০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২১:০৬

দেশে একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন এখন সময়ের দাবি

এম এ মতিন  © টিডিসি সম্পাদিত

শিক্ষা যেকোনো জাতিগঠনের মৌলিক ভিত্তি এবং সামাজিক-অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রধান চালিকাশক্তি। স্বাধীন বাংলাদেশে বিগত পাঁচ দশকে শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার ঘটলেও, একটি সুনির্দিষ্ট, সুদূরপ্রসারী এবং কাঠামোগত রূপরেখার অভাবে দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা আজ গভীর সংকটে নিমজ্জিত। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সাথে সাথে শিক্ষানীতি ও পাঠ্যক্রমের খামখেয়ালিপূর্ণ বদল, গুণগত মানের চরম বিপর্যয় এবং অপরিকল্পিতভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের হিড়িক দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে দীর্ঘমেয়াদী এবং টেকসই শিক্ষা সংস্কারের জন্য বাংলাদেশে একটি স্বাধীন, স্বায়ত্তশাসিত এবং স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন করা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

এই উপমহাদেশে শিক্ষা কমিশন গঠনের ক্রমানুভিত্তিক ইতিহাস

ভারতীয় উপমহাদেশে আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিকাশ এবং এর সংস্কারের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ঔপনিবেশিক আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমল এবং স্বাধীন বাংলাদেশ পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে বহুবার অস্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়েছে।

  • লর্ড মেকলের মিনিটস (১৮৩৫): উপমহাদেশে ইংরেজি শিক্ষার ভিত্তি স্থাপন এবং ঔপনিবেশিক কেরানি তৈরির উদ্দেশ্যে এই শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়।
  • উডের ডেসপ্যাচ (১৮৫৪): একে বলা হয় ভারতের শিক্ষার 'ম্যাগনা কার্টা'। এর মাধ্যমে প্রথম সুশৃঙ্খল শিক্ষা কাঠামোর প্রস্তাব করা হয়।
  • হান্টার কমিশন (১৮৮২): এটি ছিল প্রথম আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কমিশন, যা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ওপর জোর দেয়।
  • স্যাডলার কমিশন (১৯১৭-১৯১৯): কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন নামে পরিচিত এই কমিশনটি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করে।
  • সার্জেন্ট পরিকল্পনা (১৯৪৪): ব্রিটিশ আমলের শেষভাগে ৪০ বছরের একটি দীর্ঘমেয়াদী সর্বজনীন শিক্ষার রূপরেখা দেওয়া হয়েছিল এতে।
  • আতাউর রহমান খান কমিশন (১৯৫৭): পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার সমস্যা সমাধানে গঠিত হলেও রাজনৈতিক অস্থিরতায় এটি বাস্তবায়িত হয়নি।
  • শরীফ কমিশন (১৯৫৯): আইয়ুব খানের সামরিক শাসনামলে গঠিত এই কমিশনটি শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ এবং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির পরিপন্থী সুপারিশ করায় তীব্র ছাত্র আন্দোলনের মুখে পড়ে।
  • হামুদুর রহমান কমিশন (১৯৬৬): ছাত্র অসন্তোষ দূর এবং উচ্চশিক্ষার সংস্কারের জন্য এটি গঠিত হয়।
  • কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন (১৯৭২-১৯৭৪): স্বাধীনতার পর প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ড. কুদরাত-এ-খুদার নেতৃত্বে গঠিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা কমিশন। ১৯৭৪ সালে পেশ করা এই কমিশনের প্রতিবেদনটি ছিল অত্যন্ত বিজ্ঞানমনস্ক, ধর্মনিরপেক্ষ ও কর্মমুখী। কিন্তু ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে এই ঐতিহাসিক রূপরেখাটি আর বাস্তবায়িত হতে পারেনি।

পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন কমিশনসমূহ: ১৯৭৮ সালে কাজী জাফর আহমেদ কমিশন, ১৯৮০ সালে ড. আব্দুল মজিদ কমিশন, ১৯৮৭ সালে  ড. মফিজ উদ্দিন আহম্মদ কমিশন,  ১৯৯৭ সালে শামসুল হক শিক্ষা কমিশন। ২০০২ সালে ড. আব্দুল বারী কমিশন, ২০০৩ সালে  ড. মনিরুজ্জামান কমিশন, ২০০৯ সালে ড. কবীর চৌধুরী কমিশন গঠিত হয়েছিল।  এ ছাড়া ২০১০ সালে  জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও সর্বশেষ ২০২১ সালে জাতীয় শিক্ষাক্রম প্রণয়ন ও চালু করা হয়। যা নিয়ে গোটা দেশে চরম বিতর্ক ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। অবশেষে অন্তর্বতী সরকার এই শিক্ষাক্রম স্থগিত ঘোষণা করে ইতিপূর্বেকার ২০১২ সালের সৃজনশীল শিক্ষাক্রম পুনরায় চালু করে। এর মধ্যে নবম শ্রেণি থেকে বিষয় বিভাজন (মানবিক, বাণিজ্য ও বিজ্ঞান) ও সামষ্ঠিক পরীক্ষায় আগের মত বেশি নম্বর বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে  জুলাই ২০২৪ এর ছাত্র আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে কমিশন গঠন করেন। কিন্তু শিক্ষা বিষয়ে কোন কমিটি বা কমিশন গঠন করেনি। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রতিটি কমিশনই ছিল অস্থায়ী বা অ্যাড-হক ভিত্তিক। একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন না থাকায় কোনো কমিশনের সুপারিশই দীর্ঘমেয়াদে এবং ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি।

 বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার ক্রমাবনতির প্রেক্ষাপটে স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তা

বর্তমানে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এক গভীর কাঠামোগত ও গুণগত সংকটের মুখোমুখি। পাসের হারের কৃত্রিম উল্লম্ফন ঘটানো হলেও শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিখন যোগ্যতা ও মেধার বিকাশ ঘটছে না। খামখেয়ালিপূর্ণ পাঠ্যক্রম প্রণয়ন, পর্যাপ্ত শিক্ষক প্রশিক্ষণের অভাব এবং মূল্যায়নের ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতির কারণে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই ধস নেমেছে। শিক্ষার মানের ক্রমাবনতির বিষয়টি বি এন পি আমলের অতিসাম্প্রতিক প্রকাশিত এস এস সি ও এইচ এস সি পরীক্ষার ফলাফল দেখে কিছুটা হলেও অনুমান করা যায়। শিক্ষার উন্নয়ন অংশীদার বিশ্বব্যাংক এবং ইউনিসেফ -এর বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকেও প্রাথমিকশিক্ষার মানের অধোগতি লক্ষ্য করা যায়। তাদের প্রতিবেদনে উলেখ করা হয়েছে যে, আমাদের পঞ্চম শ্রেণি পাশ ছাত্রছাত্রীর ইংরেজি, বিজ্ঞান ও গণিতের জ্ঞান ভারত এবং শ্রীলংকার দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রছাত্রীদের সমান। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে ১৮০ এর কাছাকাছি হলেও বৈশ্বিক র‍্যাংকিং এ আস অব্দি ৫০০ এর মধ্যে আস্তে পারেনি বাংলাদেশের কোন একটি বিশ্ববিদ্যালয়। অথচ একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েই চলছে।

