যাঁদের হাতে জাতির প্রথম অক্ষর, তাঁদের জীবনের শেষ অধ্যায়ে মর্যাদাহীনতার দীর্ঘশ্বাস
প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকদের পদমর্যাদা, উচ্চশিক্ষার মূল্যায়ন ও ন্যায্য পদোন্নতি এখন সময়ের দাবি। একটি শিশুর জীবনে শিক্ষার প্রথম আলো জ্বালিয়ে দেন একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তাঁর হাত ধরেই একটি শিশু প্রথম অক্ষর চিনতে শেখে, নিজের নাম লিখতে শেখে, সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বুঝতে শেখে এবং ধীরে ধীরে একজন সচেতন মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার পথে যাত্রা শুরু করে। সেই শিশুই একদিন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিচারক, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হন। অথচ যাঁদের হাত ধরে এসব মানুষের শিক্ষাজীবনের সূচনা, সেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকরা কর্মজীবনের শেষ দিন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে অবসর নিয়ে চলে যায়। এটি শুধু একটি পেশাগত বৈষম্যের প্রশ্ন নয়; এটি আমাদের জাতীয় মূল্যবোধ, শিক্ষাদর্শন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারেরও প্রশ্ন।
বাংলাদেশে একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সাধারণত ৫৯ বছর বয়সে অবসর গ্রহণ করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি হাজারো শিশুকে শিক্ষিত করেন, অসংখ্য পরিবারের স্বপ্ন পূরণের ভিত্তি নির্মাণ করেন এবং একটি জাতির মানবসম্পদ উন্নয়নে নীরবে অবদান রেখে যান। কিন্তু এত দীর্ঘ কর্মজীবনের পরও তাঁর অবস্থান যখন ১৩তম বেতন গ্রেডে সীমাবদ্ধ থাকে এবং প্রচলিত সামাজিক ধারণায় তাঁকে তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর পরিচয় বহন করতে হয়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এটাই কি একজন শিক্ষকের প্রাপ্য রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি...!
বিশেষ করে বিষয়টি আরও গভীরভাবে বিবেচনার দাবি রাখে, যখন দেখা যায়, দেশের বিপুলসংখ্যক প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর এই মহান পেশায় যোগদান করেছেন। তাঁরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন, প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগপ্রক্রিয়ায় নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন এবং অন্য অনেক পেশায় প্রবেশের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শিক্ষাদানকে জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাঁদের এই শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত দক্ষতা এবং দীর্ঘ অভিজ্ঞতার যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়া নিঃসন্দেহে হতাশাজনক। এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যে রাষ্ট্র শিক্ষিত, দক্ষ ও যোগ্য মানবসম্পদ গড়ে তোলার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়, সেই রাষ্ট্রের প্রাথমিক শিক্ষকদের অর্জিত উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন কি যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে করা হচ্ছে?
অতীতে বিভিন্ন সময়ে এসএসসি কিংবা এইচএসসি পর্যায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে অনেকে প্রাথমিক শিক্ষকতায় যোগদান করেছেন। তাঁদের অবদানও নিঃসন্দেহে সম্মানজনক। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, নিষ্ঠা ও পেশাগত দক্ষতার মূল্য কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষক নিয়োগের শিক্ষাগত যোগ্যতা, শিক্ষাদানের পদ্ধতি এবং পেশাগত দায়িত্বের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। ফলে উচ্চশিক্ষিত শিক্ষকদের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক একটি উন্নত পদমর্যাদা এবং স্বতন্ত্র পদোন্নতিকাঠামো প্রবর্তনের যৌক্তিকতা আজ অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
একজন স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী শিক্ষক যদি ২৫ থেকে ৩০ বছর বা তারও বেশি সময় নিষ্ঠার সঙ্গে পাঠদান করেন, শিক্ষার্থীদের জীবন গঠনে ভূমিকা রাখেন এবং বিদ্যালয়ের সামগ্রিক শিক্ষার মানোন্নয়নে অবদান রাখেন, তাহলে অন্তত কর্মজীবনের একটি পর্যায়ে তাঁকে দ্বিতীয় শ্রেণির সমপর্যায়ের কর্মকর্তা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ব্যবস্থা থাকা উচিত। শিক্ষাগত যোগ্যতা একমাত্র বিবেচ্য বিষয় না হলেও যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতার সমন্বিত মূল্যায়নের ভিত্তিতে এমন পদোন্নতি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত হতে পারে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন শিক্ষকের মর্যাদা শুধু তাঁর বেতন কিংবা সরকারি পদবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে তাঁর সামাজিক অবস্থান, আত্মমর্যাদাবোধ, পারিবারিক নিরাপত্তা এবং পেশাগত প্রেরণা। একজন শিক্ষক যখন দেখেন, সমপর্যায়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিরা উন্নত পদমর্যাদা ও পদোন্নতির সুযোগ পাচ্ছেন, অথচ তিনি দীর্ঘ চাকরিজীবন পার করেও কাঙ্ক্ষিত স্বীকৃতি পাচ্ছেন না, তখন তাঁর মধ্যে বঞ্চনার অনুভূতি সৃষ্টি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
