২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭:৫৭

কিশোর গ্যাং: সামাজিক সংকটের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও প্রতিকার

ড. মো. শিবলুর রাহমান  © টিডিসি সম্পাদিত

সাম্প্রতিক সপ্তাহে কুমিল্লার ১৩ বছরের স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মৃত্যুকে ঘিরে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তা কেবল একটি হত্যাকাণ্ডের সীমানা ছাড়িয়ে দেশজুড়ে ‘কিশোর গ্যাং’ বা গ্যাং কালচারের উত্থানকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে যে তথ্য উঠে এসেছে—আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা, বয়সে বড়দের সঙ্গে ‘অসম বন্ধুত্ব’, টিকটক ভিডিও তৈরির প্রলোভন—তা শুধু একটি ঘটনার বিবরণ নয়; এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক সমস্যার লক্ষণ।

এই লেখার উদ্দেশ্য হলো আবেগ বা রাজনৈতিক বিবৃতির ঊর্ধ্বে উঠে বস্তুনিষ্ঠ তথ্য, বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা এবং বাস্তবভিত্তিক প্রতিকারের দিকনির্দেশনা উপস্থাপন করা।

তথ্য কী বলছে?
কুমিল্লার এই ঘটনায় পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে; তাদের মধ্যে দুজন কিশোর (১৫ ও ১৬ বছর) এবং একজন তরুণ (১৯–২০ বছর)। নিহত অপ্রতিম ছিলেন সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী, যাকে স্কুল কর্তৃপক্ষ শান্ত ও পড়াশোনায় ভালো হিসেবে বর্ণনা করেছে। তদন্তে উঠে এসেছে ‘অসম বন্ধুত্ব’-এর বিষয়টি—অর্থাৎ ১৩ বছরের শিশুর সম্পর্ক ছিল নিজের চেয়ে ৫–১০ বছর বড় কিছু তরুণ-কিশোরের সঙ্গে, যাদের সঙ্গে সে ছবি তুলত, ভিডিও বানাত এবং ওঠাবসা করত।

ঢাকার মতো মহানগরীতে গত এক বছরে কিশোর গ্যাংয়ের সংখ্যা প্রায় ৩৫ শতাংশ বেড়ে ১৬০টিতে দাঁড়িয়েছে; সদস্য সংখ্যা ৩ হাজারেরও বেশি। জাতীয় পর্যায়ে ২০২২ সালে চিহ্নিত কিশোর গ্যাং ছিল ১৭৩টি, যা ২০২৪ সালে বেড়ে ২৩৭টি হয়েছে; এর মধ্যে রাজধানীতে এখনো সক্রিয় ১২৭টি গ্যাং। এসব গ্যাং ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, জমি দখল, হামলা এমনকি হত্যাকাণ্ডের মতো অপরাধে জড়িত বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে।

এই পরিসংখ্যান এবং ঘটনাবলি থেকে পরিষ্কার যে, কিশোর গ্যাং আর কেবল ‘পাড়া-মহল্লার ঝামেলা’ নয়; এটি একটি সুসংগঠিত, বহুমুখী অপরাধ নেটওয়ার্কে পরিণত হচ্ছে, যেখানে ছোট শিশুরাও লক্ষ্যবস্তু কিংবা সম্পৃক্ত হয়ে পড়ছে।

বিজ্ঞান কী বলে: কেন কিশোররা গ্যাংয়ে জড়ায়?

মস্তিষ্কের বিকাশ এবং ঝুঁকিগ্রহণের প্রবণতা
নিউরোসায়েন্স গবেষণায় দেখা গেছে, কৈশোরে মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স—যা সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিণাম মূল্যায়নের জন্য দায়ী—পূর্ণাঙ্গভাবে বিকশিত হয় না। অন্যদিকে, রিওয়ার্ড সিস্টেম বা পুরস্কার-কেন্দ্রিক অংশ এই সময়ে অত্যধিক সক্রিয় থাকে। ফলে কিশোররা তাৎক্ষণিক পুরস্কার (যেমন সামাজিক স্বীকৃতি, রোমাঞ্চ, টাকা, মোবাইল) এর প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি (গ্রেপ্তার, শাস্তি, নৈতিক ক্ষতি) কম মূল্যায়ন করে।

