০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৬:৪৫

বিশ্বসেরা ১০০ বিমানবন্দরের তালিকায় নেই শাহজালাল, দক্ষিণ এশিয়ার সেরা দশেও ঠাঁই হয়নি

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর  © ফাইল ফটো

এক নারী চিকিৎসক এবং জামায়াতে ইসলামীর এক নেতার ভিডিও ভাইরালের ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রী হয়রানি ও সেবায় অব্যবস্থাপনার বিষয়টি ফের আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশের প্রধান আন্তর্জাতিক এই বিমানবন্দর দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার প্রবাসী, পর্যটক ও ব্যবসায়ী যাতায়াত করেন। আসা-যাওয়া করেন বিদেশিরাও। কিন্তু আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে এই বিমানবন্দরের অবস্থান খুবই হতাশাজনক।

বিমানবন্দরের মান যাচাইয়ে বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি যুক্তরাজ্যভিত্তিক স্কাইট্র্যাক্স। প্রতিষ্ঠানটির ওয়ার্ল্ড এয়ারপোর্ট অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬-এ বিশ্বের সেরা ১০০ বিমানবন্দরের যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম নেই। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সেরা দশেও ঠাঁই হয়নি বাংলাদেশের প্রধান আন্তর্জাতিক এই বিমানবন্দরটির। অথচ পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের পাঁচটি বিমানবন্দর বিশ্বসেরা ১০০-তে জায়গা করে নিয়েছে, আর প্রবাসী বাংলাদেশিরা যেসব বিমানবন্দর দিয়ে নিয়মিত আসা-যাওয়া করেন, তার বেশির ভাগই রয়েছে তালিকার ওপরের দিকে।

স্কাইট্র্যাক্সের এই র‍্যাংকিং তৈরি হয় যাত্রীদের ভোটে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলা জরিপে ১০০টির বেশি দেশের যাত্রী অংশ নেন। মূল্যায়ন করা হয় ৫৭৫টির বেশি বিমানবন্দর। চেক-ইন, আগমন, ট্রানজিট, কেনাকাটা, নিরাপত্তা তল্লাশি ও ইমিগ্রেশন থেকে শুরু করে বোর্ডিং গেট পর্যন্ত পুরো যাত্রা নিয়ে যাত্রীদের মত নেয়া হয়। গত ১৮ মার্চ লন্ডনে এই ভোটের ফলাফল ঘোষণা করা হয়।

বিমানবন্দরে দায়িত্বরতদের সঙ্গে হট্টগোল ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ জামায়াত নেতা আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে

এতে টানা ১৪তম বারের মতো এবারও বিশ্বের সেরা বিমানবন্দর হয়েছে সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমান বন্দর। দ্বিতীয় দক্ষিণ কোরিয়ার ইনচন, তৃতীয় জাপানের টোকিও হানেদা। সেরা পাঁচের সবগুলোই এশিয়ার। এর মধ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে কাতারের হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবারের প্রতিযোগিতা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়।

৫৭৫টির বেশি বিমানবন্দরের মধ্যে সেরা ১০০-তে নাম না থাকা মানে শাহজালাল তালিকার নিচের দিকের বিশাল অংশে পড়ে আছে। তবে প্রকাশিত ১০০টির বাইরের বিমানবন্দরগুলোর আলাদা ক্রম স্কাইট্র্যাক্স জানায় না। তাই শাহজালাল ঠিক কত নম্বরে, তা নির্দিষ্ট করে বলার সুযোগ নেই।

দক্ষিণ এশিয়া থেকে বিশ্বসেরা ১০০-তে জায়গা পেয়েছে কেবল ভারত। দেশটির পাঁচটি বিমানবন্দর এই তালিকায় আছে, আর পাঁচটিই আগের বছরের চেয়ে ওপরে উঠেছে। সবচেয়ে বড় লাফ দিয়েছে গোয়ার মনোহর বিমানবন্দর ৮০তম থেকে ৬৪তম। হায়দ্রাবাদ উঠেছে ১৩ ধাপ। দিল্লী বিমানবন্দর ৩২ থেকে ২৮তম ধাপে উন্নীত হয়েছে। ৭ ধাপ এগিয়ে ব্যাঙ্গালোর বিমানবন্দরের অবস্থান ৪১তম, ১৩ ধাপ এগিয়ে হায়দ্রাবাদ ৪৩তম, ৭ ধাপ এগিয়ে মুম্বাই বিমানবন্দরের অবস্থান ৬৬তম। তবে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, নেপাল বা বাংলাদেশের কোনো বিমানবন্দর এই তালিকায় নেই।

শাহজালাল বিমানবন্দরে ভোগান্তি চিকিৎসকের লাইভ ভাইরাল

বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের বড় উৎস মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়া। সেখানকার যে বিমানবন্দরগুলো দিয়ে প্রবাসীরা দেশে ফেরেন, তার প্রায় সব কটি’ই বিশ্বসেরা ১০০-তে। দুবাই ১৩তম, সৌদি আরবের রিয়াদ ১৪তম। রিয়াদ এক বছরে ২৪তম থেকে উঠে এসে এবার বিশ্বের সবচেয়ে উন্নতি করা বিমানবন্দরের পুরস্কারও জিতেছে। বাহরাইন বিমানবন্দর ২০তম, আবুধাবি ২৪, জেদ্দা ২৭, মাদিনা ৫০, দাম্মাম ৫৩, কুয়ালালামপুর ৬০ এবং মাসকাট বিমানবন্দরের অবস্থান ৬৮তম।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার চিত্রও একই রকম ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা ২২তম, থাইল্যান্ডের ব্যাংকক সুবর্ণভূমি ৩৬তম, ভিয়েতনামের হ্যানয় ৭১তম।

বিশ্ব তালিকার পাশাপাশি স্কাইট্র্যাক্স প্রতিটি অঞ্চলের আলাদা সেরা দশও প্রকাশ করে। ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার সেরা দশে ৯টিই ভারতের বিমানবন্দর। একমাত্র ব্যতিক্রম শ্রীলঙ্কার কলম্বো, যার অবস্থান সপ্তম। শীর্ষে দিল্লি, যা অঞ্চলের সেরা বিমানবন্দরের পুরস্কারও পেয়েছে। কর্মীদের সেবায় অঞ্চলের সেরা হয়েছে হায়দ্রাবাদ, আর আঞ্চলিক বিমানবন্দর হিসেবে সেরা ব্যাঙ্গালোর।

দক্ষিণ এশিয়ার তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়- চেন্নাই, কোচিন, আহমেদাবাদ ও কলকাতা বিশ্বসেরা ১০০-তে না থাকলেও আঞ্চলিক তালিকায় ঢাকার আগে জায়গা পেয়েছে। এর মধ্যে চেন্নাইয়ের মানসনদ ঢাকার মতোই ২-স্টার। অর্থাৎ সুযোগ-সুবিধার মানে সমান স্তরে থেকেও যাত্রীদের ভোটে চেন্নাই দক্ষিণ এশিয়ার ষষ্ঠ সেরা, অথচ ঢাকা দশের মধ্যেও নেই। প্রতিবেশী পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার বিমানবন্দরও ঢাকাকে পেছনে ফেলেছে। পাকিস্তানের করাচি ও লাহোর, নেপালের কাঠমান্ডু কিংবা মালদ্বীপের মালে এ অঞ্চলের আরও কয়েকটি রাজধানী বা প্রধান বিমানবন্দরও এই সেরা দশে নেই। ফলে ঢাকার অনুপস্থিতি একক ঘটনা নয়। তবে দেশের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে শাহজালাল যে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় ভারতের কোচিন বা আহমেদাবাদের মতো শহরের বিমানবন্দরেরও পেছনে পড়ে আছে, সেটিই বড় প্রশ্ন।

তবে থার্ড টার্মিনালেই সমাধান দেখছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন মো. রাগীব সামাদ বলেন, বর্তমানে বিমানবন্দরের যে যাত্রী ধারণক্ষমতা রয়েছে, তা অনেক আগেই অতিক্রম হয়ে গেছে। যাত্রীদের অতিরিক্ত চাপ ও সীমাবদ্ধতা মোকাবিলা করার দূরদর্শী পদক্ষেপ হিসেবে ‘টার্মিনাল-৩’ নির্মাণ করা হয়েছে। আগামী ১৬ ডিসেম্বর থেকে এই নতুন টার্মিনালের কার্যক্রম বা পরিচালনা শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তখন আর অভিযোগগুলো থাকবে না।

মালামাল হারানোর অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এটি কেবল নির্দিষ্ট কোনো বিমানবন্দরের সমস্যা নয়; বরং বিশ্বের প্রায় সব বিমানবন্দরেই ‘লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড’ সেকশন থাকে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা শিডিউল বিপর্যয়ের কারণে অনেক সময় নির্দিষ্ট ফ্লাইটে যাত্রীদের ব্যাগ পৌঁছায় না। পরবর্তীতে সেগুলোকে ট্র্যাক করে যাত্রীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি প্রক্রিয়া। অনেক সময় অরিজিন যাত্রা শুরুর স্থান থেকেই সিকিউরিটি রেস্ট্রিক্টেড আইটেম (যেমন পাওয়ার ব্যাংক) থাকলে নিয়ম অনুযায়ী তা ব্যাগ থেকে সরিয়ে ফেলা হয়। এছাড়া কাস্টমস স্ক্যানিংয়ের সময় শুল্কযুক্ত পণ্য যাত্রীর সামনেই তল্লাশি করে বের করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী এগুলো করা হলেও অনেক সময় যাত্রীরা মনে করেন তাদের ব্যাগ কেটে জিনিসপত্র চুরি বা নষ্ট করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, প্রবাসীদের বহন করা কাগজের কার্টুনগুলো খুব বেশি শক্তিশালী বা টেকসই হয় না। বিমানের কার্গো বা কন্টেইনারে লোডিংয়ের সময় ওপরের অন্যান্য ব্যাগেজের চাপে এই কার্টুনগুলো প্রায়ই ফেটে যায় বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে গন্তব্যে পৌঁছানোর পর যাত্রীরা তাদের ব্যাগ বা মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় পান, যা নিয়ে অনেক সময় অনভিপ্রেত ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়।

সূত্র: দি ইনসাইটা