  • নীতিমালার ধারাবাহিকতা ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা: প্রথাগত বা অ্যাড-হক ভিত্তিক অস্থায়ী কমিশনগুলোর প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সাথে সাথে তাদের প্রণীত শিক্ষানীতি বাতিল বা আমূল পরিবর্তিত হয়ে যায়। ফলে শিক্ষাব্যবস্থায় কোনো দীর্ঘমেয়াদী সুফল পাওয়া যায় না। এর বিপরীতে, একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে এমন একটি সুদূরপ্রসারী ও ধারাবাহিক শিক্ষানীতি বজায় রাখতে সক্ষম হবে, যা যেকোনো সরকারের আমলেই অপরিবর্তিত থাকবে।
  • নিরবচ্ছিন্ন তদারকি ও মূল্যায়ন: অস্থায়ী কমিশনগুলোর দায়িত্ব কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন বা সুপারিশ জমা দেওয়ার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে; সুপারিশগুলো কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে তা দেখার কোনো আইনগত সুযোগ তাদের থাকে না। অন্যদিকে, একটি স্থায়ী কমিশন শিক্ষাব্যবস্থার নিয়মিত মনিটরিং (তদারকি), সার্বিক মূল্যায়ন এবং সময়ের প্রয়োজনে কারিকুলামের যুগোপযোগী পরিমার্জন ও পরিবর্ধন করার ক্ষমতা রাখবে।
  • গবেষণা ও উদ্ভাবনের সুযোগ: সাময়িক কমিশনগুলোর হাতে সময় এবং প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সীমিত থাকায় গভীর ও বাস্তবসম্মত গবেষণার সুযোগ থাকে না। কিন্তু একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এই কমিশন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদার আলোকে নিরবচ্ছিন্ন গবেষণা (Action Research) চালাতে পারবে, যা শিক্ষায় নতুন নতুন উদ্ভাবন যোগ করতে সাহায্য করবে।
  • রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত: অস্থায়ী কমিটি বা কমিশনগুলো অনেক সময়ই তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক আদর্শ বা আমলাতান্ত্রিক চাপ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। এর বিপরীতে, সংবিধিবদ্ধ ও স্থায়ী শিক্ষা কমিশন সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসিতভাবে কাজ করবে। ফলে যেকোনো দলীয় বা আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত থেকে দেশের জন্য সর্বোচ্চ কল্যাণকর শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা সম্ভব হবে।

 স্থায়ী শিক্ষা কমিশনের অনুপস্থিতির বর্তমান কুফল

একটি স্থায়ী ও অভিভাবকতুল্য প্রতিষ্ঠানের অনুপস্থিতির কারণে দেশের শিক্ষানীতি নিয়ে একরকম নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করছে বলে অনেকে মনে করেন। উদাহরণ হিসেবে অনেকে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমন্বয় হীন ও পরস্পর বিরোধী বক্তব্যের উদাহরণ দিয়ে থাকেন। যদিও ওই সকল বক্তব্য শিক্ষার উন্নয়ন ও সংস্কারের লক্ষ্যে প্রদত্ত।

ক) বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের বক্তব্যের কিছু উদাহরণ নিন্মে প্রদত্ত হলোঃ

একটি সুনির্দিষ্ট ও স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা না থাকায় বিভিন্ন সরকারের আমলে নীতিনির্ধারক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ যে যার মতো শিক্ষানীতি ব্যাখ্যা ও পরিবর্তনের কথা বলে আসছেন। যেমন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর শীর্ষ নেতৃত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারকদের সাম্প্রতিক বক্তব্যসমূহ পর্যালোচনা করলে শিক্ষার আমূল সংস্কার ও পৃথক পৃথক কমিশন গঠনের পরিকল্পনার কথা জানা যায়:

বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০২৫ থেকে ২০২৬ সালের বিভিন্ন সময়ে শিক্ষক সমাবেশ এবং রাষ্ট্রীয় ও নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন। তাঁর প্রধান বক্তব্যগুলোর ধারাবাহিক রূপরেখা নিচে দেওয়া হলো:

  • ৭ ও ১৮ অক্টোবর, ২০২৫ (শিক্ষক মহাসমাবেশে কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি): রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক বিশাল শিক্ষক সমাবেশে লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তারেক রহমান ঘোষণা করেন যে, বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং একটি আধুনিক কারিকুলাম প্রণয়নের জন্য একটি বিশেষ 'শিক্ষা সংস্কার কমিশন' গঠন করবে। শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, শিক্ষকদের চাকরি স্থায়ী করা এবং রাষ্ট্রের সামর্থ্যের আলোকে পর্যায়ক্রমে চাকরি জাতীয়করণের বিষয়টি বিবেচনা করতে একটি 'উচ্চ পর্যায়ের কমিশন' গঠন করা হবে। এই বক্তব্যটির আনুষ্ঠানিক বিবরণ The Business Standard (বাংলা) এবং বিএনপির প্রাতিষ্ঠানিক ওয়েবসাইট-এ বিস্তারিত প্রকাশিত হয়েছে।
  • ২৫ অক্টোবর, ২০২৫ (বাজেট বরাদ্দ ও বিশেষজ্ঞ দল গঠন): তারেক রহমান আরও ঘোষণা করেন যে, আধুনিক ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে তাঁর দল ক্ষমতায় গেলে জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেবে। তিনি এও উল্লেখ করেন যে, বিএনপির '৩১ দফা' রাষ্ট্র সংস্কার রূপরেখার আলোকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করতে বিশেষজ্ঞদের একটি বিশেষ দল ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছে। (সূত্র: RTV Online)।
  • ৮ এপ্রিল ও জুন, ২০২৬ (সংসদীয় ঘোষণা ও বাজেট রূপরেখা): দেশের সরকারপ্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতীয় সংসদে শিক্ষাবিপ্লবের ডাক দিয়ে তারেক রহমান শিক্ষা খাতে বাজেট বরাদ্দ পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার ঘোষণা দেন। এ সময় শিক্ষার্থীদের জন্য একক ডিজিটাল পরিচয়পত্র বা "Edu-ID" চালু এবং কারিগরি শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি বাধ্যতামূলক করার বৈপ্লবিক পদক্ষেপ ঘোষণা করা হয়। (সূত্র: Dhaka Tribune) ।

