১৯ আগস্ট ২০২৬, ১৫:৫৮

সহমর্মিতায় বদলে যাক পৃথিবী, আজ বিশ্ব মানবিকতা দিবস

বিশ্ব মানবিকতা দিবস  © টিডিসি সম্পাদিত

আজ ১৯ আগস্ট, বিশ্ব মানবিকতা দিবস। যুদ্ধ, সংঘাত, দুর্ভিক্ষ, রোগব্যাধি কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষ নানা সংকটের মধ্যে দিন কাটান। বিপদের সময়ে তাদের পাশে দাঁড়াতে নিজের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যকে উপেক্ষা করে কাজ করে যাচ্ছেন হাজারো মানবিক সহায়তাকর্মী।

কেউ দুর্গত মানুষের হাতে তুলে দেন ত্রাণ, কেউ দেন চিকিৎসাসেবা, কেউ ব্যবস্থা করেন খাবার ও আশ্রয়ের। আবার কেউ যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের কাছে পৌঁছে দেন সহমর্মিতা ও আশার বার্তা। মানবতার সেবায় কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় এসব নিবেদিতপ্রাণ মানুষকেও প্রাণ দিতে হয়।

মানবিক সহায়তাকর্মীদের সাহস, ত্যাগ ও নিষ্ঠাকে স্মরণ এবং তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই প্রতিবছর ১৯ আগস্ট বিশ্ব মানবিকতা দিবস পালন করা হয়। একই সঙ্গে বিশ্বের অসহায় ও বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্বও মনে করিয়ে দেয় দিনটি।

মানবতার জন্য এক দিন
বিশ্ব মানবিকতা দিবসের মূল বার্তা হলো মানবিকতার কোনো সীমান্ত নেই। এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশ, ধর্ম, জাতি বা গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে মানুষ সংকটে পড়লে তার পাশে দাঁড়ানোই মানবতার পরিচয়।

দারিদ্র্য, রোগব্যাধি কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে যুদ্ধ ও সহিংসতায় বিপর্যস্ত জনপদ সব জায়গাতেই মানবিক সহায়তাকর্মীরা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করেন। তাদের লক্ষ্য বিপদগ্রস্ত মানুষের কষ্ট কমানো এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সহায়তা করা।

যেভাবে মানবিকতার চর্চা করা যায়
বিশ্ব মানবিকতা দিবস পালনের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হতে পারে নিজের চারপাশের মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া। অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে অংশ নেওয়া কিংবা দাতব্য প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে যুক্ত হওয়া মানবিকতার গুরুত্বপূর্ণ চর্চা।

পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান যুদ্ধ ও সংঘাত সম্পর্কে জানা এবং সেখানকার সাধারণ মানুষের দুর্দশা সম্পর্কে সচেতন হওয়াও জরুরি। কারণ যুদ্ধের ক্ষতি শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সবচেয়ে বড় শিকার হন সাধারণ মানুষ বিশেষ করে শিশু, নারী, বয়স্ক ও অসহায় পরিবারগুলো।

পরিবার, বন্ধু ও সহকর্মীদের সঙ্গে এসব বিষয়ে আলোচনা করে সচেতনতা তৈরি করা যেতে পারে। সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ, খাদ্য, পোশাক বা প্রয়োজনীয় সামগ্রী দিয়ে সহযোগিতা করার পাশাপাশি অন্যদেরও স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে উৎসাহিত করা মানবিকতার চর্চাকে আরও বিস্তৃত করতে পারে।

যে আত্মত্যাগের স্মরণে এই দিবস
বিশ্ব মানবিকতা দিবসের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্রাজিলীয় কূটনীতিক ও মানবিক সহায়তাকর্মী সার্জিও ভিয়েরা দে মেলোর নাম। জাতিসংঘের হয়ে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে কাজ করেছেন। প্রায় তিন দশক ধরে সশস্ত্র সংঘাতের শিকার মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি।

২০০৩ সালের ১৯ আগস্ট ইরাকের বাগদাদে জাতিসংঘের সদর দফতরে ভয়াবহ বোমা হামলায় সার্জিও ভিয়েরা দে মেলোসহ ২২ জন মানবিক সহায়তাকর্মী নিহত হন। তাদের স্মরণে পরবর্তীতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯ আগস্টকে বিশ্ব মানবিকতা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

সার্জিওর কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা। তিনি মনে করতেন, যুদ্ধের গল্প শুধু যোদ্ধাদের মৃত্যু কিংবা সরকারগুলোর সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে। ঘরবাড়ি হারানো, স্বজন হারানো, খাদ্য ও চিকিৎসার সংকট এবং নিরাপত্তাহীনতার মধ্য দিয়েই তাদের জীবন কাটাতে হয়।

মানবিকতার ডাক
বিশ্ব মানবিকতা দিবস তাই শুধু একটি স্মরণীয় দিন নয়, মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্বের কথাও মনে করিয়ে দেয়। পৃথিবীর কোথাও যুদ্ধ চলছে, কোথাও মানুষ ক্ষুধার্ত, আবার কোথাও চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। এমন বাস্তবতা থেকে চোখ ফিরিয়ে না নিয়ে সামর্থ্য অনুযায়ী পাশে দাঁড়ানোই মানবিকতার পরিচয়।

সার্জিও ভিয়েরা দে মেলো এবং তার মতো হাজারো মানবিক সহায়তাকর্মীর আত্মত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানবতার জন্য কাজ করতে সবসময় বড় কোনো উদ্যোগের প্রয়োজন নেই। একজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, প্রয়োজনের সময়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া কিংবা অন্য কাউকে মানবিক কাজে উৎসাহিত করাও বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।

মানুষের কাজে, সহমর্মিতায় এবং একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকারে মানবিকতা আরও শক্তিশালী হোক বিশ্ব মানবিকতা দিবসে এটাই প্রত্যাশা।