মক্কা ডিফেন্স প্যাক্ট: শুধুমাত্র প্রতিরক্ষা নয়, মুসলমানদের জন্যে একটি আবেগীয় বিষয়
২০২৬ সালের ৭ আগস্ট সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি (Makkah Joint Defence Agreement) স্বাক্ষর করে। মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা সংকট, আঞ্চলিক সংঘাত এবং যৌথ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা থেকেই এ ঐতিহাসিক চুক্তির জন্ম। যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা ও জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়। এই পরিস্থিতিতে তিন দেশ দীর্ঘদিনের সামরিক সহযোগিতাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে মক্কায় সম্মেলনের মাধ্যমে চুক্তি স্বাক্ষর করে যা মক্কা চুক্তি নামে সমধিক পরিচিতি লাভ করে। এই চুক্তি সারা বিশ্বের মুসলমানদের মধ্যে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মুসলমানদের ধর্মীয় আবেগে নাড়া দিয়েছে। কারণ মুসলমানদের পবিত্র ভূমি মক্কা ও মদীনা বিদেশী আক্রমণের হুমকির মধ্যে পড়েছে। মক্কা ও মদীনা রক্ষা করা যে মুসলমানদের উপর ফরজ বা অবশ্য কর্তব্য, জেহাদের শামিল। মক্কা ও মদীনা রক্ষার জন্যে তারা প্রাণ দিতেও যে কুন্ঠাবোধ করে না। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে কারো পক্ষে মক্কা বা মদীনায় গিয়ে শত্রুপক্ষের সাথে যুদ্ধ করা সম্ভব নয়। তাই এখানকার ধর্মপ্রাণ মানুষ যখন শুনেছে বাংলাদেশ সোদি আরব ও অন্য মুসলিম রাষ্ট্র তুরস্ক এবং পাকিস্তানের সাথে প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে তখন সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে যথেষ্ট আবেগ ও উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা গিয়েছে। হাটে-বাজারে, পাড়া-মহল্লা, মসজিদ মাদ্রাসা সর্বত্র মক্কা চুক্তি নিয়ে মানুষকে কথা বলতে শোনা যাচ্ছে। বাংলাদেশের মুসলমানের কাছে মক্কা ও মদিনা ইসলামের পবিত্রতম স্থান। তাই এই স্থানগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে তাদের গভীর ধর্মীয় আবেগ থাকা স্বাভাবিক। অনেকেই মনে করেন, পবিত্র নগরীগুলোকে রক্ষা করা একটি ধর্মীয় কর্তব্য। চুক্তির পর তিন দেশ একটি স্থায়ী সচিবালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটির প্রথম বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে। ফলে তাদের প্রতিরক্ষা সমন্বয় আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোয় একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন অধ্যায়।
এই চুক্তির লক্ষ্য হচ্ছে -
- যেকোনো বহিরাগত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
- একটি সদস্য রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে সেটিকে তিন দেশের সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচনা করা।
- সামরিক প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য, প্রতিরক্ষা শিল্প ও প্রযুক্তিতে সহযোগিতা বৃদ্ধি।
- আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা জোরদার করা।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, হঠাৎ-ই এই তিনটি দেশ এই ধরনের চুক্তিতে একমত হয়নি। ২০২৩ সালে গাজা-ইসরায়েল যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতেই এই চুক্তি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি আরব ও পাকিস্তান পারস্পারিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। তারই ধারাবাহিকতাই এই মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি। এই চুক্তি নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে নানা আলোচনা চলছে। এমন প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি এই প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। তবে, এই মক্কা প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশ যুক্ত হওয়া নিয়ে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরনের বক্তব্যই পাওয়া গেছে। কারও মতে, এই প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশে যুক্ত হলে তা সামরিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক দিক থেকেও লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকবে।
কিন্তু মক্কা ও মদিনার পবিত্রতা রক্ষা এবং সৌদি আরব রাষ্ট্রকে সামরিকভাবে রক্ষা করা—এ দুটি একই বিষয় নয়। ইসলামী শরিয়তে পবিত্র স্থানগুলোর মর্যাদা অটুট রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের পক্ষে সামরিক অংশগ্রহণের বাধ্যবাধকতা নিয়ে আলেমদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের দৃষ্টিকোণ থেকে, বিদেশে সামরিক সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত ধর্মীয় আবেগের পাশাপাশি সংবিধান, জাতীয় স্বার্থ, আন্তর্জাতিক আইন ও সরকারের নীতির ভিত্তিতেও নির্ধারিত হয়। সংক্ষেপে বলা যায়, মক্কার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা বহু মুসলমানের ধর্মীয় অনুভূতির অংশ; কিন্তু সেই অনুভূতি থেকে ভবিষ্যতে কোনো সামরিক দায়িত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে সৃষ্টি হয় কি না—এটি ধর্মীয় ও রাষ্ট্রনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই বিতর্কিত এবং একক সিদ্ধান্ত নয়। এটি মূলত ধর্মীয় বিশ্বাস, নৈতিক দায়িত্ব ও রাষ্ট্রনীতির সংযোগস্থলের একটি প্রশ্ন। তাই বিষয়টি আলাদা করে দেখা দরকার।
মহানবী হযরত মুহম্মদ (স) তাঁর জীবনে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি করেছিলেন। তবে “মক্কা চুক্তি” নামে সমসাময়িক যে আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা চুক্তির কথা বলা হয়, তার সঙ্গে হুবহু মিল রয়েছে—এমন কোনো চুক্তি ইসলামের প্রাথমিক যুগে ছিল না।
সবচেয়ে কাছাকাছি ঐতিহাসিক উদাহরণগুলো হলো:
- হুদায়বিয়ার সন্ধি (৬২৮ খ্রি./৬ হিজরি): কুরাইশদের সঙ্গে ১০ বছরের শান্তিচুক্তি; এটি যুদ্ধবিরতি ও নিরাপদ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার চুক্তি ছিল।
- মদিনা সনদ (৬২২ খ্রি./১ হিজরি): মদিনার মুসলিম, ইহুদি ও অন্যান্য গোত্রের মধ্যে পারস্পরিক নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও সম্মিলিত প্রতিরক্ষার সামাজিক-রাজনৈতিক চুক্তি।
অতএব, যদি প্রশ্নটি পারস্পরিক নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষার আদলে কোনো চুক্তি নিয়ে হয়, তাহলে মদিনা সনদ ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক; আর শান্তিচুক্তির উদাহরণ হিসেবে হুদায়বিয়ার সন্ধি সর্বাধিক পরিচিত।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা আদিকাল থেকে নিয়ে আজ অব্দি এহেন অসংখ্য প্রতিরক্ষা চুক্তির উদাহরণ খুঁজে পাই।
মক্কা চুক্তি বাংলাদেশের জন্য সুযোগ, না ঝুঁকি
পূর্বেই বলা হয়েছে, মক্কা মুসলমানদের কাছে শুধু একটি শহর নয়; এর ধর্মীয় ও প্রতীকী গুরুত্ব গভীর। ফলে ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান সেখানে যখন মক্কা জয়েন্ট ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট বা ‘মক্কা চুক্তি’ স্বাক্ষর করল, তখন ঘটনাটি একটি সাধারণ সামরিক সমঝোতার সীমা ছাড়িয়ে যায়।
চুক্তিটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র আক্রমণকে সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। এই ভাষা স্বাভাবিকভাবেই ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। সে কারণেই ইতিমধ্যে কেউ কেউ একে ‘মুসলিম ন্যাটো’ বা ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এখানে ভারতের প্রভাব সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবে ’৭৫-এর পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এবং সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে জিয়াউর রহমান কোনো সামরিক জোটে না গিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে নিয়ে সার্ক নামের একটি জোট গঠন করার উদ্যোগ নেন। এটিও ছিল একটি দুর্দান্ত আইডিয়া। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, আফ্রিকান ইউনিয়ন, আসিয়ান ইত্যাদির মতো একটি জোটে থাকলে বিশেষ মর্যাদা পাওয়া যায়, নিজস্ব প্রতিরক্ষাবলয়ও গড়ে ওঠে। একইসঙ্গে তিনি ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা ওআইসিকেও শক্তিশালী হিসাবে উপস্থাপন করেছিলেন। ওই সময়ের জন্য এটি দারুণ কার্যকর পন্থা। খালেদা জিয়ার আমলেও সার্ককেন্দ্রিক প্রয়াস ছিল। ভারত নিজের একক প্রাধান্য বিস্তার করতে গিয়ে সার্ককে অকার্যকর করে দেয়। ফলে বাংলাদেশকে এখন নতুন কিছু ভাবতেই হবে।
বাংলাদেশের নতুন সরকার স্বাধীনতা, সার্বভৌম দেশ হিসাবে মর্যাদা পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিয়েছে। এ প্রেক্ষাপটেই মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নটি সামনে এসেছে। এই জোটে যোগ দিলে কিছু সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে বাংলাদেশ। তবে প্রাপ্তিও কম হবে না। সার্বিক বিবেচনায় কিছু ঝুঁকি নিতে হতেই পারে।
মুসলিম বিশ্বের ঐতিহাসিক সামরিক জোট ‘মক্কা প্রতিরক্ষা জোট’-এ যোগদানের বিষয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন, সরকারি মহল, বিরোধী দল এবং সাধারণ মানুষ অভূতপূর্ব ঐক্য প্রদর্শন করছেন। সরকার, বিরোধী দল ও জনসাধারণ: সব পক্ষই এ প্যাক্টকে বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতি, জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক বলে মনে করছেন। বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারতের দীর্ঘদিনের ‘চোখ রাঙানি’ ও বাংলাদেশকে ‘ছোট করার’ অপচেষ্টার বিরুদ্ধে এ জোট বাংলাদেশের জন্য এক শক্তিশালী ঢাল হিসেবে কাজ করবে বলে বিশ্লেষকরা মত দিচ্ছেন। মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশের শক্তিশালী অবস্থান তৈরি হবে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতৃত্ব: সবার কণ্ঠেই এখন একই সুর, এ জোট বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে আরো সুরক্ষিত ও সমৃদ্ধ করবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে ইরানের বিরুদ্ধে সউদী আরব যেতে না পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। অবশ্য আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. এম শহীদুজ্জামান বলেছেন, মুসলিম বিশ্বে নিজেকে রাখতে এক সময় ইরানও মক্কা প্যাক্টে ক্রিয়াশীল পার্টনার হতে পারে।
মক্কা প্যাক্টে বাংলাদেশের যোগদান নিয়ে ভারতকে অহেতুক আতঙ্কিত না হওয়ার বার্তা দিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, মক্কা প্রতিরক্ষা জোট কোনো হুমকি নয়, আত্মরক্ষা। এতে ভারতের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। এ প্যাক্ট মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এটা কাউকে হুমকি দেয়ার জন্য নয়; বরং আত্মরক্ষার বিষয়। এতে ভারতসহ কারো বিচলিত-উৎকন্ঠিত হওয়ার কারণ নেই।
সরকারি পক্ষ থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান গত ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদে স্পষ্ট করে বলেছেন, মক্কা প্রতিরক্ষা জোট হচ্ছে বিশ্ব মুসলিম সমাজের আত্মরক্ষার একটা ব্যবস্থা এবং এটা আমাদের মুসলিম পরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এই জোটে বাংলাদেশের যোগদানের বিষয়টি সদস্য দেশগুলোর অভিপ্রায়ের ওপর নির্ভর করছে এবং তিনি এর পক্ষে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ২৪ ও ৩০ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জানান যে, মক্কা চুক্তিতে যোগ দিলে বাংলাদেশের কোনো ঝুঁকি নেই। ইসলামিক দেশগুলোর মধ্যে এমন একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থার সাথে যুক্ত হওয়া; বাংলাদেশের জন্য অস্বাভাবিক কিছু নয় এবং সরকার বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। একই সঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম ১ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ব্রিফিংয়ে বলেন, মক্কা প্যাক্টে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির ভিত্তিতেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে এবং দেশের জন্য অমঙ্গল হয় এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান ৩১ আগস্ট তার প্রকাশিত মতামতে জানান যে, সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবং এর প্রভাবগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মূল্যায়ন করে সরকার এ জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। তিনি এ জোটের প্রতি সরকারের আগ্রহের কথা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন।
বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান তার ফেসবুক পেজে এক দীর্ঘ বার্তায় সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের সাথে একাত্মতা পোষণ করেছেন। তিনি মক্কা প্রতিরক্ষা জোটকে একটি সার্বভৌম এবং অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, মুসলিম দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে এমন আত্মরক্ষামূলক জোট গঠন খুবই স্বাভাবিক এবং এতে বাইরের কোনো পক্ষের বিরক্ত হওয়ার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। তাঁর মতে, এই জোট বাংলাদেশের স্বার্থেই কাজ করবে এবং এটি দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে। তিনি আরো বলেন, মুসলিম উম্মাহর ঐক্য ও শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমেই বিশ্বদরবারে ইসলামি দেশগুলোর অবস্থান আরো সুদৃঢ় হবে এবং বাংলাদেশ সেই ঐক্যের অংশ হয়ে গর্বিত হবে। তাঁর এই বক্তব্য বিরোধী দলের পক্ষ থেকেও এই জোটের প্রতি পূর্ণ সমর্থন রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।
সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই জোটকে ঘিরে ব্যাপক উৎসাহ ও সমর্থন লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে ভারতের দীর্ঘদিনের আধিপত্যবাদী মনোভাব ও বাংলাদেশকে বিভিন্ন বিষয়ে চাপ দেওয়ার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে এই জোটকে তারা এক কার্যকর প্রতিরোধ হিসেবে দেখছেন। ভারতের সাথে বাংলাদেশের ৪,৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত ও গভীর অর্থনৈতিক নির্ভরতা থাকলেও, মক্কা প্যাক্টের সদস্য তুরস্ক, সউদী আরব ও পাকিস্তানের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর সাথে জোটবদ্ধ হওয়ায় বাংলাদেশ এখন আর কোনো একক পরাশক্তির চাপে পড়বে না বলে মনে করছেন তারা। সাধারণ মানুষ মনে করছেন, এই জোট বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে আরো মর্যাদাসম্পন্ন অবস্থানে নিয়ে যাবে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর কোনো ধরনের চোখ রাঙানি বা হুমকি এখন আর বাংলাদেশের ওপর প্রভাব ফেলতে পারবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক বিভাগের সাবেক শিক্ষক আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. এম শহীদুজ্জামান বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা জোট বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ। এ প্যাক্টে যোগদান করলে বাংলাদেশ সম্মানিত হবে। মক্কা প্রতিরক্ষা জোট সউদী আরবের জনমুখী চিন্তাধারা, তুরস্কের প্রগতিশীলতা এবং পাকিস্তানের হিন্দুত্বাবাদী ভারতকে আতঙ্কে রাখার ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বাংলাদেশে এ প্যাক্টে যাওয়া উচিত। বাংলাদেশ মক্কা প্যাক্টে যায় চীন সেটা চাইবে। মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ইরানের আক্রমণের কারণে এ প্যাক্ট এখন বাস্তবতা। বাংলাদেশ এ প্যাক্টে গেলে ভূরাজনীতিতে মর্যাদা বাড়বে। এ প্যাক্ট মধ্যপ্রাচ্যে নিউ অর্ডার তৈরি করেছে। মুসলিম দেশগুলো এ প্যাক্টে ঐক্যবদ্ধ হলে ইরান কিন্তু ভিলেনের ভূমিকায় থাকবে না। পরিস্থিতি এমন হয়তো হবে ইরান ক্রিয়েটিভ পার্টনার হিসেবে প্যাক্টে থাকবে। দীর্ঘ দেড় যুগ বাংলাদেশ যে নিরাপত্তা ঘাটতিতে রয়েছে এ প্যাক্টে গেলে সার্বভৌমত্ব রক্ষার আত্মবিশ্বাস বাড়বে। মিসর ও বাংলাদেশকে ইতোমধ্যেই মক্কা প্যাক্টে যোগদানের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আমার মনে হচ্ছে বাংলাদেশ মক্কা প্যাক্টের ৫-৬ নম্বর সদস্য হবে। ভবিষ্যতমুখী ইসলামী দেশগুলো এক সময় মক্কা প্যাক্টে ঐক্যবদ্ধ হবে। ওআইসি ফেইল করলেও মক্কা প্রতিরক্ষা জোট ফেইল করবে না।
এমনকি দিল্লির চেতনায় বিশ্বাসী আওয়ামী লীগ অনুগত সাংবাদিক হিসেবে পরিচিত আনিস আলমগীর বলেন, মক্কা জোটে গেলে সুবিধা হলো তুরস্কের প্রযুক্তি এনে প্রশিক্ষণ দিয়ে দেশের নিরাপত্তা জোরদার করার সুযোগ রয়েছে। তবে আমরা অলিক স্বপ্ন দেখছি এ জোটে গেলে মোদির ঘুম হারাম হবে। ইসলামী ন্যাটোতে চলে যাওয়ার অসুবিধা হচ্ছে অন্যের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া। ভারতের ওপর যেকোনো সময় পাকিস্তান আক্রমণ করতে পারে, তখন বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে? জোটে গেলে বাংলাদেশের সমস্যা হবে। সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে। তবে জোটনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হয়ে থাকাই শ্রেয়।
মুসলিম দেশগুলোর ‘মক্কা সামরিক জোট’ বাংলাদেশের জন্য যে সুবিধাগুলো বয়ে আনতে পারে, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:জ্বালানি খাতে সউদী আরবের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তেল ও এলএনজি সরবরাহের নিশ্চয়তা, তুরস্কের সাথে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও বাণিজ্য সহযোগিতা এবং পাকিস্তানের সাথে সামরিক প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বহু গুণ বৃদ্ধি পাবে। সউদী আরবের ভিশন ২০৩০-এর মেগা প্রকল্পে বাংলাদেশি কর্মীদের অগ্রাধিকার এবং রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির সম্ভাবনাও এই জোটকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে। রোহিঙ্গা সংকটে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি এবং বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা রক্ষায়ও এই জোট বাংলাদেশকে সাহায্য করবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তুরস্কের অত্যাধুনিক ড্রোন, যুদ্ধজাহাজ ও সামরিক প্রযুক্তি বাংলাদেশ সহজলভ্য ও সুলভ মূল্যে পেতে পারবে এবং যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হতে পারে, যা দেশের প্রতিরক্ষা খাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।
জানতে চাইলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রফেসর সাহাব এনাম খান বলেন, এই প্যাক্ট বাংলাদেশকে সামরিক নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক দিক থেকে বড় ধরনের সুবিধা দিতে পারে। তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, সউদী আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সাথে সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশ বিমান প্রতিরক্ষা এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার প্রযুক্তি উন্নত করার সুযোগ পাবে, যা দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিকায়নে সহায়ক হবে। ব্রুনাই দারুসসালাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এ কে এম আহসান উল্লাহ গত ৩০ আগস্ট মতামত দেন এই বলে যে, মক্কা প্রতিরক্ষা জোট যদি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বাড়ায়, তবে এটি অত্যন্ত ইতিবাচক। তিনি মনে করেন, এই জোট বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে একটি শক্তিশালী অবস্থান প্রদান করবে।
সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ও ঢাকার সাবেক ডেপুটি চিফ অব মিশন জন এফ ড্যানিলোভিচ ৩১ আগস্ট ঢাকার কারওয়ান বাজারে ‘ভয়েস ফর রিফর্মের গোলটেবিল বৈঠকে’ মতামত ব্যক্ত করেন যে, মক্কা প্রতিরক্ষা জোট মূলত একটি প্রতিরক্ষামূলক জোট যা যৌথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তৈরি। তিনি উল্লেখ করেন যে, এই প্যাক্টের সদস্য দেশগুলোর সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বজায় থাকবে, অর্থাৎ কোনো এক দেশের ওপর হামলা হলে অন্য দেশ কীভাবে সাড়া দেবে তা সেই দেশের নিজস্ব সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে। এটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দেশের সার্বভৌমত্বকে সম্মান জানিয়ে একটি নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করে। অন্যদিকে, তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান সম্প্রতি ইস্তাম্বুলের এক বৈঠকে বাংলাদেশ ও মিসরকে প্যাক্টের সম্ভাব্য নতুন সদস্য হিসেবে আলোচনা করেছেন বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, যা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত সম্মানের বিষয়।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই জোটে যোগদানের মাধ্যমে বাংলাদেশ কেবল সামরিক সুবিধাই পাবে না, বরং অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও ব্যাপক অগ্রগতি সাধন করবে। তুরস্কের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ও শুল্কমুক্ত সুবিধার মাধ্যমে তৈরী পোশাক রফতানিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে। সউদী আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি আরামকো বাংলাদেশের তেল শোধনাগার এবং এলএনজি টার্মিনাল অবকাঠামো উন্নয়নে বড় অংকের বিনিয়োগ করতে পারে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনবে। পাকিস্তানের সাথে কাউন্টার-টেররিজম ও সাইবার নিরাপত্তায় অভিজ্ঞতা বিনিময় বাংলাদেশের নিরাপত্তা খাতে নতুন মাত্রা যোগ করবে। বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত পানিসীমায় বাংলাদেশের নৌবাহিনীর টহল ও নজরদারি ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, যা সমুদ্রে দস্যুতা রোধ এবং গভীর সমুদ্রের খনিজ সম্পদ রক্ষায় সহায়ক হবে।
জানতে চাইলে জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারি বলেন, মক্কা চুক্তির ব্যাপারে বিএনপি সরকার কিছু স্পষ্ট করেনি। সংবিধানে রয়েছে যেকোনো চুক্তি করতে হলে সংসদে আলোচনা করা উচিত। আওয়ামী লীগ এমন এক চুক্তি সউদী আরবের সঙ্গে করলে রাশেদ খান মেনন তা নিয়ে আলোচনার কথা তুলেছিল। কাজ হয়নি। তবে ভারত ও আমেরিকা না চাইলে বাংলাদেশ মক্কা প্যাক্টে যেতে পারবে বলে মনে হয় না। তবে ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, মক্কা চুক্তি হচ্ছে ইসলামী দেশগুলোর জন্য বাস্তবতা। ইসরাইল এখনই তুরস্কে আক্রমণের প্রচারণা চালাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মার্কিন ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিয়েছে ইরান। পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সাপে-নেউলে সম্পর্ক। ফলে তাদের এ জোটের প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশকে নিজের স্বার্থ ভাবতে হবে। বাংলাদেশের কেউ যাতে আক্রমণ করতে না পারে সেটা নিশ্চিত করে বেনিফিশিয়ারি কেমন হবে এবং জোটে গেলে কোথায় কোথায় থ্রেট আছে তা দেখতে হবে। বাংলাদেশের অস্তিত্বজনিত থ্রেট সৃষ্টি করছে ভারত। দিল্লি যে বাংলাদেশের সঙ্গে আচরণ করছে তাতে মক্কা চুক্তিতে যাওয়া উচিত। বাংলাদেশ এ জোটে গেলে ভারত আতঙ্কে থাকবে। এ জোটের নেপথ্যে যে যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ তারা মধ্যপ্রাচ্যের বন্ধু দেশগুলোর নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য সুবিধার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র সৌদি আরবের শ্রমবাজার। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী সৌদি আরবে যান। তাঁদের পাঠানো অর্থ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম উৎস। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রায় ১১ লাখ ১৭ হাজার বাংলাদেশি বিদেশে কর্মসংস্থানে গেছেন। তাঁদের মধ্যে ৭ লাখ ৫২ হাজারের বেশি সৌদি আরবে গেছেন (বাসস, ২০২৬)।
সৌদি আরবের সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগ বাড়লে শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। দক্ষ কর্মীদের জন্য নতুন খাত উন্মুক্ত করা, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা, চুক্তিভঙ্গ রোধ, মজুরি ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং প্রবাসী কর্মীদের আইনি সহায়তা বাড়ানোর বিষয়ে রিয়াদের সঙ্গে আলোচনা জোরদার করা সম্ভব হতে পারে। তবে কোনো প্রতিরক্ষা কাঠামোয় যুক্ত হলেই এসব সুবিধা নিশ্চিত হবে না। এর জন্য পৃথক শ্রমচুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি এবং কার্যকর কনস্যুলার ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন।
সৌদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও সম্ভাবনা রয়েছে। দেশটি তেলনির্ভরতা কমিয়ে অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি, খাদ্যনিরাপত্তা, পর্যটন ও প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশ রাজনৈতিক যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে সৌদি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আলোচনা বাড়াতে পারে। কিন্তু বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য বাংলাদেশের নিজস্ব প্রস্তুতি জরুরি। জমি, বিদ্যুৎ, করনীতি, বন্দর, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং চুক্তি বাস্তবায়নের সক্ষমতা উন্নত না হলে শুধু কূটনৈতিক ঘনিষ্ঠতা থেকে বড় বিনিয়োগ আসবে না।
তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতার সম্ভাবনা মূলত প্রতিরক্ষা প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও শিল্পে। ড্রোন, সাঁজোয়া যান, নৌপ্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা উৎপাদনে তুরস্কের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ইস্তাম্বুলের বৈঠকে তিন দেশের সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে আন্তকার্যক্ষমতা বাড়ানো এবং যৌথ উৎপাদন, গবেষণা ও উন্নয়নসহ প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে শুধু সরঞ্জাম কেনার দিকে না গিয়ে প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তি বিনিময়, যৌথ গবেষণা এবং দেশীয় শিল্পের সক্ষমতা তৈরিকে গুরুত্ব দিতে পারে। এতে দীর্ঘ মেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
আর পাকিস্তানের রয়েছে দক্ষিণ এশিয়া ও মুসলিম বিশ্বের রাজনীতিতে আলাদা অবস্থান। এই তিন দেশের সঙ্গে একই কাঠামোয় কাজ করার সুযোগ পেলে বাংলাদেশ মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ আরও বিস্তৃত করতে পারে।
মক্কা প্যাক্টের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক নেতৃত্ব নিয়ে উদ্বেগও কাজ করছে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (সিএফআর)-এর মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা অধ্যয়ন বিভাগের সিনিয়র ফেলো স্টিভেন এ কুকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি শেষ হয়ে যায়নি, কিন্তু তার নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা দুর্বল হয়েছে। ইরাক যুদ্ধ, সিরিয়া ও ইয়েমেনে সীমিত ভূমিকা, ২০১৯ সালের হামলার পর সৌদি আরবকে প্রত্যাশিতভাবে রক্ষা না করা এবং গাজা যুদ্ধকে ঘিরে নীতির অস্পষ্টতা আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে সন্দেহ তৈরি করেছে। ফলে তারা নিজেদের মধ্যে নিরাপত্তা সমন্বয় বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
মক্কা প্যাক্টে যুক্ত হলে বাংলাদেশের সম্ভাব্য লাভ শ্রমবাজার, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা প্রশিক্ষণ ও কূটনৈতিক যোগাযোগে সীমাবদ্ধ নয়, তবে এসব সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসবে না। পৃথক চুক্তি, দক্ষ কূটনীতি এবং বাস্তবায়ন পরিকল্পনা প্রয়োজন। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের লাভ নির্ভর করবে জোটে যোগ দেওয়ার ওপর নয়, বরং কী শর্তে যোগ দিচ্ছে, সামরিক দায়বদ্ধতা কতটা সীমিত রাখতে পারছে এবং অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুবিধাগুলোকে বাস্তব চুক্তিতে রূপ দিতে পারছে কি না, তার ওপর।
মক্কা প্যাক্টে যোগদানের বিষয়ে বাংলাদেশের সরকার, বিরোধী দল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ঐক্য দেখা যাচ্ছে, তা দেশের জাতীয় স্বার্থের প্রতি সবার গভীর ভালোবাসার প্রতিফলন। ভারতের দীর্ঘদিনের চোখ রাঙানি ও বাংলাদেশকে ছোট করার অপচেষ্টা এখন আর সফল হবে না। সরকারের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীর ইতিবাচক বক্তব্য, বিরোধী দলের সমর্থন এবং বিশেষজ্ঞ মহলের বিশ্লেষণ:সব মিলিয়ে এই জোট বাংলাদেশের জন্য এক অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে। এই জোট বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক মর্যাদাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে:এ বিষয়ে সবাই আশাবাদী। বাংলাদেশ এখন একটি নতুন কূটনৈতিক ও সামরিক যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে, যেখানে কোনো প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশকে ছোট করে দেখার বা হুমকি দেওয়ার সাহস পাবে না।
মক্কা প্যাক্টে যোগদানের বিষয়ে বাংলাদেশের সরকার, বিরোধী দল ও সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ঐক্য দেখা যাচ্ছে, তা দেশের জাতীয় স্বার্থের প্রতি সবার গভীর ভালোবাসার প্রতিফলন। ভারতের দীর্ঘদিনের চোখ রাঙানি ও বাংলাদেশকে ছোট করার অপচেষ্টা এখন আর সফল হবে না। সরকারের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও আইনমন্ত্রীর ইতিবাচক বক্তব্য, বিরোধী দলের সমর্থন এবং বিশেষজ্ঞ মহলের বিশ্লেষণ:সব মিলিয়ে এই জোট বাংলাদেশের জন্য এক অনন্য সুযোগ তৈরি করেছে। এই জোট বাংলাদেশের নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক মর্যাদাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে:এ বিষয়ে সবাই আশাবাদী। বাংলাদেশ এখন একটি নতুন কূটনৈতিক ও সামরিক যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে, যেখানে কোনো প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশকে ছোট করে দেখার বা হুমকি দেওয়ার সাহস পাবে না।
লেখক: উপদেষ্টা, গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান বিভাগ ও প্রক্টর, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এবং প্রাক্তন পরিচালক, বাংলাদেশ লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিপিএটিসি)