া গার্মেন্টস শ্রমিকের ছদ্মবেশে নাশকতাকারী নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের ৩৩ জন সদস্যকে গত ২৪ ঘন্টায়  গ্রেফতার করেছে ডিএমপি।