বদলির পরও ‘মধুর দায়িত্ব’ ফিরতে তোড়জোড় বিমানের কর্তাকর্তার
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের যানবাহন বিভাগের জুনিয়র কর্মকর্তা ও সাবেক বিমান শ্রমিক লীগের যানবাহন ইউনিটের সভাপতি মো. গোলাম আমানুল্লাহ হক প্রকাশ সবুজের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ নতুন নয়। ২০১৯ সালে এসব অভিযোগে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে বদলি হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে জ্বালানি তেলে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। পরে তাকে বরিশাল বিমানবন্দরে সরিয়ে দেওয়া হলেও দেড় বছরের মাথায় ফের ঢাকার প্রেস শাখায় যোগ দেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আবারও যানবাহন শাখায় দায়িত্ব পেলেও বর্তমানে তাকে আবার প্রেস শাখায় পাঠানো হয়েছে। তবে ১৮ দিন পেরিয়ে গেলেও নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি তিনি। পুরোনো পদ ফিরে পেতে আবারও তৎপরতা চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, যানবাহন শাখায় দায়িত্ব পালনকালে মো. গোলাম আমানুল্লাহ হক প্রকাশ সবুজের বিরুদ্ধে ডিউটি রোস্টার বাণিজ্য, ভাড়ায় চালিত গাড়ির ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন নেওয়া, উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে শৃঙ্খলাবিরোধী আচরণ ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মতো নানা অনিয়মের। এ ছাড়া আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে জাল সনদে চাকরি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিশেষ করে চট্টগ্রামে কর্মরত থাকাকালে গাড়ির জ্বালানি তেল সরবরাহে তেল নয়ছয়ের সত্যতা পেয়েছে বিমানের প্রাথমিক নিরাপত্তা শাখা ও বিভাগীয় তদন্ত কমিটি। তবে অন্যান্য সময়ের বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের আওতার বাইরে থাকায় তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আবারও তাকে ওই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। গত ৩ মে মো. গোলাম আমানুল্লাহ হককে এক অফিস আদেশে তাকে ঢাকা বিমানের যানবাহন বিভাগের জুনিয়র অফিসার (এমটি সিডিউলিং) পদ থেকে মুদ্রণ ও প্রকাশনা বিভাগে সংযুক্ত করা হয়। সরানোর ১৪ দিন অতিবাহিত হলেও এখনো কাজে যোগদান করেননি তিনি।
এর আগে ২০২৩ সালের ২০ ডিসেম্বর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এক অফিস আদেশে তাকে বরিশাল স্টেশন থেকে ঢাকা বিমানের মুদ্রণ ও প্রকাশনা বিভাগে স্টোর সুপারভাইজার হিসেবে বদলি করা হয়। এরপর ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল প্রশাসন ও মানবসম্পদ পরিদপ্তরের আরেক অফিস আদেশে তাকে মুদ্রণ ও প্রকাশনা বিভাগ থেকে আবার যানবাহন বিভাগের জুনিয়র অফিসার (এমটি সিডিউলিং) পদে পদায়ন করা হয়।
বিমান সূত্র জানায়, মো. গোলাম আমানুল্লাহ হক ২০০০ সালের ২৩ জুলাই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের যানবাহন উপবিভাগে যোগদান করেন। পরে তিনি ঢাকা বিমানের এমটি শাখায় দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে নানা অনিয়ম ও শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠার পর ২০১৯ সালে তাকে চট্টগ্রাম স্টেশনে বদলি করা হয়। চট্টগ্রামে তিনি প্রায় ৪০ মাস যানবাহন বিভাগের সিডিউলিং সুপারভাইজার (ইনচার্জ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এর আগে ২০১৯ সালের ১২ জুন মো. গোলাম আমানুল্লাহ হককে ঢাকা মোটর ট্রান্সপোর্ট উপবিভাগের সুপারভাইজার (সিডিউলিং অ্যান্ড মাইলেজ রেকর্ড) পদ থেকে চট্টগ্রাম স্টেশনে বদলি করা হয়। দায়িত্ব পালন করেন প্রায় ৪০ মাস।
তবে চট্টগ্রাম স্টেশনে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে জ্বালানি তেল অনিয়মের তদন্ত হয়। বিমানের প্রাথমিক নিরাপত্তা শাখা ও বিভাগীয় তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তদন্তে বলা হয়, ২০২২ সালের জুন থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১৮ মাসে তিনি তুলনামূলক অতিরিক্ত ১০ হাজার ২৪৯ লিটার জ্বালানি তেল ব্যবহার দেখান, যার বাজারমূল্য প্রায় ১২ লাখ ৬৫ হাজার ১৩৬ টাকা।
