২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:১৮

এক বছরে ৪০৩ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা, বেশি হতাশা ও অভিমানে

আঁচল ফাউন্ডেশন  © ফাইল ছবি

২০২৫ সালে দেশে ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। তাদের মধ্যে বড় অংশই হতাশা ও অভিমান থেকে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশন এ তথ্য প্রকাশ করেছে। অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে ‘শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা: ক্রমবর্ধমান সংকট’ শীর্ষক প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশ করা হয়।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে ১৬৫টি স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদসমূহ পর্যালোচনা করে প্রতি বছরের ন্যায় ২০২৫ সালের আত্মহত্যার চিত্র বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে সারাদেশে মোট ৪০৩ জন স্কুল, কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয় এবং মাদ্রাসার শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। 

সংগঠনটি বলছে, এ সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং অনেকটাই পারিবারিক কাঠামো, সামাজিক সম্পর্ক এবং মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতারও প্রতিফলন। আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে ১০১ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, ২০২২ সালে ৫৩২ জন শিক্ষার্থী, ২০২৩ সালে ৫১৩ জন শিক্ষার্থী ও ২০২৪ সালে ৩১০ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে।

শিক্ষাব্যবস্থার ধারা বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৪০৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে সর্বাধিক আত্মহত্যা সংঘটিত হয়েছে স্কুল পর্যায়ে ১৯০ জন, যা মোট ঘটনার ৪৭.৪০ শতাংশ। এ চিত্র বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ স্কুলগামী শিক্ষার্থীরা সাধারণত কৈশোরের সূচনালগ্নে থাকে, যখন মানসিক ও আবেগীয় বিকাশ অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে অবস্থান করে। 

কলেজ পর্যায়ে ৯২ জন বা ২২.৮ শতাংশ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭৭ জন বা ১৯.১০ শতাংশ এবং মাদ্রাসায় ৪৪ জন বা ১০.৭২ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। লিঙ্গভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায় সর্বমোট ৪০৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৪৯ জন বা ৬১.৮ শতাংশ নারী শিক্ষার্থী এবং ১৫৪ জন বা ৩৮.২ শতাংশ পুরুষ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গভীর পর্যালোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে নারী শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার হার পুরুষের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। স্কুলে ১৩৯ জন নারী ও ৫১ জন পুরুষ; কলেজে ৫০ জন নারী ও ৪২ জন পুরুষ আত্মহত্যা করেছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পুরুষ শিক্ষার্থীর সংখ্যা সামান্য বেশি; যেখানে ৪১ জন পুরুষের বিপরীতে ৩৬ জন নারী শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। মাদ্রাসায় ২৪ জন নারী ও ২০ জন পুরুষ আত্মহত্যা করেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলেন, এ পার্থক্য ইঙ্গিত করে যে কৈশোরে মেয়েরা সামাজিক ও পারিবারিক চাপ, সম্পর্কগত টানাপোড়েন এবং আবেগীয় সংকটে বেশি ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে, যেখানে উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে পুরুষ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থান ও আত্মপরিচয় সংকট বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

কারণভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়,  হতাশা ২৭.৭৯ শতাংশ এবং অভিমানে ২৩.৩২ শতাংশ সবচেয়ে বড় দুটি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। হতাশার ক্ষেত্রে নারী ৬২ বা ৫৫.৩৫ শতাংশ ও পুরুষ ৫০ জন বা ৪৪.৬৫ শতাংশ, অভিমানে নারী ৫৮ জন বা ৬১.৭০ শতাংশ ও পুরুষ ৩৬ জন বা ৩৮.২৯  শতাংশ। 

আরও পড়ুন: এবার নাতনিকে তুলে নিয়ে ‘ধর্ষণ’ করে হত্যা, উঠানে দাদির মরদেহ

অ্যাকাডেমিক চাপে ৭২ জন আত্মহত্যা করেছে, যার অধিকাংশই স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থী যেখানে নারী শিক্ষার্থীদের সংখ্যাই সর্বাধিক, যা শতাংশের হিসেবে ৭০.৮৩ শতাংশ। প্রেমঘটিত কারণে ৫৩ জন বা ১৩.১৫ শতাংশ, পারিবারিক টানাপোড়েনে ৩২ জন বা ৭.৯৪ শতাংশ, মানসিক অস্থিতিশীলতায় ২৫ জন বা ৬.২০ শতাংশ  এবং যৌন নির্যাতনের কারণে ১৪ জন বা ৩.৪৭ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। 

সাইবার বুলিংয়ের কারণেও একজন নারী শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে, যা ডিজিটাল নিরাপত্তা ও অনলাইন সহিংসতার নতুন মাত্রা তুলে ধরে। 

সংগঠনটি বলছে, এই পরিসংখ্যান আমরা শিক্ষার্থীদের মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছি কিনা সে ব্যাপারে আমাদের সামনে একটি বাস্তবতা তুলে ধরে। পরিবারে খোলামেলা যোগাযোগের অভাব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পেশাদার কাউন্সেলিং ব্যবস্থার ঘাটতি, সামাজিক হেনস্থা বা অপমানবোধ এবং মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে অজ্ঞতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। 

আরও বলা হয়েছে, সচেতনতামূলক বক্তব্যই নয় বরং কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি। শিক্ষার্থীদের জীবন রক্ষা করা আমাদের নৈতিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। ২০২৫ সালের এই পরিসংখ্যান শুধুমাত্র প্রতিবেদন নয় বরং এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্কবার্তা। এখনই সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ না করলে আগামী বছরগুলোতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।