বেকারত্ব কমবে কোন পথে?
পৃথিবীর যেকোনো দেশের চেয়ে আয়তনের তুলনায় বাংলাদেশের জনসংখ্যা অনেক বেশি। এ বিশাল জনসংখ্যাকে দক্ষ করার মধ্য দিয়ে জনশক্তিতে রুপান্তর করার কোনো বিকল্প নেই। জনসংখ্যাকে দক্ষ করার ব্যাপারে অনেক দেশ থেকে আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছি। আমাদের কর্মমুখী শিক্ষা বা কারিগরি শিক্ষাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতে হবে।
যাঁরা কাজ করার উপযুক্ত বয়স ও সামর্থ্য আছে এবং কাজ করার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও উপযুক্ত কাজ পান না, তাঁদের সাধারণত বেকার বলা হয়। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক বা স্নাতকোত্তর পাস করার পরও যাঁরা চাকরি বা কাজের সুযোগ পাচ্ছেন না, তাঁদেরকে শিক্ষিত বেকার হিসেবে গণ্য করা হয়। অনেক শিক্ষিত তরুণ আবার নিজের ইচ্ছামাফিকই বেকার থাকছেন। কারণ তাঁর পড়াশোনা অনুযায়ী নিজের প্রত্যাশার চাকরি পাচ্ছেন না।
একজন মানুষ যখন উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন, তখন তাঁর প্রত্যাশা বা আকাঙ্ক্ষাগুলো বড় হতে থাকে। এমনটা হওয়া স্বাভাবিক, এটা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। তবে এ সমস্যাটা আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের মানুষের মধ্যে বেশি দেখা যায়। উন্নত দেশে এমনটা দেখা যায়না। উন্নত দেশে কাজের ক্ষেত্রে তেমন কোনো ভেদাভেদ বা পার্থক্য নেই। দেখা যায়, অফিসের প্রধান ব্যক্তিও চা বানিয়ে অন্য সহকর্মীর জন্য পরিবেশন করছেন। এর ফলে তাঁদের মধ্যে আন্তরিকতাও বাড়ে। কাজকে তাঁরা উপভোগ করেন। কিন্তু আমাদের দেশে তো এমনটা দেখা যাওয়া দুষ্কর। আমাদের অস্থিমজ্জায় এখনো ঔপনিবেশিক মানসিকতা রয়েছে। আর যতদিন এ মানসিকতা থেকে বের হতে না পারব, জাতি হিসেবে অগ্রসর হওয়া ততো বেশি সময় লাগবে।
শিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের পলিসিগুলো যত দ্রুত এবং যুগোপযোগী হবে, তত তাড়াতাড়ি আমাদের সমস্যাগুলোও কমবে। সবাই উচ্চশিক্ষিত হতে চায়।আমাদের সবার তো উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করার দরকার নেই। আমাদের দেশে শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের মনে এমন ধারণা হয়েছে যে, সন্তানকে উচ্চশিক্ষিত হতেই হবে, মানে মাস্টার্স পাশ করতে হবে। তা নাহলে সমাজে জাত থাকবেনা৷ সেক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করার মতো যোগ্যতা বা মেধাকে আমরা বিবেচনায় নিচ্ছিনা।
কোনোমতে মাস্টার্স পাশ করে সে বেকারই থাকছে। এর ফলে কারও লাভ হচ্ছেনা। বেকার থেকে সে যেমন পরিবারের জন্য বোঝা, তেমনি দেশের জন্যও মাথাব্যাথার কারণ। সে যদি কর্মমুখী বা কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করত, তাহলে তাঁর বেকার থাকতে হতোনা। কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করে আমি অন্তত কাউকে বেকার থাকতে দেখিনি। চাকরির বাজারে তাঁদের যেমন চাহিদা আছে, তেমনি তাঁদের স্বপ্নটাও পড়াশোনা অনুযায়ী সীমিত।
এটা ঠিক বাংলাদেশে বেকারত্বের হার অনেক বেশি। উচ্চশিক্ষিতরাই বেশি বেকার থাকছেন। আমরা যে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে অফিসিয়াল কাজ করি, সেজন্য কোটি কোটি উচ্চশিক্ষিত তরুণের দরকার নেই। আমাদের চাহিদা কম কিন্তু যোগান বেশি। আবার কারিগরি শিক্ষায় দেশে ও বিদেশে চাহিদা বেশি কিন্তু যোগান কম। কারিগরি শিক্ষা বা কর্মমুখী শিক্ষাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতে হবে।