এই নিউরোবায়োলজিক্যাল বৈশিষ্ট্য কিশোরদের গ্যাংয়ে যোগ দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক ভিত্তি তৈরি করে। গ্যাংয়ের ভেতরে তারা দ্রুত ‘হিরো’ হতে পারে, সামাজিক মর্যাদা পেতে পারে, যা তাদের মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেমকে তীব্রভাবে সক্রিয় করে।

সামাজিক শিখন এবং পরিচয় গঠন
সামাজিক মনোবিজ্ঞান এবং সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, কৈশোর হলো পরিচয় গঠনের সবচেয়ে সংবেদনশীল সময়। এই সময়ে কিশোররা নিজেদের ‘কে’ এবং ‘কোথায় belongs করে’ তা খুঁজে বেড়ায়। যদি পারিবারিক বা স্কুল পরিবেশে তারা উপযুক্ত মেন্টরশিপ, স্বীকৃতি বা নিরাপত্তা না পায়, তাহলে গ্যাং তাদের বিকল্প ‘পরিবার’ হিসেবে কাজ করে।

সোশ্যাল লার্নিং থিওরি অনুযায়ী, কিশোররা যে পরিবেশে বড় হয়, সেখানকার আচরণ পর্যবেক্ষণ করে এবং অনুকরণ করে শেখে। যদি পাড়ায় গ্যাং কালচার স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে গ্যাংয়ে যোগ দেওয়া তাদের কাছে ‘স্বাভাবিক’ বা এমনকি ‘গৌরবের’ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

অর্থনৈতিক বঞ্চনা, শিক্ষার ফাঁক এবং ডিজিটাল প্রলোভন
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আরও কয়েকটি প্রেক্ষাপট গুরুত্বপূর্ণ। দারিদ্র্য, শিক্ষার মানের অবনতি এবং বেকারত্ব কিশোরদের বিকল্প পথে ঠেলে দেয়। স্কুল ড্রপআউট বা শিক্ষার প্রতি আকর্ষণ কমে যাওয়া কিশোরদের সময় কাটানোর এবং আয় করার জন্য গ্যাংয়ে যোগদানকে সহজ করে। সোশ্যাল মিডিয়া (বিশেষ করে টিকটক, ফেসবুক) কিশোরদের মধ্যে দ্রুত খ্যাতি, ভাইরাল হওয়া এবং ডিজিটাল স্ট্যাটাসের লোভ তৈরি করে। অপ্রতিমের ক্ষেত্রেও টিকটক ভিডিও তৈরির প্রলোভন এবং আইফোনের মতো স্ট্যাটাস সিম্বল এই ‘অসম বন্ধুত্ব’ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।

এই তিনটি স্তর—নিউরোবায়োলজি, সামাজিক মনোবিজ্ঞান এবং প্রেক্ষাপটগত বাস্তবতা—মিলে কিশোর গ্যাংয়ের উত্থানকে বোঝা সম্ভব।

অপ্রতিমের ঘটনা: শুধুই কি আইফোন?
অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ডের শুরুতে পুলিশের ধারণা ছিল, আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই তাকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু তদন্ত যত এগিয়েছে, ততই সামনে এসেছে আরও দুটি বিষয়—পাঁচ হাজার টাকা পাওনা নিয়ে বিরোধ এবং বয়সে বড়দের সঙ্গে অপ্রতিমের ‘অসম বন্ধুত্ব’।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো: ১৩ বছরের একটি শিশুর সঙ্গে ১৯–২০ বছর বয়সী তরুণদের এমন সম্পর্ক কীভাবে গড়ে উঠল? এই সম্পর্কের পেছনে কি ছিল কেবল বন্ধুত্ব, নাকি কোনো ধরনের ম্যানিপুলেশন, পাওয়ার ডায়নামিক্স বা গ্যাং নেটওয়ার্কে টেনে নেওয়ার কৌশল? অপ্রতিমের মা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক এবং প্রক্টরিয়াল দায়িত্বে ছিলেন; এর ফলে কোনো পূর্ববর্তী বিরোধ বা প্রতিশোধপরায়ণতা কাজ করেছে কিনা—তা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।

এই ঘটনা আমাদের দেখায় যে, কিশোর গ্যাং শুধু রাস্তায় ছিনতাই বা চাঁদাবাজির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি এখন ডিজিটাল স্ট্যাটাস, অসম বন্ধুত্ব এবং পরিকল্পিত অপরাধের নেটওয়ার্কে পরিণত হচ্ছে, যেখানে ছোট শিশুরা সহজেই লক্ষ্যবস্তু হয়ে পড়ে।

