১৫ জুলাই ২০২৬, ০৯:১০

শিক্ষিত তরুণদের দক্ষতায় পিছিয়ে বাংলাদেশ, ৮১ দেশের মধ্যে ৬৭তম

প্রতীকী ছবি   © সংগৃহীত

আজ বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস। এমন এক সময়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে যখন দেশের বিশাল কর্মক্ষম তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর এবং তাদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিভিন্ন সংস্থার সাম্প্রতিক জরিপ ও সূচকে বাংলাদেশের তরুণ ও গ্র্যাজুয়েটদের দক্ষতার ঘাটতি এবং ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

কিউএস ওয়ার্ল্ড ফিউচার স্কিলস ইনডেক্স ২০২৫ অনুযায়ী, চাকরিদাতাদের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ গ্র্যাজুয়েট তৈরিতে বাংলাদেশের স্কোর ৩৯ দশমিক ১, যা ৮১টি দেশের মধ্যে ৬৭তম অবস্থান নির্দেশ করে। ভবিষ্যৎ উপযোগী একাডেমিক প্রস্তুতিতে বাংলাদেশের স্কোর ৬৫ দশমিক ৭ এবং ভবিষ্যৎ শ্রমবাজারে প্রস্তুতির ক্ষেত্রে ৪২ দশমিক ৬। অর্থনৈতিক রূপান্তর সূচকে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় বাংলাদেশকে কোনো স্কোর দেওয়া হয়নি। সব সূচক মিলিয়ে দেশের চূড়ান্ত স্কোর ৪৯ দশমিক ১।

ইনডেক্সটি প্রণয়নে প্রায় ৫০ লাখ চাকরিদাতার মতামত, বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং, গবেষণার মানসহ বিভিন্ন সূচক বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এতে চারটি প্রধান সূচক—চাকরিদাতাদের চাহিদা অনুযায়ী গ্র্যাজুয়েটদের দক্ষতা, ভবিষ্যৎমুখী একাডেমিক প্রস্তুতি, অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সক্ষমতা- ১০০ নম্বরের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়েছে।

ইনডেক্স অনুযায়ী, যে দেশগুলোর স্কোর ১০০ এর কাছাকাছি, সেসব দেশের গ্র্যাজুয়েটরা বৈশ্বিক চাকরির বাজারের জন্য অধিক প্রস্তুত এবং তাদের দক্ষতা নিয়োগদাতাদের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিপরীতে, কম স্কোর পাওয়া দেশগুলোর গ্র্যাজুয়েটদের দক্ষতার ঘাটতি বেশি এবং চাকরির বাজারে তাদের ঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি।

সামগ্রিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ৯৭.৬ স্কোরে শীর্ষে রয়েছে। দ্বিতীয় স্থানে যুক্তরাজ্য ৯৭.১ এবং তৃতীয় স্থানে জার্মানি ৯৪.৬ স্কোরে আছে। তবে চাকরিদাতাদের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দক্ষতার সূচকে যুক্তরাজ্য ১০০ স্কোর নিয়ে প্রথম, যুক্তরাষ্ট্র ৯৪.৪ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় এবং কানাডা ৯০.৯ স্কোর নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে।

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের দক্ষতার ঘাটতির বিষয়টি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক তথ্যেও দেখা গেছে। শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৩ অনুযায়ী, দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়ে ৯ লাখ ৬ হাজারে পৌঁছেছে, যা ২০২২ সালে ছিল ৭ লাখ ৯৯ হাজার। অর্থাৎ, মাত্র এক বছরে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা এক লাখেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। গত এক দশকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ সময়ে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় আট গুণ বেড়েছে।

টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশে প্রতি ১০০ জন বেকারের মধ্যে ২৮ জনই উচ্চশিক্ষিত। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে উচ্চশিক্ষিত তরুণের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি টারশিয়ারি পর্যায়ের বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১২ শতাংশে পৌঁছেছে। এসব তথ্য দেশের উচ্চশিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং শ্রমবাজারের চাহিদার মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্যের দিকটি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।

ওয়ার্ল্ড ফিউচার স্কিলস ইনডেক্স ২০২৫ অনুযায়ী, বিশ্বে ৮৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বর্তমানে বা অদূর ভবিষ্যতে দক্ষতার ঘাটতির মুখে পড়বে। এ ছাড়া ৫৬ শতাংশ নিয়োগদাতা মনে করেন, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন প্রয়োজনীয় দক্ষতার ধরন বদলে দেবে। অটোমেশন ও ডিজিটালাইজেশনের কারণে বিশ্বব্যাপী ১৪ শতাংশ কর্মীকে পেশা পরিবর্তন করতে হতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সহযোগিতা জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মোট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৬৩। ৫৩টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ২২টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে গত দেড় দশকে আর এ সময়ে নতুন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫৬। এর মধ্যে ৩৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত ১:২০-এর বেশি আর পাঁচজনের কম অধ্যাপক রয়েছেন ৫১ বিশ্ববিদ্যালয়ে। এছাড়া উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে।

ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৩ অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪৮ লাখ ২১ হাজার ১৬৫। দেশে শিক্ষার্থী সংখ্যায় শীর্ষে আছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ৩৩ লাখ ৮৪ হাজার ৫৪৫। শিক্ষার্থী সংখ্যায় দ্বিতীয় অবস্থানে আছে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ৫ লাখ ৩ হাজার ৫৮০। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অধ্যয়নরতদের প্রায় ৮১ শতাংশই পড়ছেন এ দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত ও পরিবেশবিজ্ঞান সম্পর্কিত দক্ষতার চাহিদা বাড়বে। কিন্তু বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরতদের অর্ধেকের বেশিই পড়ছেন মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদভুক্ত বিভিন্ন বিষয়ে। বিশেষত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী পড়ছেন এসব বিষয়ে, যা তাদের ভবিষ্যতে চাকরি পাওয়াকে আরো চ্যালেঞ্জিং করে তুলতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, বাংলাদেশে গত এক দশকে বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। শিল্পখাতে প্রত্যাশিত হারে বিনিয়োগ ও নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি না হওয়া, দক্ষতার ঘাটতি এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তনের কারণে অনেক তরুণ উপযুক্ত কাজ পাচ্ছে না। একই সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার যথেষ্ট সমন্বয় না থাকায় শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাও বাড়ছে, যা সমস্যাটিকে আরো জটিল করে তুলেছে।

তবে সংকট মোকাবেলায় ড. সেলিম রায়হান বলেন, দেশে শিল্পায়ন বৃদ্ধি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সহায়তা, প্রযুক্তি ও আইটি খাতে বিনিয়োগ এবং দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিতে হবে। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ, স্টার্ট-আপ ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে হবে। এসব পদক্ষেপ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ধীরে ধীরে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে এবং তরুণদের বেকারত্ব কমানো সম্ভব হবে।