০৪ অক্টোবর ২০২৬, ২২:৩৫

শিক্ষকের পাশে দাঁড়ানো: ভবিষ্যৎ নির্মাণের দায়

লেখক মু. নূরুল্লাহ  © টিডিসি সম্পাদিত

একটি জাতির ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে সেই জাতি তার শিক্ষকদের কতটা মর্যাদা দেয়, কতটা মূল্যায়ন করে এবং শিক্ষকদের জন্য কেমন পরিবেশ নিশ্চিত করে তার ওপর। কারণ শিক্ষক কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান বিতরণ করেন না; তিনি একজন শিক্ষার্থীর চিন্তা, চরিত্র, মূল্যবোধ, স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাই শিক্ষককে যথার্থ অর্থেই বলা হয়—জাতি গঠনের কারিগর।

প্রতি বছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয়। শিক্ষকদের অবদান, অধিকার, মর্যাদা ও পেশাগত উন্নয়নের বিষয়টি বিশ্বব্যাপী সামনে নিয়ে আসাই এ দিবসের অন্যতম উদ্দেশ্য। কিন্তু একটি দিবস পালন করাই যথেষ্ট নয়; শিক্ষককে যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা দেওয়ার সংস্কৃতি রাষ্ট্র ও সমাজে বাস্তবভাবে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।

৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস। বিশ্বের কোটি কোটি শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর অবদানকে স্মরণ, সম্মান ও মূল্যায়নের দিন এটি। তবে বিশ্ব শিক্ষক দিবস কেবল শিক্ষকদের শুভেচ্ছা জানানোর আনুষ্ঠানিক দিন নয়; এটি শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষকতার মর্যাদা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নির্মাণে আমাদের সামষ্টিক দায়বদ্ধতা নতুন করে ভাবার দিন।

২০২৬ সালের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য—“Standing with teachers: 60 years of protecting the profession, advancing its status and shaping our futures”—অর্থাৎ ‘শিক্ষকের পাশে দাঁড়ানো: পেশাকে সুরক্ষা, মর্যাদা উন্নয়ন এবং আমাদের ভবিষ্যৎ নির্মাণে ৬০ বছর’। এ বছরের প্রতিপাদ্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ১৯৬৬ সালে গৃহীত ILO/UNESCO-এর শিক্ষকদের মর্যাদা-সংক্রান্ত সুপারিশের ৬০ বছর পূর্ণ হচ্ছে। এই আন্তর্জাতিক দলিলে শিক্ষকদের অধিকার, দায়িত্ব, পেশাগত প্রস্তুতি, নিয়োগ, কর্মপরিবেশ ও মর্যাদা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছিল।

শিক্ষককে সম্মান মানে জাতির ভবিষ্যৎকে সম্মান করা।একটি জাতির ভবিষ্যৎ তার শ্রেণিকক্ষে তৈরি হয়। আজ যে শিশু বিদ্যালয়ের বেঞ্চে বসে আছে, আগামী দিনে সে-ই হয়তো দেশের বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, প্রশাসক, উদ্যোক্তা, নীতিনির্ধারক কিংবা শিক্ষক হবে। তার জ্ঞান, চিন্তা, মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের ভিত্তি নির্মাণে শিক্ষকের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

তাই শিক্ষক কেবল পাঠ্যবই পড়ানো একজন পেশাজীবী নন। শিক্ষক একজন মানুষ নির্মাতা, মূল্যবোধের বিকাশক এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের কারিগর। একজন প্রকৃত শিক্ষক শিক্ষার্থীর হাতে শুধু তথ্য তুলে দেন না; তাকে প্রশ্ন করতে শেখান, যুক্তি দিয়ে ভাবতে শেখান, সত্য অনুসন্ধান করতে শেখান এবং ভালো-মন্দের পার্থক্য অনুধাবন করতে সাহায্য করেন। তিনি শিক্ষার্থীর মধ্যে আত্মবিশ্বাস, মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও দেশপ্রেমের বীজ বপন করেন।

এ বছরের প্রতিপাদ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দগুলোর একটি হলো—Standing with teachers। অর্থাৎ শুধু শিক্ষককে অভিনন্দন জানানো নয়; শিক্ষকের পাশে দাঁড়ানো। কিন্তু প্রশ্ন হলো—শিক্ষকের পাশে দাঁড়ানো বলতে আমরা কী বুঝি?

শিক্ষকের পাশে দাঁড়ানো মানে তাঁর পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করা। মানসম্মত প্রশিক্ষণ ও গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করা। কর্মপরিবেশ নিরাপদ ও সম্মানজনক করা। অযৌক্তিক প্রশাসনিক চাপ কমানো। শিক্ষকদের মতামতকে শিক্ষা নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া। যোগ্যতা, দক্ষতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে পেশাগত অগ্রগতির সুযোগ তৈরি করা। UNESCO-এর ভাষায়, বর্তমান সময়ে শিক্ষকের মর্যাদা শুধু সামাজিক স্বীকৃতির প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে পেশাগত স্বায়ত্তশাসন, নীতিনির্ধারণে শিক্ষকের কণ্ঠস্বর, বেতন, কর্মঘণ্টা ও কর্মপরিবেশের মতো বিষয়ও গভীরভাবে যুক্ত।

অতএব, শিক্ষক দিবসে শিক্ষকের হাতে ফুল তুলে দেওয়ার পাশাপাশি তাঁর কণ্ঠস্বরও শুনতে হবে। শিক্ষককে নীতিনির্ধারণের অংশীদার করতে হবে। যে ব্যক্তি প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করেন, শিক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব সমস্যা সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা সবচেয়ে প্রত্যক্ষ। অথচ অনেক সময় শিক্ষা-সংক্রান্ত নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষককে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় অংশীদার করা হয় না। শিক্ষা সংস্কার সফল করতে হলে শিক্ষকদের শুধু নীতির বাস্তবায়নকারী হিসেবে দেখলে চলবে না; তাঁদের নীতি প্রণয়ন ও সংস্কারের অংশীদার করতে হবে। কারিকুলাম পরিবর্তন, মূল্যায়ন পদ্ধতি, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তির ব্যবহার, শিক্ষা প্রশাসন কিংবা শিক্ষার্থীর মানসিক ও সামাজিক বিকাশ—প্রতিটি ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের শিক্ষকের অভিজ্ঞতা নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হতে পারে।

শিক্ষককে বাদ দিয়ে শিক্ষার উন্নয়ন সম্ভব নয়। প্রযুক্তির যুগে শিক্ষক আরও গুরুত্বপূর্ণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা Artificial Intelligence-এর বিস্তারের ফলে জ্ঞান এখন মানুষের হাতের মুঠোয়। একজন শিক্ষার্থী কয়েক সেকেন্ডেই হাজারো তথ্য খুঁজে পেতে পারে। এই বাস্তবতায় কেউ কেউ মনে করতে পারেন, প্রযুক্তি হয়তো একদিন শিক্ষকের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দেবে।

বাস্তবতা বরং বিপরীত। প্রযুক্তি তথ্য দিতে পারে, কিন্তু বিবেক তৈরি করতে পারে না। AI উত্তর দিতে পারে, কিন্তু সবসময় সঠিক প্রশ্ন করতে শেখাতে পারে না। ইন্টারনেট জ্ঞানভাণ্ডার খুলে দিতে পারে, কিন্তু কোন তথ্য সত্য, কোনটি বিভ্রান্তিকর এবং কোন তথ্য নৈতিকভাবে ব্যবহার করা উচিত—এই বিচারবোধ গড়ে তুলতে মানুষের প্রয়োজন। সেখানেই শিক্ষকের অনন্য ভূমিকা। আগামী দিনের শিক্ষককে তাই শুধু বিষয়জ্ঞানসম্পন্ন হলেই চলবে না; তাঁকে হতে হবে প্রযুক্তিবান্ধব, গবেষণামুখী, সৃজনশীল এবং নৈতিক নেতৃত্বের অধিকারী।

শিক্ষকের দায়িত্বও কম নয়। শিক্ষকের অধিকার ও মর্যাদার কথা বলার পাশাপাশি শিক্ষকের দায়িত্বের কথাও বলতে হবে। একজন শিক্ষককে হতে হবে আজীবন শিক্ষার্থী। জ্ঞান স্থির নয়; প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। ফলে শিক্ষককে নিয়মিত পড়তে হবে, গবেষণা করতে হবে, নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে জানতে হবে এবং নিজের শিক্ষাদান পদ্ধতিকে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন করতে হবে। এর পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নৈতিকতা। একজন শিক্ষক যদি সত্যবাদিতা, সময়নিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ, ন্যায়পরায়ণতা ও মানবিকতার চর্চা করেন, শিক্ষার্থীরা তা থেকে বাস্তব শিক্ষা পায়। কারণ শিক্ষার্থীরা শুধু শিক্ষকের কথা শোনে না; তারা শিক্ষকের আচরণও পর্যবেক্ষণ করে। একজন শিক্ষকের একটি আচরণ কখনো কখনো একটি বইয়ের বহু পৃষ্ঠার চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলতে পারে।

বাংলাদেশে শিক্ষকতা ঐতিহ্যগতভাবে একটি মর্যাদাপূর্ণ পেশা। কিন্তু এই মর্যাদাকে আরও সুদৃঢ় করার জন্য আমাদের বাস্তব পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে শিক্ষকের পেশাগত উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, গবেষণা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও কর্মপরিবেশকে গুরুত্ব দিতে হবে। শিক্ষকদের প্রশাসনিক ও অপ্রাসঙ্গিক কাজের চাপ কমিয়ে তাঁদের মূল পেশাগত দায়িত্ব—শিক্ষাদান, গবেষণা ও শিক্ষার্থীর বিকাশ—এর জন্য পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে।

বিশেষ করে উচ্চশিক্ষায় গবেষণার পরিবেশ আরও শক্তিশালী করা জরুরি। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শুধু পাঠদানকারী নন; তিনি নতুন জ্ঞান সৃষ্টিরও একজন প্রধান কারিগর। একই সঙ্গে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষককে শুধু ‘শিক্ষাদানকারী কর্মী’ হিসেবে না দেখে একজন পূর্ণাঙ্গ পেশাজীবী হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বিশ্ব শিক্ষক দিবসে আমরা শিক্ষকদের অভিনন্দন জানাব, তাঁদের সম্মাননা দেব—এটি অবশ্যই প্রয়োজন। বাংলাদেশেও বিশ্ব শিক্ষক দিবস এখন জাতীয়ভাবে পালিত হচ্ছে এবং ২০২৬ সালে জাতীয় পর্যায়ে ১০০ জন শিক্ষককে সম্মাননা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে সম্মাননা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিদিনের সম্মান। একজন শিক্ষক যেন শ্রেণিকক্ষে মর্যাদা নিয়ে দাঁড়াতে পারেন, গবেষণায় সময় দিতে পারেন, নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারেন, পেশাগতভাবে বিকশিত হতে পারেন এবং শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নিরাপদ ও অনুপ্রেরণাদায়ী পরিবেশ তৈরি করতে পারেন—সেটিই হওয়া উচিত আমাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য।

আমরা যদি উন্নত বাংলাদেশ চাই, তাহলে শুধু উন্নত ভবন, আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা নতুন কারিকুলাম দিয়ে হবে না। আমাদের প্রয়োজন দক্ষ ও নৈতিকতা সম্পন্ন শিক্ষক। আমাদের এমন শিক্ষক প্রয়োজন, যিনি Academic Leader হিসেবে জ্ঞান সৃষ্টি ও বিতরণ করবেন এবং Moral Leader হিসেবে শিক্ষার্থীর সামনে আদর্শ হয়ে দাঁড়াবেন। আমাদের এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, যেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়েই প্রশ্ন করতে পারবেন, গবেষণা করতে পারবেন, ভুল থেকে শিখতে পারবেন এবং নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারবেন। আমাদের এমন শিক্ষানীতি প্রয়োজন, যেখানে শিক্ষককে পরিবর্তনের বাধা নয়, পরিবর্তনের প্রধান অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

বিশ্ব শিক্ষক দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য আমাদের একটি মৌলিক সত্য স্মরণ করিয়ে দেয়—শিক্ষকের ভবিষ্যৎ নিরাপদ না হলে শিক্ষার ভবিষ্যৎও নিরাপদ নয়।

তাই শিক্ষককে শুধু দিবসের শুভেচ্ছায় সীমাবদ্ধ না রেখে তাঁর মর্যাদা, অধিকার, পেশাগত স্বাধীনতা, দক্ষতা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষকদেরও নিজেদের জ্ঞান, দক্ষতা, গবেষণা ও নৈতিক নেতৃত্বের মান ক্রমাগত উন্নত করতে হবে। কারণ শিক্ষক শুধু বর্তমান প্রজন্মকে পড়ান না; তিনি আগামী প্রজন্মের বাংলাদেশ নির্মাণ করেন।

৫ অক্টোবর তাই শুধু শিক্ষকদের জন্য একটি দিবস নয়—এটি পুরো জাতির জন্য একটি প্রশ্নের দিন; আমরা যে ভবিষ্যৎ চাই, সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য কি আমরা আমাদের শিক্ষকদের যথেষ্ট মর্যাদা, স্বাধীনতা ও সমর্থন দিচ্ছি?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আমাদের শিক্ষার ভবিষ্যৎ, আর শিক্ষার ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। সকল শিক্ষককে জানাই শুভেচ্ছা ও আন্তরিক শ্রদ্ধা। বিশ্ব শিক্ষক দিবস সফল ও সার্থক হোক।।

লেখক: শিক্ষক, গবেষক ও সংগঠক
ইমেইল: nurullahbd92@gmail.com