কারণ উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেও কোনো ব্যবহারিক কাজ না জানলে চাকরির বাজারে কোনো মূল্য নেই। তাই কর্মমুখী শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেশি গড়ে তুলতে হবে। দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার জন্য ইউনিয়ন পর্যায়ে পর্যন্ত কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা দরকার। কর্মমুখী শিক্ষার প্রসার বাড়াতে সরকার কাজও করছে। ২০ কোটি মানুষের দেশের জনশক্তিকে কর্মদক্ষ করে সম্পদে পরিণত করতে হবে। এদেশের কমপক্ষে ৫ কোটি মানুষকে দক্ষ করে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে। দক্ষ হয়ে শ্রমিক হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করলেও তাঁদের উপার্জন ২ থেকে ৩ গুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে। কারণ দক্ষ জনবলের সারা দুনিয়াতেই চাহিদা আছে।
বেকার সমস্যা সমাধানের জন্য ব্যক্তি পর্যায়েও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা দরকার। আমাদের দেশের ধনীরা বিশাল বিশাল শপিং সেন্টার বানায়, যাতে বেশি লাভবান হওয়া যায়। কিন্তু তাঁরা তরুণদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ব্যাপারে অনীহা বোধ করেন। কর্মমুখী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য শিল্পপতিদেরও এগিয়ে আসতে হবে। সরকার একা সব সমস্যার সমাধান দ্রুতই করতে পারবেনা, এটা সম্ভবও না।
বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন অনুমোদিত ও নিবন্ধিত কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৯,৪০০টি। এর মধ্যে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ, বিএমটি কলেজ ইত্যাদি। এর মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তাছাড়া একজন ছাত্র যখন উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন, তখন তাঁর স্বপ্নও বড় হতে থাকে। তুলনামূলক ছোট চাকরি সে করতে চায়না। যদিও প্রতিযোগিতামূলক বাজারে দক্ষ না হলে তাঁর তেমন কোনো গুরুত্ব নেই।
বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ৩৬ শতাংশ। অর্থাৎ, চাকরির বাজারে প্রবেশ করা প্রতি ১০০ জন তরুণের মধ্যে প্রায় ৩৬ জনই বেকার থাকছেন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।
আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, দেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার সামগ্রিক যুব বেকারত্বের হারের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের নিয়ে করা বিশ্লেষণে সামগ্রিক যুব বেকারত্বের হার প্রায় ১০ শতাংশ।
আইএমএফের ‘ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ সাময়িকীর সেপ্টেম্বর সংখ্যায় এ গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়েছে। এশিয়ায় যুব বেকারত্ব নিয়ে করা গবেষণায় সংস্থাটি জানিয়েছে, পুরো এশিয়াজুড়েই যুব বেকারত্বের হার বেশি। তবে সবচেয়ে বেশি বেকারত্ব দেখা যাচ্ছে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে।
দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশের তুলনায় উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব সবচেয়ে বেশি শ্রীলঙ্কায়, প্রায় ৪৩ শতাংশ। এরপর ভারতে প্রায় ৪২ শতাংশ এবং বাংলাদেশে প্রায় ৩৬ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশিরভাগ দেশের হার এ তিন দেশের চেয়ে কম।
লেখক: মো. বাবুল হোসেন
উপপরিচালক (জনসংযোগ)
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়