২০ অক্টোবর ২০২৬, ২০:৩৭

স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি: কখন প্রয়োজন, কীভাবে কাজ করে

ডা. ভাস্কর চক্রবর্তী  © টিডিসি সম্পাদিত

স্তন ক্যান্সার শনাক্ত হওয়ার পর রোগী ও তার পরিবারের মনে যে প্রশ্নগুলো আসে, তার মধ্যে অন্যতম—অস্ত্রোপচারের পর কি আবার রেডিওথেরাপি নিতে হবে? এই চিকিৎসায় কি ব্যথা হয়? এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কেমন? রেডিওথেরাপি সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকলে অনেক সময় রোগীর মনে অযথা ভয় তৈরি হয়। অথচ স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসায় উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে রেডিওথেরাপি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অক্টোবর স্তন ক্যান্সার সচেতনতা মাস। এই সময়ে রোগটি সম্পর্কে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসার বিভিন্ন পদ্ধতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য জানা প্রয়োজন। কারণ, চিকিৎসা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রোগীকে সিদ্ধান্ত নিতে এবং চিকিৎসার পুরো প্রক্রিয়ায় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অংশ নিতে সাহায্য করে।

রেডিওথেরাপি কী এবং কীভাবে কাজ করে?
রেডিওথেরাপি হলো উচ্চশক্তির রশ্মি ব্যবহার করে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা বা তাদের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণের একটি চিকিৎসা পদ্ধতি। আধুনিক রেডিওথেরাপিতে বিশেষ পরিকল্পনার মাধ্যমে শরীরের নির্দিষ্ট অংশে প্রয়োজনীয় মাত্রায় বিকিরণ দেওয়া হয়, যাতে আশপাশের সুস্থ টিস্যুর ওপর প্রভাব যথাসম্ভব সীমিত রাখা যায়।

স্তন ক্যান্সারের ক্ষেত্রে রেডিওথেরাপির প্রয়োজনীয়তা নির্ভর করে রোগের পর্যায়, অস্ত্রোপচারের ধরন, টিউমারের বৈশিষ্ট্য, লিম্ফ নোডে ক্যানসার ছড়িয়েছে কি না এবং অন্যান্য চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিষয়ের ওপর। তাই একজন রোগীর চিকিৎসার সঙ্গে অন্য রোগীর চিকিৎসা মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।

কখন রেডিওথেরাপি প্রয়োজন হতে পারে?
স্তন সংরক্ষণমূলক অস্ত্রোপচারের পর অনেক রোগীর ক্ষেত্রে রেডিওথেরাপি দেওয়া হয়, যাতে স্তনে ক্যান্সার পুনরায় ফিরে আসার ঝুঁকি কমানো যায়। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে স্তন অপসারণের পরও রেডিওথেরাপি প্রয়োজন হতে পারে, বিশেষ করে রোগের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য বা লিম্ফ নোডে ক্যান্সারের উপস্থিতির ভিত্তিতে।

কিছু পরিস্থিতিতে ক্যান্সারের উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ বা রোগের কারণে সৃষ্ট নির্দিষ্ট সমস্যা কমাতেও রেডিওথেরাপি ব্যবহার করা হয়। তবে সবার জন্য এই চিকিৎসা প্রয়োজন হয় না। রোগীর রিপোর্ট, শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসার উদ্দেশ্য বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।

চিকিৎসার আগে কীভাবে প্রস্তুতি নেওয়া হয়?
রেডিওথেরাপি শুরু করার আগে রোগীর পূর্ববর্তী রিপোর্ট, অস্ত্রোপচারের বিবরণ এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ফল পর্যালোচনা করা হয়। এরপর পরিকল্পনা তৈরির জন্য বিশেষ ইমেজিং বা সিমুলেশন করা হতে পারে। এর মাধ্যমে শরীরের কোন অংশে এবং কীভাবে বিকিরণ দেওয়া হবে, তা নির্ধারণ করা হয়।

চিকিৎসার সেশনের সংখ্যা ও সময়কাল রোগীর প্রয়োজন, ব্যবহৃত পদ্ধতি এবং চিকিৎসা পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে। আধুনিক চিকিৎসায় অনেক রোগীর ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে কম সময়ের নির্দিষ্ট কোর্স ব্যবহার করা সম্ভব হলেও সব রোগীর পরিকল্পনা এক রকম নয়।

রোগীর উচিত চিকিৎসক ও রেডিওথেরাপি দলের কাছ থেকে চিকিৎসার উদ্দেশ্য, সম্ভাব্য সময়কাল, প্রয়োজনীয় সতর্কতা এবং দৈনন্দিন কাজকর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে কী জানা জরুরি?
রেডিওথেরাপির সময় বা পরে চিকিৎসা করা স্থানে ত্বকের লালচে ভাব, শুষ্কতা, ক্লান্তি, স্পর্শে অস্বস্তি কিংবা স্তনে সাময়িক ফোলাভাব দেখা দিতে পারে। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ধরন ও তীব্রতা ব্যক্তি এবং চিকিৎসার পদ্ধতি অনুযায়ী ভিন্ন হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীদের পরামর্শে এসব সমস্যা নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যবস্থা করা যায়।

চিকিৎসার সময় ত্বকের যত্ন, বিশ্রাম, পর্যাপ্ত পুষ্টি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দৈনন্দিন কাজের সমন্বয় গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সমস্যা দেখা দিলে নিজে থেকে ওষুধ বা ত্বকে ব্যবহারের পণ্য শুরু না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

সমন্বিত চিকিৎসাই মূল কথা
স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসায় অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি, হরমোন চিকিৎসা, লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা ও রেডিওথেরাপির মধ্যে এক বা একাধিক পদ্ধতির প্রয়োজন হতে পারে। এসব চিকিৎসার সঠিক সমন্বয় রোগীর অবস্থা অনুযায়ী নির্ধারণ করা হয়। এ কারণে চিকিৎসার বিভিন্ন ধাপের মধ্যে যোগাযোগ ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রামের ক্যান্সার কেয়ার সেন্টারে রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ পরামর্শ ও চিকিৎসা পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। চিকিৎসা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা, সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে আলোচনা এবং নিয়মিত ফলোআপ রোগীকে চিকিৎসার পুরো যাত্রায় সহায়তা করতে পারে।

স্তন ক্যান্সার শনাক্ত হলে ভয় না পেয়ে রোগের ধরন ও পর্যায় সম্পর্কে জানুন, চিকিৎসার বিকল্প নিয়ে বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলোচনা করুন এবং নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুসরণ করুন। সঠিক তথ্য, সময়মতো চিকিৎসা ও সমন্বিত সেবাই এই লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

লেখক: ভিজিটিং কনসালট্যান্ট—রেডিয়েশন অনকোলজি, মেডিকেল অ্যান্ড রেডিয়েশন অনকোলজি, এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রাম