এসএসসির ফলের পর ১০ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা, সরকারকে ৮ পদক্ষেপ নেওয়ার আহবান
১০ আগস্ট এসএসসি ও সমমানের ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর এ পর্যন্ত ১০ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে বলে জানিয়েছে আঁচল ফাউন্ডেশন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৮ দফা পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানিয়েছে সংগঠনটি। আজ রবিবার (১৬ আগস্ট) ‘২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল পরবর্তী শিক্ষার্থীদের মৃত্যু ও আত্মহত্যার ঝুঁকি: জরুরি সরকারি পদক্ষেপের আহবান’ শীর্ষক বিবৃতিতে এ আহবান জানানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়েছ, ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের মৃত্যু ও আত্মহত্যার একাধিক সংবাদে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে আঁচল ফাউন্ডেশন। ১০ আগস্ট ফলাফল প্রকাশের পর রাজশাহী, কুষ্টিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম, শেরপুর , গোপালগঞ্জ, মেহেরপুর, কুমিল্লা ও চুয়াডাঙ্গা থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১০ জন শিক্ষার্থীর মৃত্যুর খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
এসব ঘটনার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার বা প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার পর তীব্র মানসিক চাপে পড়েছিল বলে পরিবার ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। এসব প্রতিবেদনে উল্লিখিত দশজনের মধ্যে সাতজন মেয়ে এবং তিনজন ছেলে শিক্ষার্থী। অর্থাৎ সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত এসব ঘটনার প্রায় ৭০ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী এবং ৩০ শতাংশ পুরুষ শিক্ষার্থী। এছাড়াও পরীক্ষা আশানুরূপ না হওয়াও পরীক্ষা চলাকালীন গত মে মাসে ভোলার একজন নারী শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা করার ঘটনাও সংবাদ মাধ্যমে উঠে এসেছে।
আরও বলা হয়েছে, প্রতিনিয়ত এসব আত্মহত্যার ঘটনা আমাদের মুখস্থ ও ফলাফল ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার অসারতা প্রমাণ করছে। বাস্তবমুখী, কর্মমুখী, দক্ষতাভিত্তিক আনন্দময় শিক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রতি সরকারের মনোনিবেশ করতে হবে। ফলাফল নির্ভরতা কমিয়ে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা অর্জনের সুযোগ থাকা দরকার।
সংগঠনটি বলছে, ২০২৫ সালে প্রকাশিত ইউএনডিপির বৈশ্বিক জ্ঞান সূচকে ১৯৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১০তম। উন্নত বিশের আঙ্গিনায় প্রবেশ করার জন্য বৈশ্বিক জ্ঞান সূচকে প্রথম সারির ২০টি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা অনুকরণ করা যেতে পারে।
আঁচল ফাউন্ডেশনের সমন্বয়কৃত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অন্তত ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। ২০২৪ সালে এই সংখ্যাটি ছিলো ৩১০ জন, ২০২৩ সালে ছিল ৫১৩ জন এবং ২০২২ সালে ছিল ৫৩২ জন। যেসব কারণে শিক্ষার্থীরা আত্মহত্যার দিকে পা বাড়ায়, তাদের মাঝে পড়াশুনার চাপ এবং পরীক্ষার ফলাফল অন্যতম নিয়ামক।
একটি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া কিংবা প্রত্যাশিত ফলাফল না পাওয়া কোনোভাবেই একজন শিক্ষার্থীর জীবনের মূল্য বা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে নির্ধারণ করে না। কিন্তু ফলাফলকে জীবনের সাফল্য-ব্যর্থতার একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে উপস্থাপন করা হলে হতাশা, লজ্জা, ভয় ও সামাজিক চাপ সংকটকে আরও গভীর করতে পারে।
আঁচল ফাউন্ডেশন মনে করে, শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনাগুলোকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখার পরিবর্তে শিক্ষাব্যবস্থা, পরিবার, সমাজ এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সমন্বিত দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের সময় শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ ও ঝুঁকি মোকাবিলায় পূর্বপ্রস্তুতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশভিত্তিক গবেষণাতেও পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের সময়কে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঝুঁকি বৃদ্ধির একটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত মানসিক পরামর্শসেবা এবং ফলাফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে আঁচল ফাউন্ডেশন সরকারের প্রতি নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণের আহবান জানাচ্ছে-
১.পরিবার থেকে পরীক্ষার সময় এবং ফলাফল প্রকাশের পরবর্তী অন্তত দুই সপ্তাহ শিক্ষার্থীদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ ও নজরদারি জোরদার করা।
২. প্রতিটি মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষিত পরামর্শদাতা ও প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
৩. এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের আগে ও পরে শিক্ষার্থীদের জন্য হটলাইন বা বিশেষ মানসিক পরামর্শ ও মানসিক সহায়তা কার্যক্রম চালু করা।
৪. শিক্ষক ও অভিভাবকদের শিক্ষার্থীদের মানসিক সংকট, আচরণগত পরিবর্তন এবং আত্মহানির সম্ভাব্য ঝুঁকির লক্ষণ শনাক্তকরণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
৫. পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হলে শিক্ষার্থীদের অপমান, শাস্তি, ভয় দেখানো এবং অন্য শিক্ষার্থীর সঙ্গে তুলনা না করার বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে অভিভাবক সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা।
আরও পড়ুন: রাবি ভর্তি পরীক্ষার সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ কর্তৃপক্ষের, কেন্দ্র ৭ শহরে
৬. শিক্ষার্থী আত্মহত্যা প্রতিরোধে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, শিক্ষা বোর্ড, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ কাঠামো প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা।
৭. ফলাফল প্রকাশের পর মানসিকভাবে ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের শনাক্ত, পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী যথাযথ মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করার জন্য প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যকর সহায়তা ও সংযোগব্যবস্থা চালু করা।
৮. গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আত্মহত্যার ঘটনা প্রচারের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীল সংবাদ পরিবেশন নিশ্চিত করতে হবে এবং ঘটনার অতিরঞ্জিত, চাঞ্চল্যকর বা অনুকরণে উৎসাহিত করতে পারে এমন উপস্থাপন পরিহার করা।
আঁচল ফাউন্ডেশন একই সঙ্গে অভিভাবক, শিক্ষক এবং সমাজের প্রতি আহবান জানাচ্ছে, একটি পরীক্ষার ফলাফলকে কোনো শিক্ষার্থীর জীবনের চূড়ান্ত পরিচয় হিসেবে বিবেচনা না করে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। একটি কম জিপিএ, অকৃতকার্য হওয়া কিংবা প্রত্যাশিত ফলাফল না পাওয়া একটি সাময়িক একাডেমিক ফলাফল, এটি জীবনের শেষ নয়।
শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা শুধু পরিবারের দায়িত্ব নয়; এটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র এবং সমগ্র সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। কেননা একটি পরীক্ষার ফলাফলের চেয়ে একজন শিক্ষার্থীর জীবন অসীমভাবে মূল্যবান।
আঁচল ফাউন্ডেশন আশা করে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সরকার দ্রুত কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন এবং দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য একটি নিরাপদ, সহানুভূতিশীল ও মানসিকভাবে সহায়ক শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করবেন।