০৩ আগস্ট ২০২৬, ২১:০৫

পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে জাতীয় সংলাপ: পানি নিরাপত্তা, কৃষি ও জলবায়ু সহনশীলতায় গুরুত্বারোপ

‘পদ্মা ব্যারাজ: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক  © সংগৃহীত

দেশের পানি নিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু সহনশীলতা এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা মোকাবিলায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, কার্যকর নীতি প্রণয়ন এবং সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আজ  দুপুর তিনটায় অনুষ্ঠিত ‘পদ্মা ব্যারাজ: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব মতামত উঠে এসেছে । অনুষ্ঠান টির আয়োজন করে ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল কো-অপারেশন ফাউন্ডেশন (আইজিসিএফ)।

গোলটেবিল আলোচনায় নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব এবং উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। আলোচনায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক, সামাজিক, পরিবেশগত ও জলবায়ুগত প্রভাব, পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি উৎপাদনশীলতা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং টেকসই উন্নয়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে মতবিনিময় করা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা  উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘বাংলাদেশের মৌলিক সমস্যা হলো ‘Too much water or Too little water’. কিন্তু বাস্তবে এই বিষয়ে একমাত্র যুগান্তকারী মাইলফলক গঙ্গার পানি বন্ঠন চুক্তি গ্রহণ করা হয় ১৯৭৭ সালে। এর পরে নানাবিধ পরিকল্পনা নেয়া হলেও সেভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি। বর্তমানে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় জনগণের আকাঙ্ক্ষা কে মাথায় রেখে ব্যারেজের নকশা পরিবর্তন করা হয়েছে ।পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) অতিরিক্ত শূন্য দশমিক পাঁচ শতাংশ থেকে এক শতাংশ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি যোগ হবে।’

প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী (পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক) ড. সাইমুম পারভেজ বলেন, ‘আমাদের ইলেকশন মেনিফেস্টোতে একটি মেগা প্রজেক্ট ছিল, সেটি হলো এই পদ্মা ব্যারাজ। আমরা অতি দ্রুত পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে পদক্ষেপ নেবো । এক্ষেত্রে আমরা ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ ফর্মুলাই প্রয়োগ করব। অন্য কোন দেশের খবরদারি বা নজরদারি আমরা মেনে নেয়া হবে না। আমাদের জনগণের জন্য এই পানি সমস্যা ও দুর্যোগ মোকাবেলায় যা যা করতে হবে তার সব কিছুই সরকার করবে।’

মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর, চেয়ারম্যান, এফএসডিএস(দি ফাউন্ডেশন ফর স্ট্রাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ) বলেন, ‘চীন ২০২৫ সালে ব্রহ্মপুত্রের উজানে যে মেগা প্রকল্প শুরু করেছে, তা ২০৩০ সালে সম্পন্ন হওয়ার কথা এবং এর মাধ্যমে ৬৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে আঞ্চলিক পানি নিরাপত্তা ও ভূরাজনীতিতে এর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়তে পারে। পাশাপাশি ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাও জরুরি।’

অনুষ্ঠানে মডারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল সাইন্স অ্যান্ড সোশিওলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. বুলবুল সিদ্দিকী। তিনি বলেন, ‘দেশের চারটি বিভাগ, ১৯টি জেলা, এবং সাত কোটি মানুষের কথা মাথায় নিয়ে, ষাটের দশকে পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। বাংলাদেশ ভারত গঙ্গা পানি বন্ঠন চুক্তি আর পদ্মা ব্যারাজ একে অপরের সাথে সম্পৃক্ত। আমাদের একটি প্রধান সমস্যা হলো শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি সংরক্ষণ করতে না পারা। তাছাড়া আমরা লক্ষ্য করি পদ্মায় পানি থাকা সত্ত্বেও শাখা নদীতে পানি পৌছায় না। আমাদের উদ্দেশ্য এসব বিষয় মাথায় নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সরকারকে পলিসি মেকিং এ সহায়তা করা যাতে দুর্বল নকশা এবং পুরোনো অবকাঠামো সংস্কারে সহায়তা হয়।’

আইজিসিএফের চেয়ারম্যান মাহমুদুর রহমান শাওন বলেন, ‘আজকের আলোচনার উদ্দেশ্য হলো বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও সমালোচনামূলক পর্যবেক্ষণ একত্র করা, যাতে প্রকল্পটির সম্ভাবনার পাশাপাশি এর কারিগরি, পরিবেশগত, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও কূটনৈতিক ঝুঁকিগুলোও স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা যায়। একনেক, ১৩ ই মে নিজস্ব অর্থায়নে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে পদ্মা ব্যারাজের প্রথম ধাপ অনুমোদন করেছে। পদ্মা ব্যারাজ বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি বড় অবকাঠামোগত প্রকল্প নয়; এর সঙ্গে পানি নিরাপত্তা, কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, নদীর প্রবাহ, পলি ব্যবস্থাপনা, সুন্দরবন, জীববৈচিত্র্য, আঞ্চলিক পানি কূটনীতি এবং বিপুল সরকারি বিনিয়োগের প্রশ্ন যুক্ত রয়েছে।’

আলোচনায় অংশগ্রহণকারী বক্তারা দেশের পানি সম্পদের কার্যকর ব্যবহার, শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ, নদী ও শাখা নদীগুলোর প্রবাহ পুনরুদ্ধার, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি বলে উল্লেখ করেন। তারা পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের সম্ভাব্য সুফল ও চ্যালেঞ্জ উভয় দিক বিবেচনায় নিয়ে বৈজ্ঞানিক ও তথ্যনির্ভর মূল্যায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

গোলটেবিল বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূঁইয়া, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ড. নুরুল ইসলাম, জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আব্দুল হান্নান চৌধুরী, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সিরাজুল ইসলাম, অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. জাভেদ হোসেন, ঢাকা স্ট্রিমের সম্পাদক ইফতেখার মাহমুদ, জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ডক্টরাল ফেলো ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ বিন আলী, র‍্যানকন ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের সিওও সুবাইল বিন আলম  সহ আরো অনেকে ।

আলোচনা শেষে অংশগ্রহণকারীরা দেশের দীর্ঘমেয়াদি পানি নিরাপত্তা, কৃষি উৎপাদনশীলতা, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এ ধরনের নীতি সংলাপ অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।