১১ অক্টোবর ২০২৬, ২০:২৭

নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস: শিক্ষিত বেকারদের স্বপ্নভঙ্গের দায় কার?

মোহাম্মদ সোহাইব  © টিডিসি সম্পাদিত

শনিবার (১০ অক্টোবর) যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ১১তম গ্রেডের নিয়োগ পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর পরীক্ষার্থীরা জানলেন, প্রশ্ন ফাঁসের কারণে পরীক্ষা বাতিল। যারা ভোরে রওনা দিয়েছিলেন, ধার করে বাসভাড়া জুটিয়েছিলেন, পরীক্ষার আগের রাত কাটিয়েছেন অচেনা শহরের মেসে বা বাসস্ট্যান্ডে, তাদের কাছে এই খবর শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। এটি আরেকবার জানিয়ে দেওয়া যে তাদের পরিশ্রমের চেয়ে কারও পকেটের জোর বেশি মূল্যবান হতে পারে।

সরকারি চাকরির পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস আমাদের দেশে নতুন নয়। কিন্তু প্রতিবার ঘটনা ঘটে, কিছুদিন আলোচনা চলে, তদন্ত কমিটি হয়, তারপর সবাই ভুলে যায়। এই দুষ্টচক্র না ভাঙলে, রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা শূন্যে নেমে আসবে। 

কার ক্ষতি এবং কতটা?
ব্যক্তিগত ক্ষতি- একজন চাকরিপ্রার্থী গড়ে মাসের পর মাস, কখনো বছরের পর বছর প্রস্তুতি নেন। আবেদন ফি, কোচিং, বই, যাতায়াত, থাকা-খাওয়া মিলিয়ে নিম্নমধ্যবিত্ত বা গ্রামের পরিবারের জন্য এটি বড় বিনিয়োগ। পরীক্ষা বাতিল হলে এই খরচ ফেরত আসে না। সঙ্গে আছে পরিবারের প্রত্যাশা আর বয়সসীমা পেরিয়ে যাওয়ার আতঙ্ক। অনেক তরুণ এতে হতাশা ও বিষণ্নতায় ভোগেন।

মেধার অবমূল্যায়ন- যে তরুণ নিজের যোগ্যতায় লড়ছেন, তিনি যদি দেখেন প্রতিযোগিতার মাঠটাই সমান নয়, তাহলে তাঁর মধ্যে দুটি প্রবণতা জন্ম নিতে পারে: হয় দেশ ছাড়ার তাগিদ, নয়তো "সবাই যখন করছে, আমিও করি" ধরনের নৈতিক আত্মসমর্পণ। দুটোই রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর।

রাষ্ট্রের ক্ষতি- প্রশ্ন ফাঁসের মাধ্যমে চাকরি পাওয়া অসৎ ও অযোগ্য কর্মকর্তা রাষ্ট্রের সেবার মান নামিয়ে দেন। আর যিনি টাকার বিনিময়ে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিয়ে, ঘুষ বা প্রভাবের জোরে ঢোকেন, তিনি ঢুকেই বিনিয়োগ তোলার চেষ্টা করেন। এভাবে একটি দুর্নীতি আরেকটি দুর্নীতির জন্ম দেয়।
সামাজিক ক্ষতি- মানুষ যখন বিশ্বাস করতে শুরু করে চাকরি পেতে হলে প্রশ্ন কেনার জন্য টাকা বা তদবির লাগে, তখন সমাজে সততার মূল্য ও রাষ্ট্রীয় আইনকানুনের প্রতি আস্থা কমে যায়। প্রশ্ন ফাঁস তাই শুধু পরীক্ষার অপরাধ নয়, এটি সামাজিক আস্থার অপরাধ।

কেন বারবার ঘটে? 
প্রথমত, এটি এখন একটি লাভজনক সংগঠিত ব্যবসা। প্রশ্ন ছাপা, বহন, সংরক্ষণ ও বিতরণের প্রতিটি ধাপে একাধিক মানুষ জড়িত থাকেন, আর একজন ভেতরের লোক বিক্রি করলেই কোটি টাকার বাজার তৈরি হয়। দ্বিতীয়ত, অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি। দৃষ্টান্তমূলক বিচার খুব কম হয় বলে ঝুঁকির তুলনায় লাভ অনেক বেশি। তৃতীয়ত, কাগজে ছাপা প্রশ্ন, বহু হাত ঘুরে কেন্দ্রে পৌঁছানো, ডিজিটাল নজরদারির অভাব পুরো প্রক্রিয়াকে করে তুলে সেকেলে ও নিরাপত্তাহীন। চতুর্থত, লাখ লাখ প্রার্থীর বিপরীতে সামান্য কিছু পদ। এই তীব্র চাপ ফাঁসের চাহিদা তৈরি করে। পঞ্চম কারণ হচ্ছে ঘটনার পর দায় এড়ানোর প্রবণতা। এ ধরনের ঘটনায় দেখা যায় যে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয় না, জবাবদিহিও নিশ্চিত হয় না। 

বিদ্যমান আইন ও এর ফাঁকফোকর 
বাংলাদেশে পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের শাস্তি সম্পর্কিত আইন বলতে আগে ছিল পাবলিক পরীক্ষাসমূহ (অপরাধ) আইন, ১৯৮০। এই বছর জুলাইয়ে এই আইনে সংশোধনী এনে পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) (সংশোধন) আইন, ২০২৬ পাস করা হয়। এই দুটো আইন পর্যালোচনা করে দেখা যায়- ১৯৮০ সালের আইনে অনলাইনে প্রশ্ন ফাঁস বা ডিজিটাল ফরম্যাটে প্রশ্ন ফাঁসের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান ছিল না। সংশোধিত আইনে ডিজিটাল ম্যানিপুলেশন ও ডিজিটাল কারসাজিকে কারাদণ্ড ও জরিমানার আওতায় আনা হলেও শাস্তির মাত্রা কমানো হয়েছে। আগের আইনে প্রশ্ন ফাঁস ও বিতরণের জন্য ১০ বছর কারাদণ্ডের যে বিধান ছিল সেটা কমিয়ে পাঁচ বছর করা হয়েছে নতুন আইনে। একই সাথে একজনের হয়ে অন্য কেউ পরীক্ষা দিলে তার কারাদণ্ডের শাস্তিও কমিয়ে পাঁচ বছর করা হয়েছে। যেখানে আরো কঠোর শাস্তির বিধান করার কথা সেখানে শাস্তি উল্টো কমানো হলো। এর বাইরেও আইনের আরো কিছু ফাঁকফোকর রয়েছে। যেমন-

১৯৮০ সালের আইনে ‘পাবলিক পরীক্ষা’ মানে বিশ্ববিদ্যালয় বা ‘বোর্ড’ কর্তৃক অনুষ্ঠিত পরীক্ষা, আর ‘বোর্ড’ বলতে শিক্ষা সংক্রান্ত সংস্থা বোঝানো হয়েছে। আমি আইনজীবী নই, তবে এই সংজ্ঞা সরাসরি পড়লে মনে হবে সরকারি দপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষা (যেমন শনিবারের যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরীক্ষা) এর আওতায় পড়ে কি না, তা নিয়ে ব্যাখ্যাগত অস্পষ্টতা তৈরি হতে পারে। সংশোধনীতে এই সংজ্ঞা বদলানো হয়নি। এটি সবচেয়ে জরুরি ফাঁক।

সংশোধনীতে সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছর। যে অসাধু চক্র লাখ লাখ প্রার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলে ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকা আয় করে, তাদের জন্য এটি যথেষ্ট প্রতিরোধক নয়। বিশেষ করে সংগঠিত চক্রের মাস্টারমাইন্ড ও ভেতরের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে।

সবচেয়ে প্রহসনের বিষয় হচ্ছে এই আইনে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য কিছু নেই। আইনে দোষীর শাস্তি আছে, কিন্তু যে হাজার হাজার প্রার্থী আর্থিক ও মানসিক ক্ষতির শিকার হলেন, তাঁদের জন্য কোনো ক্ষতিপূরণের বিধান নেই। নেই অপরাধলব্ধ অর্থ তথা ফাঁসের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বাজেয়াপ্ত করার সুস্পষ্ট বিধানও। 

আইন কঠোর ও কার্যকর করতে যা করা দরকার
প্রথমত, পরীক্ষার সংজ্ঞা বদলাতে হবে। ‘পাবলিক পরীক্ষা’র সংজ্ঞায় সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ সংস্থার সব নিয়োগ পরীক্ষা এবং এসব পরীক্ষা পরিচালনায় নিয়োজিত বেসরকারি এজেন্সিকে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা। দ্বিতীয়ত, সাধারণ অপরাধ আর সংগঠিত চক্র, মাস্টারমাইন্ড ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের শাস্তি আলাদা হওয়া উচিত। শেষোক্তদের জন্য উচ্চতর সাজা ও সরকারি চাকরি থেকে স্থায়ী বরখাস্তর বিধান রাখা যায়। তৃতীয়ত, বিচার সংক্ষিপ্ত পদ্ধতির বদলে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে (যেমন ১৮০ দিন) নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতাসহ হওয়া উচিত। চতুর্থত, প্রশ্নপত্র ফাঁস থেকে অর্জিত সম্পদ জব্দ ও বাজেয়াপ্ত করার বিধান এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় আনার সুযোগ রাখা। পঞ্চমত, প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে পরীক্ষা বাতিল হলে আবেদন ফি ফেরত এবং পুনঃপরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের জন্য যাতায়াত সহায়তার ব্যবস্থা থাকা উচিত। দায়ী প্রতিষ্ঠান বা কর্মকর্তার কাছ থেকে এর খরচ আদায়ের সুযোগও থাকতে পারে। ষষ্টত, অপরাধ প্রমাণিত হলে যাঁরা ফাঁস হওয়া প্রশ্নে চাকরি পেয়েছেন, তাঁদের নিয়োগ বাতিল ও আইনি ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট বিধান থাকা দরকার।

সাধারণত দেখা যায় যে, এরকম ঘটনায় তদন্ত করার দায়িত্ব দেওয়া হয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা দপ্তরের আমলাদেরকে। কিন্তু এটা মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত যে এ ধরনের প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় উচ্চপদস্থ আমলারাও অসাধু চক্রের অংশ হিসেবে কাজ করে। ফলে যখন কোনো আমলার অপরাধের তদন্তভার সেই আমলা গোষ্ঠীরই অন্যকোনো আমলাকে দেওয়া হয়, তখন সেই তদন্ত হয় আলোর মুখ দেখেনা, অথবা কোনো ড্রাইভার বা পিওনকে সামনে এনে বলি দেওয়া হয়। তাই এসব ঘটনার তদন্তে সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধি রাখা, তদন্ত প্রতিবেদন নির্দিষ্ট সময়ে প্রকাশ করা এবং দায়িত্বে অবহেলার জন্য দায়ী কর্মকর্তার বিভাগীয় শাস্তি নিশ্চিত করার মত বিষয়গুলো আইনের অন্তর্ভুক্ত করা উচিৎ। 

শুধু শাস্তি দিয়ে এই অপরাধ থামবে না। প্রশ্নপত্র এনক্রিপ্টেড ডিজিটাল মাধ্যমে কেন্দ্রে পাঠানো ও পরীক্ষার মুহূর্তে খোলা, একাধিক সেট থেকে পরীক্ষার দিন লটারির মাধ্যমে সেট নির্বাচন, প্রশ্ন ছাপা ও সংরক্ষণের প্রতিটি ধাপে সিসিটিভি ও অ্যাক্সেস লগ, এবং বড় পরিসরের নিয়োগ পরীক্ষার ক্ষেত্রে ক্রমান্বয়ে কম্পিউটারভিত্তিক পরীক্ষা চালু করা দরকার। সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন বিক্রির প্রচারণা দ্রুত বন্ধ করতে বিটিআরসি ও সাইবার ইউনিটের সঙ্গে স্থায়ী সমন্বয় থাকা উচিত।

পরিশেষে বলি, প্রশ্নফাঁসের শিকার একজন তরুণের সময়, টাকা ও স্বপ্ন কেউ ফেরত দিতে পারে না। এটি শুধু কোনো তরুণের নয়, পুরো একটি পরিবারকে হত্যা করার মতো অপরাধ। কেবল সরকারের সদিচ্ছাই নিশ্চিত করতে পারে যে এই অপরাধ আর সংগঠিত হবে, নাকি হবেনা। শনিবারের ঘটনায় জড়িতদের নাম প্রকাশ, দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই বলে দেবে জুলাই অভ্যুত্থানের স্পিরিট ও তরুণদের ভবিষ্যৎ রক্ষার সদিচ্ছা বর্তমান সরকারের মধ্যে আছে কিনা। দেশের তরুণরা মেধা আর পরিশ্রম দিয়ে লড়তে প্রস্তুত। তাঁদের চাওয়া শুধু একটি সৎ ও সমান সুযোগের মাঠ।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল: mdsohaib@cu.ac.bd