এমআইটির স্বপ্ন থেকে চুয়েটের অচলাবস্থা: দায় নেবে কে?
চুয়েটের সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহ
গত ২১ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় চুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে অপসারণ করে এবং তার স্থলাভিষিক্ত হিসেবে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) -এর অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নতুন ভিসি হিসেবে নিয়োগ দেয়। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এবং সাবেক ভিসিকে পুনর্বহালের দাবিতে চুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ক্যাম্পাসজুড়ে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ বা পূর্ণাঙ্গ অচলাবস্থা কর্মসূচি শুরু করেন। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও একই দাবিতে কর্মবিরতি শুরু করায় ক্লাস, পরীক্ষা ও অন্যান্য সব প্রশাসনিক কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। গত ১২ অক্টোবর নতুন ভিসি অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সাথে নিয়ে তালা ভেঙে কার্যালয়ে প্রবেশ করলে শিক্ষার্থীরা তাকে ভেতরে অবরুদ্ধ করে ফেলেন।
দীর্ঘ ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে ১৩ অক্টোবর জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের মধ্যস্থতায় তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। দেশবাসী দীর্ঘ ২৮ দিন ধরে চুয়েটের এই শ্বাসরুদ্ধকর অচলাবস্থা (যা প্রায় চার সপ্তাহ বা ২৮ দিন ধরে চলছে) নিরসনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটিতে বুয়েট, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (চবি) এবং সিভাসু-এর ভিসিদের অন্তর্ভুক্ত করে মোট ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যারা সমস্যাটি খতিয়ে দেখে সমাধানের পথ খুঁজবেন। এই উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন হওয়া সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা তাদের দাবিতে অনড় রয়েছেন। তারা নতুন ভিসির পদত্যাগ এবং সাবেক ভিসির পুনর্বহাল না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
ফলশ্রুতিতে এখনও ক্যাম্পাসের একাডেমিক ও প্রশাসনিক অচলাবস্থা পুরোপুরি কাটেনি। অনেকে প্রশ্ন করছেন, ভিসি নিয়োগপ্রাপ্ত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর অর্থাৎ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান কর্তৃক। তার উপরে বাংলাদেশে আর কেউ নেই। তার সিদ্ধান্তের উপর একটি কমিটি (যার প্রধান ইউজিসি’র একজন সদস্য, যিনি যুগ্মসচিব পদমর্যাদাসম্পন্ন) কী সিদ্ধান্ত দিবে? তাহলে কমিটি কি শুধুমাত্র পরিস্থিতির গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে এই সুপারিশ প্রদান করবে যে, পরিস্থিতি গুরুতর। অতএব শরীফুল আলমকে সরিয়ে চুয়েটে নুতন ভিসি নিয়োগের সুপারিশ করা হলো? এই সুপারিশের জন্যে কমিটি কেন? মিডিয়াই তো সব আপডেট দিয়া চলছে! তাহলে কি কমিটি গঠন সময় ক্ষেপণের কৌশল? সে যাই হোক, চুয়েট বর্তমান পরিস্থিতির কুয়েটে এমন ধরনের আরও একটি অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। ফলত কুয়েটে প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রম প্রায় ৬ মাস বন্ধ ছিল।
কুয়েটের ঘটনা
ঘটনার বিবরণে প্রকাশ, ২০২৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে চরম সহিংস সংঘর্ষ হয়। এতে প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী আহত হন। সহিংসতার পর ১৯ ফেব্রুয়ারি অ্যাকাডেমিক ভবনে তালা এবং পরবর্তীতে প্রশাসনের নির্দেশে ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে কুয়েটের সব আবাসিক হল ও একাডেমিক কার্যক্রম জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
