২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১৫

মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়িয়ে যাবে বাংলাদেশ

বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ  © সংগৃহীত

বাংলাদেশের মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ বছর দেশের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়াতে পারে ২ হাজার ৮৮৬ ডলারে। যা ভারতে ২ হাজার ৭৪৯ ডলার। তবে মাথাপিছু জিডিপিতে এগিয়ে থাকলেও মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতার হিসাবে বাংলাদেশের সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। খবর আল জাজিরার।

সোমবার (২৫ অক্টোবর) সংবাদ মাধ্যমটির প্রতিবেদন জানিয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তৈরি পোশাক রপ্তানি, প্রবাসী আয় এবং শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ এ অগ্রগতিতে ভূমিকা রেখেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির গতি কমে আসায় অর্থনীতির এই অগ্রগতি চাপে পড়েছে।

ভারতের অর্থনীতি প্রায় আট গুণ বড়
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মোট জিডিপির আকার হতে পারে ৫০৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে ভারতের অর্থনীতির আকার দাঁড়াতে পারে ৪ দশমিক ১৫ ট্রিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ মোট অর্থনীতির আকারে ভারত বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় আট গুণ বড়।

কিন্তু মোট জিডিপিকে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে পাওয়া যায় মাথাপিছু জিডিপি। এ হিসাবে বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ হলেও দেশটির মাথাপিছু জিডিপি ভারতের চেয়ে বেশি হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ।

তবে মাথাপিছু জিডিপি বেশি হওয়ার অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিক ভারতের প্রত্যেক নাগরিকের চেয়ে বেশি আয় করেন। এটি একটি গড় অর্থনৈতিক পরিমাপ, যা দেশের মোট উৎপাদন ও জনসংখ্যার অনুপাত নির্দেশ করে।

ক্রয়ক্ষমতায় এখনো এগিয়ে ভারত
মাথাপিছু জিডিপির হিসাবে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা পারচেজিং পাওয়ার প্যারিটি (পিপিপি) অনুযায়ী ভারত এগিয়ে রয়েছে। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ বছর পিপিপি হিসাবে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হতে পারে ১২ হাজার ৯৯৮ ডলার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ পরিমাণ ১০ হাজার ৮৮৪ ডলার।

পিপিপি হিসাব করে দুই দেশে একই পরিমাণ অর্থ দিয়ে কত পণ্য ও সেবা কেনা যায়। অর্থাৎ স্থানীয় বাজারে পণ্য ও সেবার দামের পার্থক্য বিবেচনায় নিলে ভারতের মানুষের গড় ক্রয়ক্ষমতা বাংলাদেশের চেয়ে বেশি।

এ ছাড়া ভারতে গড় মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ। বাংলাদেশে এ হার হতে পারে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ফলে বাংলাদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার দাম বৃদ্ধির চাপ তুলনামূলক বেশি থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রবৃদ্ধিতে এগিয়ে ভারত
মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশের এগিয়ে থাকার পূর্বাভাস থাকলেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভারত অনেক এগিয়ে রয়েছে। আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৭ শতাংশ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ হার ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বাড়লেও প্রবৃদ্ধির গতি তুলনামূলক ধীর। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাথাপিছু জিডিপির একটি নির্দিষ্ট বছরের হিসাব দিয়ে কোনো দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক শক্তি বা মানুষের জীবনযাত্রার মান পুরোপুরি বোঝা যায় না।

আইএমএফের পূর্বাভাসে আরও বলা হয়েছে, ২০২৭ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ৩ হাজার ২১৯ ডলারে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হতে পারে ৩ হাজার ৩৬ ডলার। ২০২৮ সালেও বাংলাদেশ সামান্য এগিয়ে থাকতে পারে। তবে বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৯ সালে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি ৩ হাজার ৬৬১ ডলারে পৌঁছাতে পারে, যেখানে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা হতে পারে ৩ হাজার ৩৩৪ ডলার।

তৈরি পোশাক ও প্রবাসী আয় বাংলাদেশের শক্তি
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির পেছনে তৈরি পোশাকশিল্প বড় ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি প্রবাসী আয় এবং উৎপাদন খাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধিও অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়েছে। ভারতীয় অর্থনীতিবিদ সন্তোষ মেহরোত্রা বলেছেন, বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে বছরে প্রায় ৬ শতাংশ হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। একই সঙ্গে দেশটিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার দীর্ঘ মেয়াদে কমেছে।

তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশের মোট মূল্য সংযোজনে উৎপাদনশিল্পের অংশ ২০১৪ সালের ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২২ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের জিডিপিতে উৎপাদনশিল্পের অংশ ২০১৪ সালের ১৫ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ২০২৪ সালে ১৩ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

মেহরোত্রার মতে, রপ্তানিমুখী উৎপাদনশিল্পের বিকাশ বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি ইতিবাচক দিক। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড রয়েছে। এ খাত দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি জোগান দেয়। অন্যদিকে, ভারতের অর্থনীতি তুলনামূলক বৈচিত্র্যপূর্ণ। দেশটির প্রযুক্তি, ব্যবসায়িক সেবা, শিল্প, কৃষি ও বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার অর্থনীতির বিভিন্ন চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে।

জ্বালানি সংকট ও রপ্তানি নিয়ে উদ্বেগ
বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ব্যবহৃত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ৯৫ শতাংশ আমদানি করতে হয়। এসব জ্বালানির বড় অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।

আরও খবর: চতুর্থবারের মতো ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হলেন লুলা

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহ এবং হরমুজ প্রণালির নৌপথে বিঘ্ন তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে লোহিত সাগর ও মধ্যপ্রাচ্য হয়ে পণ্য পরিবহনের পথে বিঘ্ন তৈরি হলে তৈরি পোশাক রপ্তানিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায়। এর প্রভাব পড়তে পারে শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা, রপ্তানি আয় ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে।

মাথাপিছু জিডিপি বেশি হলেই কি মানুষ সচ্ছল?
মাথাপিছু জিডিপি একটি দেশের অর্থনৈতিক উৎপাদনের গড় হিসাব। কিন্তু দেশের আয় কীভাবে মানুষের মধ্যে বণ্টিত হচ্ছে, কে কত আয় করছেন কিংবা কত মানুষ দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছেন, তা এ সূচক দিয়ে সরাসরি বোঝা যায় না। আল জাজিরার প্রতিবেদনে অনুযায়ী, বাংলাদেশ ও ভারতে গত এক দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমানভাবে বণ্টিত হয়নি। তুলনামূলক সচ্ছল পরিবারগুলোর হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রবণতাও রয়েছে।

এ ছাড়া ডলারে হিসাব করা মাথাপিছু জিডিপি বিনিময় হারের পরিবর্তনের কারণে ওঠানামা করতে পারে। ফলে উৎপাদন খুব বেশি না বাড়লেও মুদ্রার বিনিময়মূল্য পরিবর্তনের কারণে দেশগুলোর আপেক্ষিক অবস্থানে পার্থক্য দেখা দিতে পারে।

মাথাপিছু জিডিপিতে ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন। তবে এ অর্জন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে, তা নির্ভর করবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আয়বৈষম্য কমানো, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে টেকসই করার ওপর। সূত্র: আল জাজিরা