সূত্র বলছে, চট্টগ্রাম স্টেমনের সবুজের চাকরিকাল ছিল প্রায় ৪০ মাস, কিন্তু তদন্ত করা হয়েছে মাত্র ১৮ মাসের। বাকি ২২ মাসের জ্বালানি ব্যবহারের হিসাব তদন্তের আওতায় না আনা উদ্দেশ্যমূলক বলছেন সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা।
এদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে মুজিব কোট পরে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায় সবুজের। তিনি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কর্মস্থলে প্রভাব বিস্তার, উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ ও শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডেও জড়িত থাকার ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, যানবাহন বিভাগে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ডিউটি রোস্টার বাণিজ্য ও সুবিধা না পেলে অপারেটরদের খারাপ ডিউটি দেওয়া হতো। একই সঙ্গে আবার তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন অপারেটর কোনো কাজ না করেও নিয়মিত ওভারটাইম সুবিধা পেতেন। এছাড়া ভাড়ায় চালিত গাড়ির ঠিকাদারদের কাছ থেকেও কমিশন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, যানবাহন বিভাগের বনভোজন ও ইফতার আয়োজনের নামে কর্মচারীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হলেও তার কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি। জানুয়ারি মাসে বিভাগীয় বনভোজনের জন্য কর্মচারীদের কাছ থেকে প্রায় ১৫ লাখ টাকা তোলা হয়। পরে হিসাব চাইলে কাগজপত্র হারিয়ে গেছে বলে জানানো হয়। একইভাবে প্রতি রমজানে ইফতার বাবদ প্রত্যেক কর্মচারীর কাছ থেকে দুই হাজার টাকা করে নেওয়া হলেও এরও কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি।
গত ৭ মে জারি করা এক কারণ দর্শানো নোটিশের জবাবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের প্রধান কার্যালয় বলাকা ভবনের এমটি অপারেটর (জি-৫৩৫০৫) মো. জাহিদুল ইসলাম কর্তৃপক্ষকে জানান, মো. গোলাম আমানুল্লাহ হক জাল সনদ ও আর্থিক সুবিধার মাধ্যমে তাকে চাকরি দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে জ্বালানি তেল অনিয়মের বিভাগীয় মামলার অভিযুক্ত মাসুদকে হজ ক্যাম্পে ডিউটির সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে সবুজের বিরুদ্ধে।
জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পরও বিমান কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। বরং রাজনৈতিক পরিচয় বদলে তিনি নতুন করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। এছাড়া, সবুজের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত চলাকালে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করেন। বগুড়ার এক প্রভাবশালী কর্মকর্তার মাধ্যমে তদন্তকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মো. গোলাম আমানুল্লাহ হক বলেন, বর্তমানে তিনি হজ ক্যাম্পের দায়িত্বে রয়েছেন। এ দায়িত্ব শেষ না হওয়া পর্যন্ত ম্যানেজমেন্ট তাকে রিলিজ দেবে না। তবে ডিউটি শেষ হওয়ার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে জানান তিনি। কর্মস্থল পরিবর্তনের জন্য কোনো আবেদন করেছেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখনো কোনো আবেদন করেননি। ম্যানেজমেন্ট যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটিই মেনে নেবেন।
চট্টগ্রামে কর্মরত অবস্থায় তেল অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ম্যানেজমেন্ট তদন্ত করেছে ও তদন্তে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। তবে তার দাবি, তিনি এ ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন না। এ ছাড়া সনদ ছাড়াই এক ব্যক্তিকে চাকরি দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এই বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। তাকে কেউ অভিযোগও করেনি।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ বিভাগ) বোসরা ইসলাম বলেন, একাধিক তার মুঠোফোনে কল করা হলে সংযোগ মেলেনি।