এই বঞ্চনা কেবল ব্যক্তিগত নয়; এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে পুরো প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার ওপর। কারণ একজন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন, প্রেরণাদীপ্ত ও পেশাগতভাবে সন্তুষ্ট শিক্ষকই শিক্ষার্থীদের সর্বোত্তম শিক্ষা প্রদানে অধিক উৎসাহিত হন। তাই শিক্ষকদের পদমর্যাদা উন্নয়নকে শুধু আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধির দাবি হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
সম্প্রতি প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকদের বর্তমান ১৩তম গ্রেড থেকে দশম গ্রেডে উন্নীতকরণ, উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির জটিলতা নিরসন এবং প্রধান শিক্ষক পদে বিভাগীয় পদোন্নতির সুযোগ বৃদ্ধির দাবি সামনে এসেছে। এসব দাবির যথাযথ পর্যালোচনা জরুরি। পাশাপাশি দীর্ঘদিন একই পদে কর্মরত যোগ্য শিক্ষকদের জন্য জ্যেষ্ঠ শিক্ষক পদ সৃষ্টি, নির্দিষ্ট চাকরিকাল শেষে উচ্চতর গ্রেডে উত্তরণ এবং অবসরের পূর্বে ন্যূনতম দ্বিতীয় শ্রেণির সমপর্যায়ের পদমর্যাদা অর্জনের বাস্তবসম্মত সুযোগ নিশ্চিত করা যেতে পারে।
এ ক্ষেত্রে সরকারের উচিত প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং অর্থ বিভাগের সমন্বয়ে একটি কার্যকর নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ করা। শিক্ষক প্রতিনিধিদের মতামত, নিয়োগকালীন শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত প্রশিক্ষণ, চাকরির অভিজ্ঞতা, কর্মদক্ষতা এবং বিদ্যমান পদোন্নতির সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে একটি বৈষম্যহীন ও যুগোপযোগী পদোন্নতিকাঠামো প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
বিষয়টি রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যে রাজনৈতিক নেতৃত্বই দেশের উন্নয়নের দায়িত্ব গ্রহণ করুক না কেন, শিক্ষার ভিত্তিকে শক্তিশালী না করে টেকসই জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়। আর সেই শিক্ষাব্যবস্থার মূল কারিগরদের যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করা কোনো বিশেষ শ্রেণির প্রতি অনুগ্রহ নয়; এটি একটি শিক্ষাবান্ধব রাষ্ট্রের নৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব।
একই সঙ্গে মনে রাখা প্রয়োজন, প্রথম, দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় শ্রেণির প্রশাসনিক পরিচয় কোনো মানুষের ব্যক্তিগত সম্মানের পরিমাপক হতে পারে না। প্রতিটি পেশাই সম্মানের। কিন্তু শিক্ষাগত যোগ্যতা, দায়িত্ব ও অভিজ্ঞতার তুলনায় পেশাগত অগ্রগতির সুযোগ সীমিত রাখা অবশ্যই পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।
পরিশেষে সরকারের নীতিনির্ধারক, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বের প্রতি আহ্বান, প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের পদমর্যাদাসংক্রান্ত বঞ্চনা দূর করতে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন। বিশেষত স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী যোগ্য শিক্ষকেরা যেন দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে অন্তত দ্বিতীয় শ্রেণির সমপর্যায়ের মর্যাদা নিয়ে অবসর গ্রহণ করতে পারেন, তার নিশ্চয়তা বিধান করুন।
যে শিক্ষক একটি শিশুকে প্রথম অক্ষর শেখান, সেই শিশুর হাত ধরেই একদিন রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রচিত হয়। রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণকারীদের নিজেদের ভবিষ্যৎ যেন পেশাগত অবমূল্যায়ন ও অপূর্ণ স্বীকৃতির বেদনায় শেষ না হয়। শিক্ষককে সম্মান জানানো শুধু সামাজিক সৌজন্য নয়; তাঁর যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও অবদানের যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিশ্চিত করাই প্রকৃত সম্মান। আর সেই সম্মান প্রতিষ্ঠার সময় এখনই।
লেখক: কলামিস্ট ও জনসংযোগ প্রধান, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