আন্দোলনের মুখে এবং বিভিন্ন জটিলতার কারণে এপ্রিলে কুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাসুদ এবং সহ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে নিয়োগ পাওয়া অন্তর্বর্তীকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. হযরত আলীও শিক্ষক সমিতির আন্দোলনের মুখে ২১ মে পদত্যাগ করেন। উপাচার্য ও সহ-উপাচার্যের পদ ফাঁকা থাকায় প্রশাসনিক ও আর্থিক কার্যক্রম পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে। এর ফলে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার শিক্ষার্থী তীব্র সেশনজটের মুখে পড়েন। দীর্ঘ প্রায় ৬ মাস বন্ধ থাকার পর, নতুন উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক ড. মো. মাকসুদ হেলালীর নিয়োগ এবং শিক্ষক সমিতির আন্দোলন স্থগিতের পর ২০২৫ সালের ২৯ জুলাই থেকে কুয়েটের নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রম ও ক্লাস শুরু হয়। কুয়েটের এই ইতিহাস আমাদের সামনে থাকার পর বৎসরাধিক কাল মাত্র অতিবাহিত হওয়ার পর একই ধরনের আর একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অচলাবস্থা সৃষ্টি হওয়া উচ্চশিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির পরিচায়ক নয় এবং দেশের শিক্ষা প্রশাসনের যোগ্যতার প্রতি অনেকেই অঙ্গুলিনির্দে করছেন।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়। এটি দেশের প্রকৌশল শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে প্রতিষ্ঠানটি আজকের অবস্থানে এসেছে। অথচ সেই প্রতিষ্ঠানে এখন ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ, প্রশাসনিক কার্যক্রম স্থবির, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরোধ। উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা শুধু চুয়েটের জন্য নয়, দেশের উচ্চশিক্ষার জন্যেও উদ্বেগজনক। প্রশ্ন হলো, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে এমন সংকট তৈরি হবে কেন? সরকারের একটি সিদ্ধান্তের কারণে যদি হাজারো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তায় পড়ে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।
চুয়েট সৃষ্টির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সম্ভাবনা
চুয়েটের ইতিহাস দীর্ঘ। ১৯৬৮ সালের ২৮ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। প্রথম শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ছিল মাত্র ১২০ জন। পরে ১৯৮৬ সালে এটি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (বিআইটি), চট্টগ্রামে রূপান্তরিত হয়। ২০০৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে চুয়েট।
এই রূপান্তর কেবল নাম পরিবর্তনের ইতিহাস নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল উন্নত প্রকৌশল শিক্ষা, গবেষণা এবং শিল্পায়নের চাহিদা পূরণের প্রত্যাশা। চট্টগ্রাম দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল। এই অঞ্চলে দক্ষ প্রকৌশলী তৈরি এবং প্রযুক্তিগত গবেষণা এগিয়ে নেওয়ার জন্য চুয়েটের মতো প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব অপরিসীম।
প্রকৌশল শিক্ষার আদর্শ হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি)। সেখানে তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি গবেষণা, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাংলাদেশের প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোরও এমন সক্ষমতা অর্জনের সুযোগ ছিল। কিন্তু শুধু নাম, অবকাঠামো কিংবা ডিগ্রি দিয়ে বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে না। প্রয়োজন গবেষণার পরিবেশ, দক্ষ নেতৃত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একাডেমিক সংস্কৃতি।
চুয়েটের বর্তমান পরিস্থিতি সেই মৌলিক প্রশ্নগুলো আবার সামনে এনেছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম শুধু তার শিক্ষকদের গবেষণা বা শিক্ষার্থীদের ফলাফলের ওপর নির্ভর করে না। সংকটের সময় প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, মতবিরোধ কীভাবে সামলায় এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থ কতটা রক্ষা করে, সেটিও তার মান নির্ধারণ করে।
৫৬ দিনের মাথায় উপাচার্য পরিবর্তন
চুয়েটের সাম্প্রতিক সংকটের সূত্রপাত উপাচার্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত থেকে। অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে ২০২৬ সালের জুলাইয়ের শেষভাগে চার বছরের জন্য উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ৫৬ দিনের মাথায়, ২১ সেপ্টেম্বর, তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তার স্থলে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এত অল্প সময়ের মধ্যে একজন উপাচার্যকে সরিয়ে দেওয়ার পেছনে কী কারণ ছিল, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে। কোনো প্রশাসনিক ব্যর্থতা, অনিয়ম কিংবা অন্য কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ থাকলে তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। আবার সিদ্ধান্তটি যদি বৃহত্তর কোনো নীতিগত বিবেচনায় নেওয়া হয়ে থাকে, সেটিও ব্যাখ্যা করা উচিত।
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে পরিবর্তন হতেই পারে। কিন্তু সেই পরিবর্তন হতে হবে যুক্তিসংগত, স্বচ্ছ এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। শুধু প্রজ্ঞাপন জারি করলেই একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে না। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বাস্তবতা ও অংশীজনদের প্রতিক্রিয়াও বিবেচনায় নিতে হয়।
চুয়েটের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একাংশের অভিযোগ, অধ্যাপক সায়েমকে অপসারণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। তারা এই সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক প্রভাবের ফল বলে মনে করছেন। এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট: সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তি নিয়ে অস্পষ্টতা যত বাড়ে, অবিশ্বাসও তত গভীর হয়।
নতুন উপাচার্যকে ঘিরে বিরোধ
অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম কুয়েটের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক ছিলেন। তার দীর্ঘ শিক্ষকতা ও গবেষণার অভিজ্ঞতা রয়েছে। কিন্তু একজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত যোগ্যতা এবং একটি নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তার গ্রহণযোগ্যতা এক বিষয় নয়। চুয়েটেটের আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের একটি অংশ তাঁকে বহিরাগত হিসেবে দেখছেন। তাঁদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শিক্ষককে বিবেচনায় না নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তার নিয়োগের পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব থাকার অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব অভিযোগ প্রমাণিত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য এবং নিয়োগের প্রক্রিয়া যাচাই করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত।
এখানে মূল প্রশ্নটি ব্যক্তিগত নয়। প্রশ্ন হলো, উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে কী ধরনের মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে বা হচ্ছে? প্রার্থীর একাডেমিক যোগ্যতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, নেতৃত্বের সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তার পরিচিতি—এসব বিষয় কতটা গুরুত্ব পেয়েছে? বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শিক্ষককে নিয়োগ দিতেই হবে, এমন কোনো সর্বজনীন নিয়ম নেই। বাইরের কোনো যোগ্য শিক্ষকও ভালো নেতৃত্ব দিতে পারেন। কিন্তু সেই নিয়োগের পেছনে গ্রহণযোগ্য যুক্তি থাকতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও বাস্তবতা সম্পর্কে যথাযথ মূল্যায়নও প্রয়োজন। এসব বিবেচনা উপেক্ষিত হলে যোগ্য ব্যক্তিও দায়িত্ব গ্রহণের শুরুতে আস্থার সংকটে পড়তে পারেন। বি এন পি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ যাবত যে সকল ভিসি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তাদের অনেকের বিষয়েই গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেতিবাচক খবর বেরিয়েছে এবং তা নিয়ে ছাত্র-শিক্ষক মহলে নানারকম গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে।
আন্দোলন থেকে অচলাবস্থা
উপাচার্য পরিবর্তনের প্রতিবাদে ২২ সেপ্টেম্বর থেকে চুয়েটে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। পরে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের একাংশও কর্মবিরতি ও অসহযোগ কর্মসূচিতে যুক্ত হন। এর ফলে ক্লাস, পরীক্ষা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। ১২ অক্টোবর নতুন উপাচার্য ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে প্রশাসনিক ভবনে যান। এ সময় ভবনের তালা ভাঙার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ ওঠে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবি, তার সঙ্গে ছাত্রদলের নেতাকর্মী ও বহিরাগত ব্যক্তিরা ছিলেন। অন্যদিকে উপাচার্য ও ছাত্রদল নেতারা তালা ভাঙা কিংবা রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক ভবনের প্রবেশপথে তালা দেন। বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ঘটনাও ঘটে। দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ থাকার পর ১৩ অক্টোবর সন্ধ্যায় স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় উপাচার্যকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
এ ঘটনাকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক প্রতিবাদ বলা যায় না। নিয়োগের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার অধিকার শিক্ষার্থীদের আছে। সিদ্ধান্তের সমালোচনা করার অধিকার শিক্ষকদেরও আছে। কিন্তু কাউকে অবরুদ্ধ রাখা, তার নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলা কিংবা প্রয়োজনীয় সেবা বন্ধ করে দেওয়া গ্রহণযোগ্য প্রতিবাদের পদ্ধতি হতে পারে না।
একইভাবে, কোনো নিয়োগ নিয়ে বিরোধ থাকলে তা সমাধানের দায়িত্ব সরকারের। প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়ে কিংবা বিরোধীদের বক্তব্য উপেক্ষা করে সংকট সামলানোর চেষ্টা করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব যেমন সবার, তেমনি দায়িত্বশীল আচরণের দায়ও সবার।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই
চুয়েটের বর্তমান পরিস্থিতিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। উপাচার্য নিয়োগ ও অপসারণের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা রয়েছে। তাই এমন সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য পরিণতি বিবেচনা করা তাদের দায়িত্বের অংশ।
একজন উপাচার্যকে নিয়োগ দেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যে সরিয়ে দেওয়া হলে তার কারণ ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে সিদ্ধান্তটি যদি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বড় ধরনের সংকট তৈরি করে, তাহলে সরকারের জবাবদিহি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় যদি মনে করে অধ্যাপক সায়েমকে সরানোর যথেষ্ট কারণ ছিল, তবে তা প্রাসঙ্গিক তথ্যের ভিত্তিতে স্পষ্ট করা উচিত। আর সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুল হয়ে থাকলে সেটি সংশোধনের সাহসও দেখাতে হবে। প্রশাসনিক কর্তৃত্ব বজায় রাখার অর্থ ভুল সিদ্ধান্ত আঁকড়ে থাকা নয়।
অন্যদিকে, আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দাবিও যাচাইয়ের বাইরে থাকতে পারে না। তারা সাবেক উপাচার্যকে পুনর্বহালের দাবি জানাচ্ছেন। কিন্তু সেই দাবি পূরণের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার বিষয়গুলোও বিবেচনা করতে হবে। কোনো পক্ষের চাপের মুখে নয়, তথ্য ও যুক্তির ভিত্তিতে সমাধান আসা প্রয়োজন।
সবচেয়ে বড় ক্ষতি শিক্ষার্থীদের
এই বিরোধে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তাদের প্রত্যাশা থাকে নির্ধারিত সময়ে কোর্স শেষ করা, পরীক্ষা দেওয়া এবং পেশাজীবনে প্রবেশের প্রস্তুতি নেওয়া। প্রশাসনিক বিরোধের কারণে এসব পরিকল্পনা ব্যাহত হলে তার মূল্য শিক্ষার্থীদেরই দিতে হয়।
ক্লাস বন্ধ থাকলে শুধু পাঠ্যসূচি পিছিয়ে যায় না। ল্যাবরেটরির কাজ, প্রকল্প, গবেষণা এবং ব্যবহারিক প্রশিক্ষণও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রকৌশল শিক্ষায় এসবের গুরুত্ব অনেক। দীর্ঘ অচলাবস্থা শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বাড়ায়। ভবিষ্যৎ চাকরি ও উচ্চশিক্ষার পরিকল্পনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
এই ক্ষতির দায় কে নেবে? উপাচার্য নিয়োগের সিদ্ধান্ত যাঁরা নিয়েছেন, আন্দোলনের কর্মসূচি যাঁরা দীর্ঘায়িত করছেন এবং যারা পরিস্থিতিকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়েছেন—সবার ভূমিকা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কোনো পক্ষই শুধু নিজের অবস্থানকে সঠিক দাবি করে শিক্ষার্থীদের ক্ষতির দায় এড়িয়ে যেতে পারে না।
বিশ্ববিদ্যালয় কি রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থাকবে না?
চুয়েটের ঘটনা বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি পুরোনো সমস্যার কথাও মনে করিয়ে দেয়। উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ নতুন নয়। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব ও প্রশাসনিক অবস্থান নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব একাডেমিক সংস্কৃতি দুর্বল হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় সরকারের আইনগত ভূমিকা থাকবে। কিন্তু সেই ভূমিকা যেন দলীয় আনুগত্যের পরীক্ষায় পরিণত না হয়। একজন উপাচার্যের প্রথম পরিচয় হওয়া উচিত তার একাডেমিক যোগ্যতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ববোধ। রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা কোনো পক্ষের প্রতি আনুগত্য যেন নিয়োগের প্রধান বিবেচনা না হয়।
একই সঙ্গে শিক্ষকদেরও দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনও যেন কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর স্বার্থে ব্যবহৃত না হয়। বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার দাবি তখনই বিশ্বাসযোগ্য হবে, যখন সব পক্ষ নিজেদের আচরণেও সেই নীতি অনুসরণ করবে।
সংকটের সমাধান কী?
চুয়েটের অচলাবস্থা নিরসনে প্রথম কাজ হলো সংঘাত বন্ধ করা এবং একাডেমিক কার্যক্রম চালু করা। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে কার্যকর আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, অধ্যাপক সায়েমকে অপসারণ এবং অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করা উচিত। কী কারণে আগের উপাচার্যকে সরানো হলো, কী বিবেচনায় নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হলো এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না এসব প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট হওয়া দরকার। আমাদের বিশ্বাস, নবগঠিত কমিটি এই বিষয়গুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার বিশ্লেষণ করে সরকারকে অবহিত করবেন।
তৃতীয়ত, ১২ ও ১৩ অক্টোবরের ঘটনাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। প্রশাসনিক ভবনের তালা ভাঙা, বহিরাগতদের প্রবেশ, অবরুদ্ধ করার ঘটনা এবং বিদ্যুৎ-পানি বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগ—সবকিছুই তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করতে হবে। কোনো পক্ষকে আগেই দোষী বা নির্দোষ ঘোষণা করা উচিত নয়।
চতুর্থত, ভবিষ্যতে উপাচার্য নিয়োগের জন্য স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নিয়োগের ক্ষেত্রে একাডেমিক যোগ্যতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, সততা ও নেতৃত্বের সক্ষমতাকে প্রাধান্য দিতে হবে। সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তি ও প্রক্রিয়া স্পষ্ট থাকলে অযথা বিতর্কের সুযোগও কমবে।
চুয়েটের মর্যাদা ফিরবে কীভাবে?
চুয়েটের সংকট কেবল একজন উপাচার্যকে রাখা বা সরানোর প্রশ্ন নয়। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি, সরকারের জবাবদিহি এবং শিক্ষাঙ্গনে মতবিরোধ সামলানোর সক্ষমতার পরীক্ষা।
এমআইটি’র মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তুলনা করতে হলে শুধু পাঠ্যক্রম বা প্রযুক্তিগত শিক্ষার কথা বললে চলবে না। গবেষণার স্বাধীনতা, দক্ষ নেতৃত্ব, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং যোগ্যতার মূল্যায়নেও সেই মান অর্জন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক টানাপোড়েনের বাইরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
চুয়েটের গৌরবময় ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাসের মর্যাদা রক্ষা করার দায়িত্ব বর্তমান প্রজন্মের। কিন্তু মর্যাদা রক্ষার প্রথম শর্ত হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনা এবং সংকটের প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে হবে। আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদেরও দায়িত্বশীল অবস্থানে ফিরতে হবে। আর যাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার দায়িত্বে
রয়েছেন, তাদের মনে রাখতে হবে পদ ব্যক্তির জন্য নয়, প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীদের জন্য।
চুয়েটের শিক্ষার্থীরা প্রকৌশলী হতে এসেছেন। প্রশাসনিক বিরোধের জিম্মি হতে নয়। তাদের ক্লাসরুমে ফেরার অধিকার নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। তা না হলে উপাচার্য পদে কে থাকলেন, সেই বিতর্কের আড়ালে হারিয়ে যাবে আরও বড় ক্ষতি—একটি প্রজন্মের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ।
দেশবাসী আশা করে, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার যাবতীয় অচলাবস্থা দূরীভূত হোক, গুণগত মান বৃদ্ধি পাক এবং বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে সম্মানজনক আসন লাভ করুক।
লেখক: উপদেষ্টা, গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এবং প্রাক্তন পরিচালক, বাংলাদেশ লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিপিএটিসি), সাভার
ই-মেইল: amatin@aub.ac.bd