বিশ্বজুড়ে আরও আড়াই কোটি শিশু দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে, বাংলাদেশে দরিদ্র হতে পারে ১২ লাখ: ইউনিসেফ
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত এবং এর ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে চলতি বছরের শেষ নাগাদ বিশ্বের আরও ২ কোটি ৩৪ লাখ শিশু আর্থিক দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে পারে। এর অভিঘাতে বাংলাদেশেও নতুন করে দরিদ্র হতে পারে প্রায় ১২ লাখ মানুষ। জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফ প্রকাশিত নতুন এক বিশ্লেষণে এমন আশঙ্কা তুলে ধরা হয়েছে।
‘দ্য ইমপ্যাক্ট অব দ্য ওয়ার ইন দ্য মিডল ইস্ট অন চিলড্রেন ইন মনিটারিলি পুওর হাউসহোল্ডস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে ১৬৭টিরও বেশি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে ধাক্কা লেগেছে। এতে পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা।
ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সংঘাতের মূল্য দিচ্ছে শিশুরা। শুধু ওই অঞ্চলের নয়, বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের শিশুরাও। এই পরিস্থিতি যত দীর্ঘায়িত হবে, এর পরিণতি ততই ভয়াবহ হবে। খাদ্য ও শিক্ষার ব্যয় দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় বহু পরিবারের পক্ষে মৌলিক চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। যারা আগেই দারিদ্র্যের মধ্যে ছিল, তাদের জন্য এই সংকট আরও গভীর বঞ্চনা সৃষ্টি করছে, যার প্রভাব সারাজীবন থেকে যেতে পারে।
প্রতিবেদনে দুটি সম্ভাব্য চিত্র তুলে ধরা হয়েছে— প্রতিকূল পরিস্থিতি এবং গুরুতর পরিস্থিতি। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মাঝারি মাত্রার অর্থনৈতিক ধাক্কার ফলে অতিরিক্ত ১ কোটি ৮৩ লাখ শিশু দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে পারে। অন্যদিকে, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা আরও তীব্র হলে ২ কোটি ৩৪ লাখ অতিরিক্ত শিশু আর্থিক দারিদ্র্যের শিকার হতে পারে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, শিশুদের আর্থিক দারিদ্র্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক ধাক্কার প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল। খাদ্য ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং অনেক দেশের সীমিত আর্থিক সক্ষমতা পরিবারগুলোর মৌলিক চাহিদা পূরণের ক্ষমতাকে সরাসরি কমিয়ে দিচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী শিশু দারিদ্র্য বৃদ্ধির প্রায় ৮০ শতাংশই এশিয়া ও আফ্রিকায় ঘটবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ এই দুই অঞ্চলে আগে থেকেই দারিদ্র্যের হার বেশি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কার প্রভাবও তুলনামূলক বেশি।
ইউনিসেফের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, শাকসবজি, মাছ ও মুরগির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবারগুলো চাপে পড়েছে। এর ফলে প্রায় ১২ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া আফ্রিকার দেশ সোমালিয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে পড়েছে। সংঘাত শুরুর কয়েক দিনের মধ্যেই রাজধানী মোগাদিশুতে জ্বালানির দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যায়। ফলে খাদ্য, পানি, পরিবহন ও মানবিক সহায়তার ব্যয় বেড়ে গেছে, যা দেশটির চলমান অপুষ্টি সংকটকে আরও তীব্র করছে।
ইথিওপিয়ায় হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্নের কারণে জ্বালানির দাম বেড়েছে। ডিজেলের দাম ৩১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মানবিক সহায়তার কাজে ব্যবহৃত জ্বালানির খরচ ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে নাইজেরিয়ায় নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাদের আয়ের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ খাদ্য ও পরিবহনে ব্যয় করে। ফলে সামান্য মূল্যবৃদ্ধিও তাদের ক্রয়ক্ষমতার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে।
ইউনিসেফ সতর্ক করে বলেছে, এই সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাবের কারণে বিশ্বজুড়ে দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে বহু বছরের অর্জিত অগ্রগতি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সময়মতো কার্যকর নীতি গ্রহণ না করলে আরও কোটি কোটি শিশু গভীর দারিদ্র্যের মধ্যে চলে যাবে এবং সেখান থেকে তাদের বেরিয়ে আসা আরও কঠিন হয়ে পড়বে। এর ফলে পরিবারগুলোর খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও শিশু সুরক্ষা সেবায় প্রবেশাধিকার সীমিত হচ্ছে, যা শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সংকট মোকাবিলায় ইউনিসেফ জাতীয় সরকার, দাতা দেশ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি পাঁচটি প্রধান পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এগুলো হলো— শিশুদের জন্য স্বাস্থ্য, পুষ্টি, শিক্ষা ও সুরক্ষা খাতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিশ্চিত করা, শিশু-সংবেদনশীল নগদ সহায়তাসহ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং ভর্তুকি প্রত্যাহারের আগেও সহায়তা অব্যাহত রাখা, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যূনতম সরকারি ব্যয় নিশ্চিত করে পরিবারগুলোর জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবা প্রাপ্যতা বজায় রাখা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বিনিয়োগ রক্ষায় প্রয়োজন হলে ঋণের কিস্তি স্থগিত বা ঋণ পুনর্গঠনের মাধ্যমে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং ভবিষ্যতের সংকট মোকাবিলায় শিশু-কেন্দ্রিক প্রস্তুতি, দ্রুত সহায়তা ব্যবস্থার উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা।
ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক ক্যাথরিন রাসেল বলেন, এই সংকট শিশুদের জীবন ও ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলেছে। বিশ্ব যদি দ্রুত পদক্ষেপ না নেয়, তবে সংঘাত, অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও মূল্যবৃদ্ধির সম্মিলিত প্রভাবে আরও কোটি কোটি শিশু গভীর দারিদ্র্যের মধ্যে তলিয়ে যাবে। এতে বহু বছরের উন্নয়ন অগ্রগতি ভেঙে পড়তে পারে।