 প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শিক্ষা সংস্কারে ১৫ দফা অনুশাসন

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে গুণগত মানোন্নয়ন, ঝরে পড়া রোধ এবং শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১৫ দফা বিশেষ অনুশাসন ও নির্দেশনা প্রদান করেছেন, যা বাস্তবায়নে শিক্ষা প্রশাসন বর্তমানে মাঠপর্যায়ে কাজ করছে। ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জারি করা 'রেকর্ড অব নোটস'-এর ভিত্তিতে এই ১৫ দফা নিচে উল্লেখ করা হলো:

  1. সহ-শিক্ষা কার্যক্রমের বিস্তার: শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী ও পড়াশোনায় আগ্রহী করতে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা, চিত্রাঙ্কন ও গণিত অলিম্পিয়াডসহ বিভিন্ন সহ-শিক্ষা কার্যক্রম জোরদার করা।
  2. রাজনীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গন: শিক্ষাঙ্গনে সম্পূর্ণ রাজনীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট আচরণবিধি (Code of Conduct) সংশোধন ও প্রণয়ন করা এবং শিক্ষকদের অন্যায্য অরাজনৈতিক কাজে যুক্ত রাখা থেকে বিরত রাখা।
  3. অভিন্ন লেসন প্ল্যান ও রুটিন: নিয়মিত ও মানসম্মত শ্রেণিকক্ষ পাঠদান নিশ্চিত করতে দেশব্যাপী সময়াবদ্ধ অভিন্ন লেসন প্ল্যান ও ক্লাস রুটিন বাস্তবায়ন করা।
  4. জাতীয় শিক্ষা টিভি চ্যানেল: দেশের যেকোনো প্রান্তের শিক্ষার্থীরা যেন সেরা শিক্ষকদের ক্লাস সহজে দেখতে পারে, সেজন্য একটি ডেডিকেটেড ‘ন্যাশনাল এডুকেশন টিভি চ্যানেল’ চালুর সম্ভাব্যতা যাচাই করা।
  5. অনলাইন মনিটরিং ব্যবস্থা: আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান প্রক্রিয়াকে সরাসরি বা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় এনে অনলাইন মনিটরিং ব্যবস্থার উন্নয়ন করা।
  6. শিক্ষকদের সমন্বিত প্রশিক্ষণ: শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে মানসম্মত ও কার্যকর প্রশিক্ষণের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি ও ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা।
  7. স্থাপনার বহুমুখী ব্যবহার: শিক্ষকদের জন্য স্থায়ী ডেডিকেটেড ট্রেনিং ইনস্টিটিউট গড়ে তোলার পূর্ব পর্যন্ত বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা অব্যবহৃত ভবনগুলোকে শিক্ষক প্রশিক্ষণে ব্যবহারের সুযোগ খতিয়ে দেখা।
  8. শূন্যপদ দ্রুত পূরণ: গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞান শিক্ষকের তীব্র ঘাটতি দূর করতে দ্রুত শূন্যপদগুলো পূরণ করা এবং তাদের বিশেষায়িত বিষয়ভিত্তিক উন্নত ট্রেইনিং দেওয়া।
  9. শিক্ষকদের কাজের স্বীকৃতি ও পুরস্কার: শিক্ষকদের মধ্যে শিক্ষাদান ও নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ভালো পারফরম্যান্সের স্বীকৃতিস্বরূপ মেডেল ও রাষ্ট্রীয় পুরস্কার প্রবর্তন করা।
  10. শ্রমবাজারের সাথে সংগতিপূর্ণ কারিগরি শিক্ষা: আধুনিক গ্লোবাল লেবার মার্কেট বা শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের কারিগরি, প্রযুক্তিভিত্তিক ও কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ ব্যাপক হারে বাড়ানো।
  11. কেন্দ্রীয় গবেষণা ডাটাবেজ: শিক্ষা সংক্রান্ত ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং স্থানীয় চাহিদা নিরূপণের জন্য একটি কেন্দ্রীয় এডুকেশন রিসার্চ ডাটাবেজ গড়ে তোলা。
  12. ঝরে পড়া রোধে সমন্বিত পদক্ষেপ: উপভোগ্য শিক্ষার পরিবেশ সৃষ্টি, বাল্যবিয়ে রোধ এবং স্মার্টফোন আসক্তি দূর করার মাধ্যমে মাধ্যমিক স্তরের ড্রপ-আউট বা ঝরে পড়া কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া।
  13. শিক্ষকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ: প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের নিয়মিত উপস্থিতি এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি তাদের জবাবদিহিতা কঠোরভাবে নিশ্চিত করা।
  14. অবকাঠামোগত সমতা: গ্রামীণ ও শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামোগত বৈষম্য দূরীকরণ এবং মাদরাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন।
  15. ডিজিটাল লিটারেসি ও সাইবার সেফটি: স্কুল লেভেলে বাধ্যতামূলক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) পরিচিতি, সাইবার নিরাপত্তা এবং শিক্ষকদের জন্য বিশেষায়িত আইসিটি ডিভাইস প্রদান নিশ্চিত করা।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (মহাসচিব, বিএনপি বর্তমানে মহামান্য রাস্ট্রপতি): তিনি বিএনপির '৩১ দফা' রাষ্ট্র সংস্কার কর্মসূচির আলোকে নৈতিকতা ও আধুনিকতার সমন্বয়ে একটি যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন।

  • সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স (যুগ্ম মহাসচিব, বিএনপি): তিনিও ময়মনসিংহে এক সভায় উল্লেখ করেছেন যে, ক্ষমতায় গেলে একটি শক্তিশালী শিক্ষা কমিশন গঠন করা তাদের দলের অন্যতম অগ্রাধিকার।

 শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন এর বক্তব্য ও অবস্থান

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে শিক্ষা কমিশন গঠনের সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি থাকা সত্ত্বেও বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন শিক্ষা কমিশন গঠনে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

  • কমিশন গঠনে অস্বীকৃতি: সম্প্রতি ঢাকার নায়েমে এক প্রশিক্ষণ কোর্সের সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, "শিক্ষা কমিশন গঠন করার কথা ছিল, কিন্তু আমি তা করিনি। আমি এটা করতে চাই না"।

২০২৬ সালের নভেম্বরের শুরুতে ঢাকার নায়েমে (NAEM) এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় শিক্ষা কমিশন না করার পক্ষে তিনি মূলত এই যুক্তিগুলো তুলে ধরেন:

  • কমিশন গঠনে অনাগ্রহ: মন্ত্রী সরাসরি বলেন, "শিক্ষা কমিশন করার কথা ছিল, কিন্তু আমি তা করিনি। আমি করতে চাচ্ছি না"।
  • জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা: তিনি মনে করেন, বর্তমানে যাদের দিয়ে শিক্ষা কমিশন গঠন করা হবে, তারা আজকের প্রেক্ষাপটে হয়তো জ্ঞানী। তবে তাদের এই জ্ঞান মূলত অতীতের ওপর নির্ভরশীল।
  • দ্রুত পরিবর্তনশীল শিক্ষা ব্যবস্থা: বর্তমানের শিক্ষা ব্যবস্থা যেভাবে রূপান্তরিত (Transform) হচ্ছে, তাতে ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাচ্ছে তা আগে থেকে নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তাই অতীত-নির্ভর কোনো কমিশন দিয়ে এই পরিবর্তন সামাল দেওয়া সম্ভব নয়।
  • প্রযুক্তির ওপর জোর: প্রথাগত শিক্ষা কমিশনের চেয়ে তিনি বর্তমান শিক্ষকদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তোলার ওপর বেশি গুরুত্বারোপ করেছেন।

ফলাফল নিয়ে মূল্যায়ন: এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক না হওয়ার কথা স্বীকার করে তিনি জানান, শিক্ষা খাতের চলমান ত্রুটিগুলো কাটিয়ে উঠে ভবিষ্যতে ফলাফল আরও উন্নত করতে মন্ত্রণালয় সরাসরি কাজ করে যাচ্ছে।

  • প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এর বক্তব্য

শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ শিক্ষাকে কেবল একটি খরচের খাত হিসেবে না দেখে একে জাতি গঠনের 'প্রধান প্রকল্প' এবং মানবসম্পদ তৈরির মূল কারখানা হিসেবে গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন।

  • পাঠ্যক্রমে নতুন বিষয়: ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য 'ক্রীড়া' ও 'সংস্কৃতি' নামে দুটি নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। প্রাথমিক স্তরে বইয়ের পাশাপাশি আনন্দঘন শিক্ষার জন্য 'লার্নিং টয়' ও খেলাধুলার মাধ্যমে পাঠদান পদ্ধতি চালুর কথাও তিনি উল্লেখ করেন। [সমন্বিত শিক্ষাক্রম: বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের পাঠ্যক্রমের মধ্যে সমতা আনা এবং আধুনিক লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (LMS) ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।

২০২৬ সালের ২২ আগস্ট ববি হাজ্জাজ মোহাম্মদপুরের বসিলায় অবস্থিত ফিরোজা বাশার আইডিয়েল কলেজের এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেছেন মোহাম্মদপুরের বসিলা এলাকায় একটি নূতন প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।

  • প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন এর বক্তব্য

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থান এবং বাস্তবমুখী গবেষণার মেলবন্ধন ঘটানোর ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়েছেন।

  • ত্রিপক্ষীয় সমন্বয়: 'বাংলাদেশ এআই বিজনেস সামিট ২০২৬'-এ তিনি বলেন, "শিক্ষাদান ও গবেষণার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বাস্তব সমস্যার কার্যকর সমাধান"। এজন্য তিনি ইন্ডাস্ট্রি (শিল্প খাত), একাডেমিয়া (শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান) ও সরকারের মধ্যে একটি শক্তিশালী ত্রিপক্ষীয় সমন্বয়ের ডাক দেন।

 

 অন্যান্য অংশীজন ও সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি

 জহির উদ্দিন স্বপন (প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও তথ্যমন্ত্রী)

জহির উদ্দিন স্বপন শিক্ষাকে শুধুমাত্র ডিগ্রি অর্জন বা অবকাঠামোগত উন্নয়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মুক্ত চিন্তা, মানবিক মূল্যবোধ ও শারীরিক-মানসিক বিকাশের সমন্বিত মাধ্যম হিসেবে রূপান্তরের ওপর জোর দিয়েছেন। বিভিন্ন ছাত্র সংবর্ধনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলোর মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে -

মুক্ত চিন্তা ও নৈতিকতার শিক্ষা: তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, "প্রকৃত শিক্ষা হলো মুক্ত চিন্তার শিক্ষা"। সুনাগরিক গড়ে তুলতে হলে প্রচলিত পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক পড়ালেখার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাধ্যতামূলকভাবে মানবিক মূল্যবোধ ও শক্তিশালী নৈতিকতার ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে।

  • সহশিক্ষা ও শারীরিক বিকাশ: শুধু জিপিএ-৫ বা ভালো ফলের পেছনে না ছুটে শিক্ষার্থীদের সুস্থ সংস্কৃতি ও খেলাধুলায় সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান। তিনি মনে করেন, সৃজনশীল কাজ ও খেলাধুলা শিশুদের মানসিক বিকাশ ঘটায় এবং তাদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব দেওয়ার গুণাবলি জাগ্রত করে।
  • যৌথ সামাজিক দায়িত্ব: শিশু ও তরুণদের সঠিকভাবে গড়ে তোলার দায়িত্ব কেবল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং পরিবার, সমাজ ও স্থানীয় প্রশাসনকে যৌথভাবে এই সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরিতে কাজ করতে হবে।

 সালাহউদ্দিন আহমেদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এবং ড. আব্দুল মঈন খান, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিষয়ক মন্ত্রী প্রদত্ত বক্তব্যের সার সংক্ষেপ নিন্মরূপঃ  

  • জিডিপির ৫% বরাদ্দ: তারা দলীয় রূপরেখার আলোকে বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বর্তমানের চেয়ে বহুগুণ বাড়িয়ে জিডিপির (GDP) ন্যূনতম ৫ শতাংশে উন্নীত করা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন ছাড়া বিশ্বমানের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা অসম্ভব।
  • দক্ষতাভিত্তিক কারিকুলাম: বর্তমান প্রচলিত মুখস্থনির্ভর শিক্ষাক্রমকে বাতিল করে তারা এমন একটি শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠনের কথা বলছেন, যা শুধু কাগুজে ডিগ্রি দেওয়ার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের 'দক্ষতাভিত্তিক সাক্ষরতা' ও বাস্তব কর্মজীবনে প্রয়োজনীয় কারিগরি জ্ঞান প্রদান করবে।

 সাধারণ রাজনৈতিক ঐকমত্য

শিক্ষার বাইরে বিভিন্ন খাতের রাজনীতিবিদরা একটি বিষয়ে একমত পোষণ করছেন যে, দেশের 'ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড' বা তরুণ জনমিতির সুবিধা পেতে হলে রাজনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থাকে বৈশ্বিক চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী করে সাজাতে হবে। এ জন্য মেধা পাচার (Brain Drain) রোধ এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্যেই রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সংস্কার এজেন্ডার কেন্দ্রে শিক্ষাকে স্থান দিচ্ছে। শিক্ষাবিদ ও নীতিনির্ধারকদের একাংশের মতে, ক্ষমতা পরিবর্তনের সাথে সাথে শিক্ষাব্যবস্থা বারবার ওলটপালট হওয়া রোধ করতে একটি স্থায়ী ও স্বাধীন 'শিক্ষা কমিশন' গঠন করা অত্যন্ত জরুরি। যেখানে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হবে, যা শুধু সরকার পরিবর্তনের কারণে বাতিল বা আমূল পরিবর্তিত হবে না।

 অপরিকল্পিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের হিড়িক

স্থায়ী কমিশনের অনুপস্থিতির সবচেয়ে বড় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে। দেশে বর্তমানে অনুমোদিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১১৬ ছাড়িয়ে গেছে এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাও অর্ধশত পার করেছে। কোনো ধরনের সমীক্ষা ও আঞ্চলিক চাহিদা বিবেচনা না করেই রাজনৈতিক বিবেচনা ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও বিদ্যালয় স্থাপনের হিড়িক চলছে। অনেক প্রতিষ্ঠানেই ন্যূনতম অবকাঠামো, যোগ্য শিক্ষক এবং স্থায়ী ক্যাম্পাস নেই।

 দেশ ও জাতির ক্ষতি (অর্থনৈতিক ও শিক্ষার বিপর্যয়)

এই অপরিকল্পিত শিক্ষাব্যবস্থার কারণে দেশ ও জাতি এক অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে:

  • শিক্ষার গুণগত মানের বিপর্যয়: বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা প্রদানে ব্যর্থ হচ্ছে। কেবল সার্টিফিকেটধারী ডিগ্রিধারী তৈরি হচ্ছে, কিন্তু তারা প্রকৃত জ্ঞান বা আধুনিক কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা (যেমন: আইসিটি, বৈশ্বিক যোগাযোগ) অর্জন করতে পারছে না।
  • অর্থনৈতিক অপচয়: মানহীন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ খরচ করে পড়াশোনা করার পর লাখ লাখ যুবক বেকার থাকছে। আবার সরকারি পর্যায়ে অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণে কোটি কোটি টাকার অপচয় হচ্ছে, যা গবেষণার মতো ফলপ্রসূ খাতে ব্যয় হতে পারতো।
  • বেকারত্ব ও দক্ষ জনশক্তির অভাব: একদিকে দেশীয় গ্র্যাজুয়েটরা চাকরি পাচ্ছে না, অন্যদিকে কর্পোরেট খাত ও প্রযুক্তি শিল্পে দক্ষ জনবলের অভাবে বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ এনে বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স বাইরে চলে যাচ্ছে।
  • সামাজিক বৈষম্য: সাধারণ শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা ও মাদরাসা শিক্ষার মাঝে সমন্বয়ের অভাবে এক বিশাল সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি হচ্ছে।

 স্থায়ী শিক্ষা কমিশনের কার্যকারিতা

যদি বাংলাদেশে একটি সংবিধিবদ্ধ এবং স্থায়ী শিক্ষা কমিশন থাকতো, তবে এই জাতীয় বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হতো। স্থায়ী শিক্ষা কমিশন থাকলে:

  • কোনো রাজনৈতিক দল একক সিদ্ধান্তে পাঠ্যক্রম নিয়ে জুয়াখেলা খেলতে পারতো না।
  • যথাযথ সমীক্ষা, ল্যাবরেটরি ও জনবলের প্রাপ্যতা নিশ্চিত না করে কোনো নতুন বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজের অনুমোদন দেওয়া হতো না।
  • একটি দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় শিক্ষানীতি (National Education Policy) যুগের চাহিদার সাথে সংগতি রেখে ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হতো।
  • অতএব, সাময়িক কমিটি বা ক্ষণস্থায়ী সংস্কার কমিশনের পেছনে সময় নষ্ট না করে একটি স্থায়ী, শক্তিশালী এবং আইনগতভাবে সুরক্ষিত শিক্ষা কমিশন গঠন করাই চূড়ান্ত সমাধান। 
  • বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় সুপারিশমালা

উপরিউক্ত তথ্যাদি ও বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতার আলোকে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কারের জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা জরুরি:

১. একটি স্বায়ত্তশাসিত স্থায়ী শিক্ষা কমিশন আইন পাস: জাতীয় সংসদে আইনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে পুনর্গঠন করে একটি স্বাধীন ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন করতে হবে।
২. শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণে যুগান্তকারী পরিবর্তন: মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষক নিয়োগের জন্য একটি পৃথক 'জুডিশিয়াল সার্ভিস'-এর মতো স্বাধীন কমিশন গঠন করতে হবে। শিক্ষকদের বেতন ও সামাজিক নিরাপত্তা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে হবে যেন সেরা মেধাবীরা এই পেশায় আসেন।
৩. কর্মমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক কারিকুলাম: চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের (4IR) চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় র মুখস্থ নির্ভরতা কমিয়ে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, গণিত (STEM) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ভাষা দক্ষতার ওপর জোর দিতে হবে।
৪. উচ্চশিক্ষায় কঠোর কোয়ালিটি কন্ট্রোল: মানহীন ও বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সনদের কার্যকারিতা স্থগিত করাসহ প্রয়োজনে সেগুলোকে বন্ধ বা অন্য প্রতিষ্ঠানের সাথে একীভূত করতে হবে।
৫. বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি: শিক্ষা খাতে ইউনেস্কোর নির্দেশনা অনুযায়ী জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ অথবা মোট বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে এবং এর একটি বড় অংশ গবেষণা ও উদ্ভাবনে ব্যয় করতে হবে।

উপসংহার

শিক্ষা কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষার ক্ষেত্র নয়; এটি একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের মানদণ্ড। অস্থায়ী ও খণ্ডিত উদ্যোগ দিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থাকে টেনে তোলা সম্ভব নয়। দেশ ও জাতিকে একটি মেধাভিত্তিক, দক্ষ এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম প্রজন্ম উপহার দিতে হলে অবিলম্বে একটি কার্যকর স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন করতে হবে। এটিই হবে বাংলাদেশের সার্বিক রাষ্ট্র সংস্কার ও টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ।

লেখক: উপদেষ্টা, গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এবং প্রাক্তন পরিচালক, বাংলাদেশ লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিপিএটিসি)