সরকারি সেবা পেতে ঘুষ দিতে হয় ৭৪ শতাংশ সেবাপ্রার্থীকে: গবেষণা
সরকারি সেবা পেতে ঘুষ ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৭৪ দশমিক ৬ শতাংশ সেবাপ্রার্থী মনে করেন, টাকা না দিলে কোনো কাজ হয় না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরও হয়রানির চিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশের প্রকৃত অর্থনীতির অবস্থা: দারিদ্র্যের পুনরাবির্ভাব ও টিকে থাকার সক্ষমতার গতিশীলতা’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। ২০২৫ সালের ৮ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত দেশের আট বিভাগের ৮ হাজার ৬৭টি পরিবারের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে গবেষণাটি করা হয়।
পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘সব জায়গায় বিষয়টি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, হয়রানিকে রাষ্ট্রীয় ব্যাধি হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে হয়রানি বিনিয়োগসহ দেশের সার্বিক অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, পরিবারের গড় মাসিক আয় ৩২ হাজার ৬৮৫ টাকা এবং ব্যয় ৩২ হাজার ৬১৫ টাকা। মাস শেষে গড়ে উদ্বৃত্ত থাকে মাত্র ৭০ টাকা। পরিবারের মোট ব্যয়ের ৫৪ দশমিক ৯ শতাংশ চলে যায় খাবারের পেছনে। গ্রামীণ পরিবারে এ হার ৫৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ। অন্যদিকে সর্বনিম্ন আয়ের ১০ শতাংশ পরিবারের গড় মাসিক আয় ৮ হাজার ৪৭৭ টাকা হলেও ব্যয় ১২ হাজার ২৯৪ টাকা। এমন পরিস্থিতিতে সেবা পেতে অনানুষ্ঠানিকভাবে ঘুষ দিতে হলে পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়।
গবেষণার পর্যবেক্ষণ হলো, মানুষের দুর্দশা শুধু দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা পরিবারগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকা অনেক পরিবারও অসুস্থতা, ঋণ, অপ্রতুল কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি ও হয়রানির চাপে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এসব চাপ একসঙ্গে জমতে থাকলে ওই পরিবারের পক্ষে সংকট সামাল দেওয়ার সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। নির্ধারিত আলোচনায় বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ২০২২ সালের পর দেশে দারিদ্র্য পরিস্থিতি নিয়ে কোনো খানা আয়-ব্যয় জরিপ হয়নি। ফলে ম্যাক্রো ও মাইক্রো লেভেলের বাস্তবতার মধ্যে একটি বড় শূন্যতা তৈরি হয়েছিল।
পিপিআরসি বড় নমুনা আকারের ওপর ভিত্তি করে যে গবেষণাটি করেছে, তা সবার চোখ খুলে দেওয়ার মতো। সমাজে বাড়তে থাকা বৈষম্য নিয়ে তিনি বলেন, শীর্ষ ১০ শতাংশ ও সর্বনিম্ন ৪০ শতাংশ মানুষের আয়ের অনুপাত বা পালমা রেশিও ২০২২ সালের জরিপে ছিল ৩ দশমিক ২। কিন্তু পিপিআরসির তথ্যের ভিত্তিতে হিসাব করে দেখেছি, এটি এখন ৭ দশমিক ২। এর অর্থ হলো, দেশে আয়বৈষম্য দ্রুতগতিতে বাড়ছে।
সিপিডির ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, পিপিআরসির গবেষণায় দেশে আয়বৈষম্য বৃদ্ধির চিত্র উঠে এসেছে। তার হিসাব অনুযায়ী, শীর্ষ ১০ শতাংশ ও সর্বনিম্ন ৪০ শতাংশ মানুষের আয়ের অনুপাত বা পালমা রেশিও ২০২২ সালের ৩ দশমিক ২ থেকে বেড়ে ৭ দশমিক ২ হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সরকারের রাজস্ব আদায় কম হওয়ায় ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ সীমিত হচ্ছে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির তুলনায় দারিদ্র্য কমার গতি কমে যাওয়া উদ্বেগজনক।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, বৈষম্য দূর করার প্রত্যাশা থাকলেও নীতিনির্ধারকেরা তা বাস্তবায়নে যথেষ্ট অগ্রগতি দেখাতে পারছেন না। তিনি এনবিআরের সংস্কার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।