১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:৩৩

লালন ফকির: ধর্মের সীমানা পেরিয়ে মানবতার সাধক

লালন ফকিরের প্রতিকৃতি  © টিডিসি সম্পাদিত

মানুষের পরিচয় কি জাত-ধর্মে, নাকি মনুষ্যত্বে? ধর্মীয় বিভাজন, জাতপাত ও সামাজিক সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে এই প্রশ্নই বারবার সামনে এনেছেন বাঙালির মরমি সাধক ফকির লালন শাহ। তাঁর কাছে মানুষ ছিল সাধনার কেন্দ্র, মানবপ্রেম ছিল দর্শনের মূল সুর। একতারা ও দোতারার সুরে তিনি শুধু গান বাঁধেননি, তুলে ধরেছেন আত্মপরিচয়, সাম্য, প্রেম ও মুক্তির গভীর জীবনদর্শন। দুই শতাব্দীরও বেশি সময় পরও তাঁর গান বাঙালির চিন্তা ও চেতনায় সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

আজ শনিবার (১৭ অক্টোবর) লালন ফকিরের ১৩৬তম তিরোধান দিবস। ১৮৯০ সালের এই দিনে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় তিনি দেহত্যাগ করেন। তাঁর জন্মসাল ও জন্মস্থান নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। প্রচলিত হিসাবে তাঁর জন্ম ১৭৭২ থেকে ১৭৭৪ সালের মধ্যে বলে ধারণা করা হয়। তবে জন্মপরিচয়ের অনিশ্চয়তা তাঁর সাধনা ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের গুরুত্বকে ম্লান করতে পারেনি।

ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বিতর্ক, দর্শনে মানবতার জয়
লালন ফকির কোন ধর্মীয় পরিবারে জন্মেছিলেন, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। কোনো কোনো গবেষকের মতে, তিনি হিন্দু কায়স্থ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। অন্যদিকে তাঁর জীবন, সাধনা ও সমকালীন বিবরণে মুসলিম ফকিরী ঐতিহ্যের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পরিচয় পাওয়া যায়। জীবনের একটি পর্যায়ে সিরাজ সাঁইয়ের কাছে দীক্ষা গ্রহণের কথাও বিভিন্ন জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে। লালনের গানে সিরাজ সাঁইয়ের উল্লেখ তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে আছে। তবে তাঁর জন্মধর্ম ও ব্যক্তিগত ধর্মীয় পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য সর্বসম্মত নয়।

লালন ফকিরকে ঘিরে মিথ ও বাস্তবতা 
লালন ফকিরের জীবন নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত কিংবদন্তিগুলোর একটি হলো, তীর্থযাত্রার পথে বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি সঙ্গীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন এবং এক মুসলিম নারী তাঁকে আশ্রয় ও সেবা দিয়ে সুস্থ করে তোলেন। পরে তিনি সিরাজ সাঁইয়ের সংস্পর্শে এসে ফকিরি সাধনায় দীক্ষিত হন—এমন বর্ণনাও বিভিন্ন জীবনীতে পাওয়া যায়। তবে তাঁর জীবনের এই ঘটনাগুলোর সবকিছুর পক্ষে নির্ভরযোগ্য সমসাময়িক দলিল নেই; ফলে এগুলোকে নিশ্চিত ইতিহাসের বদলে প্রচলিত জীবনীকথা বা কিংবদন্তি হিসেবে বিবেচনা করাই যুক্তিযুক্ত। লালনের জন্মপরিচয় ও ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বিতর্কের কারণেও এসব কাহিনি তাঁর জীবন ও দর্শন নিয়ে গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।

লালনের ধর্মীয় দর্শনের বিশেষত্ব ছিল বিভিন্ন আধ্যাত্মিক ধারার ভাবধারাকে আত্মস্থ করা। তাঁর গানে ইসলামের সুফি-মরমি চিন্তা, বৈষ্ণব ভাবধারা এবং বাংলার লোকায়ত সাধনার নানা উপাদানের সমন্বয় দেখা যায়। গবেষক মাসাহিকো তোগাওয়ার আলোচনাতেও লালনের দর্শনে ইসলামী ভাবধারা সুফিবাদ ও বৈষ্ণব ঐতিহ্যের প্রভাবের বিষয়টি উঠে এসেছে।

তবে লালনকে কোনো একটি ধর্মীয় মতবাদের অনুসারী হিসেবে সীমাবদ্ধ করে দেখলে তাঁর দর্শনের ব্যাপ্তি বোঝা কঠিন। তিনি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের বাহ্যিকতার চেয়ে অন্তরের উপলব্ধি, আত্মজিজ্ঞাসা ও মানবপ্রেমকে গুরুত্ব দিয়েছেন। জাতপাত ও ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির প্রবণতাকে প্রশ্ন করেছেন। তাঁর কাছে মানুষের ভেতরের সত্যের সন্ধানই ছিল সাধনার অন্যতম লক্ষ্য।

‘সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে’-এই গানের মধ্য দিয়ে তিনি জাতপরিচয় নিয়ে সমাজের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছেন। তাঁর দর্শন যেন বলে, মানুষের প্রকৃত পরিচয় কোনো সামাজিক তকমায় নয়; বরং তার মানবিক উপলব্ধি ও আচরণে।

মনের মানুষের সন্ধানে
লালনের দর্শনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ‘মনের মানুষ’। এই মনের মানুষকে খুঁজে ফেরার আকাঙ্ক্ষা তাঁর গানে কখনো আত্মার অনুসন্ধান, কখনো পরম সত্তার উপলব্ধি, আবার কখনো অন্তরের গভীর প্রেমের প্রকাশ হয়ে উঠেছে।

‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’ কিংবা ‘বাড়ির কাছে আরশিনগর’-এ ধরনের গানে দেহ, আত্মা, অস্তিত্ব ও অজানাকে ঘিরে তাঁর দার্শনিক অনুসন্ধান ফুটে উঠেছে। সহজ ভাষা, পরিচিত উপমা ও গভীর রূপকের মাধ্যমে তিনি এমন সব প্রশ্ন তুলেছেন, যেগুলোর উত্তর মানুষ যুগে যুগে খুঁজে ফিরেছে।

লালনের গান কেবল সংগীত নয়; এগুলো তাঁর সাধনা, দর্শন ও সহজ জীবনবোধের প্রকাশ। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থেকেও তিনি মানুষের আত্মপরিচয়, স্রষ্টা ও সৃষ্টির সম্পর্ক এবং সামাজিক বৈষম্য নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছেন, তা বাংলা লোকদর্শনের এক অনন্য সম্পদ।

মীর মশাররফ ও কাঙাল হরিনাথের সঙ্গে সখ্য
লালন ফকিরের জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তাঁর সমকালীন দুই বিশিষ্ট বাঙালি মনীষী-সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও সমাজসংস্কারক কাঙাল হরিনাথ মজুমদার এবং বাংলা সাহিত্যের অমর গ্রন্থ ‘বিষাদ-সিন্ধু’র অমর কথাসাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেনের সঙ্গে সম্পর্ক।

কুষ্টিয়ার কাছাকাছি অঞ্চলে বসবাসের সূত্রে তাঁদের মধ্যে যোগাযোগ গড়ে ওঠে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে লালন ও কাঙাল হরিনাথের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব এবং মীর মশাররফ হোসেনের সঙ্গে লালনের আন্তরিক সম্পর্কের কথা পাওয়া যায়। তাঁদের সম্পর্ক কেবল ব্যক্তিগত সখ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; উনিশ শতকের বাংলার সাহিত্য, লোকসংগীত ও সমাজচিন্তার ইতিহাসেও এর গুরুত্ব রয়েছে।

কাঙাল হরিনাথ তাঁর ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকার মাধ্যমে গ্রামীণ সমাজের নানা সমস্যা ও শোষণ-নিপীড়নের কথা তুলে ধরতেন। লালনের গান ও মরমি দর্শনের প্রতিও তাঁর আগ্রহ ছিল। লালনের সান্নিধ্য কাঙাল হরিনাথের ভাবজগৎ ও বাউলগান রচনায় প্রভাব ফেলেছিল বলে গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন। তাঁদের বন্ধুত্বের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, জমিদারি অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করায় হরিনাথ বিপদে পড়লে লালন তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বলে বিভিন্ন বিবরণে জানা যায়।

অন্যদিকে মীর মশাররফ হোসেন ছিলেন আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পথিকৃৎ। তাঁর সঙ্গে লালনের পরিচয় ও আলাপের ঐতিহাসিক উল্লেখ রয়েছে। লালনের মৃত্যুর পর ১৮৯০ সালের ৩১ অক্টোবর মীর মশাররফ হোসেন-সম্পাদিত ‘হিতকরী’ পত্রিকায় লালনকে নিয়ে প্রকাশিত লেখা তাঁর জীবন ও পরিচয় সম্পর্কে প্রাথমিক তথ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়।

এই সম্পর্কগুলো দেখায়, লালন কেবল আখড়ার নিভৃত সাধক ছিলেন না; তাঁর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল সমকালীন সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও চিন্তাশীল মানুষের পরিমণ্ডলেও। কাঙাল হরিনাথ ও মীর মশাররফের মতো ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ উনিশ শতকের বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

ছেঁউড়িয়া: সাধনা ও লোকসংস্কৃতির তীর্থ
কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালনের আখড়াবাড়ি আজও তাঁর স্মৃতি ও সাধনার প্রধান কেন্দ্র। এখানেই তিনি শিষ্যদের নিয়ে সাধনা ও সংগীতচর্চা করেছেন। তাঁর মৃত্যুর পরও আখড়াকে ঘিরে বাউল-সাধক, ভক্ত ও সংগীতপ্রেমীদের সমাগম অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবছর তিরোধান দিবস ও দোলপূর্ণিমা উপলক্ষে সেখানে বসে সাধু-ভক্তদের মিলনমেলা।

লালনের গান পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ বহু সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদকে আকৃষ্ট করেছে। রবীন্দ্রনাথের গানে লালনের প্রভাব ভূমিকা রাখে। ফলে বাংলার লোকসংগীতের এই ধারা বৃহত্তর সাহিত্য ও সংস্কৃতির আলোচনায় বিশেষ স্থান অর্জন করে।

লালনের গানের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন। মৌখিক ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে তাঁর বহু গান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়েছে। শিষ্যদের হাতে সংরক্ষিত গানের খাতা এবং পরবর্তী সংগ্রহ ও গবেষণা তাঁর সৃষ্টিকে টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

আজও কেন প্রাসঙ্গিক লালন?
বর্তমান পৃথিবীতে ধর্মীয় বিদ্বেষ, সামাজিক বৈষম্য ও পরিচয়কেন্দ্রিক বিভাজন যখন নানা সংকট তৈরি করছে, তখন লালনের মানবতাবাদী দর্শন নতুন করে ভাবতে শেখায়। তাঁর জীবন ও গান মনে করিয়ে দেয়, অন্যের পরিচয় নিয়ে বিদ্বেষ নয়, মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহমর্মিতাই সমাজকে সুন্দর করে।

লালনকে স্মরণ করা মানে শুধু তাঁর গান গাওয়া কিংবা আখড়াবাড়িতে সমবেত হওয়া নয়; তাঁর দর্শনের মানবিক তাৎপর্য উপলব্ধি করাও। জাতপাতের অহংকার, ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও সামাজিক বিভেদের বিরুদ্ধে তাঁর প্রশ্নগুলো আজও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আজকের সমাজে লালনের প্রাসঙ্গিকতা
প্রযুক্তি ও আধুনিকতার দ্রুত পরিবর্তনের মধ্যেও মানুষে মানুষে অবিশ্বাস, ধর্মীয় বিদ্বেষ, জাতিগত বিভাজন এবং সামাজিক বৈষম্য পৃথিবীর নানা প্রান্তে বিদ্যমান। এমন বাস্তবতায় লালনের মানবতাবাদী দর্শন নতুন করে গুরুত্ব পায়। তাঁর গান মনে করিয়ে দেয়, মানুষের পরিচয় নিয়ে অহংকার কিংবা অন্যকে হেয় করার প্রবণতা সমাজকে বিভক্ত করে; আর পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা ও আত্মজিজ্ঞাসা মানুষকে কাছে আনে।

লালনকে স্মরণ করার অর্থ শুধু তাঁর গান পরিবেশন কিংবা আখড়াবাড়িতে সমবেত হওয়া নয়। তাঁর দর্শনের মানবিক তাৎপর্য উপলব্ধি করা, বিভেদের বদলে সম্প্রীতি এবং বৈষম্যের বদলে সমতার চর্চা করাও জরুরি। তাঁর জীবন ও গান আমাদের সামনে এমন এক সমাজের কল্পনা তুলে ধরে, যেখানে মানুষের মর্যাদা হবে সর্বাগ্রে।

১৮৯০ সালের ১৭ অক্টোবর ছেঁউড়িয়ার আখড়ায় লালন ফকিরের জীবনাবসান ঘটে। কিন্তু তাঁর সৃষ্টির মৃত্যু হয়নি। তাঁর গানের সুরে, মানুষের আত্মজিজ্ঞাসায় এবং সাম্য ও মানবতার আকাঙ্ক্ষায় তিনি আজও বেঁচে আছেন। সময়ের সীমানা পেরিয়ে লালন তাই কেবল বাংলার বাউল সাধক নন-তিনি মানুষের ভেতরের মানুষকে খুঁজে ফেরার এক চিরন্তন আহ্বান।