সমাজে খারাপ প্রভাব
কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান সমাজে বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে:
• শিশু ও কিশোরদের নিরাপত্তা সংকট: অপ্রতিমের মতো নিরীহ শিশুরা এখন গ্যাংয়ের লক্ষ্যবস্তু হয়ে পড়ছে।
• শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর প্রভাব: স্কুল পড়ুয়া কিশোররা গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়ায় শিক্ষার মান এবং উপস্থিতি কমে যাচ্ছে।
• পারিবারিক নিরাপত্তা ও বিশ্বাসের সংকট: বাবা-মা আর নিশ্চিত থাকতে পারছেন না যে তাদের সন্তান কার সংস্পর্শে আসছে।
• আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি: ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক এবং সহিংসতা বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে ভীতি তৈরি হচ্ছে।
• দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক ক্ষতি: যে কিশোররা আজ গ্যাংয়ে জড়ায়, তারা ভবিষ্যতে পেশাদার অপরাধীতে পরিণত হতে পারে, যা জাতির জন্য দীর্ঘমেয়াদি বোঝা তৈরি করবে।

প্রতিকারের রূপরেখা: বিজ্ঞানভিত্তিক ও বাস্তবসম্মত সমাধান
কিশোর গ্যাং সমস্যার সমাধান কেবল পুলিশি অভিযান বা কঠোর শাস্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে তা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না। বরং বহুস্তরীয়, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং টেকসই পদক্ষেপের প্রয়োজন।

প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা
প্রতিটি স্কুলে কাউন্সেলর নিয়োগ এবং মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম চালু করা, যেখানে কিশোররা তাদের সমস্যা, চাপ এবং আকাঙ্ক্ষা নিয়ে খোলাখুলি কথা বলতে পারবে। বাবা-মাকে সচেতন করা যে কীভাবে সন্তানের বন্ধুত্ব, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার এবং বাইরের মেলামেশা পর্যবেক্ষণ করবেন—নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং গাইডেন্সের মাধ্যমে। স্কুল ও কমিউনিটি পর্যায়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা, সোশ্যাল মিডিয়ার ঝুঁকি এবং অনলাইন প্রলোভন সম্পর্কে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা।

হস্তক্ষেপমূলক ব্যবস্থা
যারা স্কুল ছেড়ে দিচ্ছে, গ্যাংয়ের সংস্পর্শে আসছে বা ছোটোখাটো অপরাধে জড়াচ্ছে—তাদের দ্রুত শনাক্ত করে কাউন্সেলিং, স্কিল ডেভেলপমেন্ট এবং মেন্টরশিপের আওতায় আনা। যারা ইতিমধ্যে গ্যাংয়ে জড়িত, তাদের জন্য বিশেষায়িত প্রোগ্রাম, যেখানে মনোবিজ্ঞানী, সমাজকর্মী এবং প্রাক্তন গ্যাং সদস্যরা মিলে তাদের পুনর্বাসনের পথ দেখাবে। অনেক গ্যাংয়ের পেছনে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ‘বড় ভাই’ হিসেবে ভূমিকা থাকে; তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা এবং সামাজিক চাপ তৈরি করা জরুরি।bd-pratidin+1

পুনর্বাসনমূলক ব্যবস্থা
কিশোর অপরাধীদের প্রাপ্তবয়স্ক জেলের পরিবর্তে বিশেষায়িত সংশোধনাগারে পাঠানো, যেখানে শিক্ষা, মনোচিকিৎসা এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ থাকবে। গ্যাং ছেড়ে আসা কিশোরদের স্থানীয় কমিউনিটিতে পুনরায় গ্রহণের ব্যবস্থা, যাতে তারা নতুন পরিচয় গড়তে পারে।

আইনানুগ ও নীতিগত পদক্ষেপ
শিশু ও কিশোরদের জন্য পৃথক বিচার ব্যবস্থা, দ্রুত বিচার এবং পর্যাপ্ত আইনি সহায়তার নিশ্চয়তা। কিশোর অপরাধের জন্য সরকারি পৃথক তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা, যাতে নীতি নির্ধারণীরা সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। টিকটক, ফেসবুকসহ প্ল্যাটফর্মগুলোকে কিশোরদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

জাতির প্রাণশক্তি রক্ষার লড়াই
অপ্রতিমের মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের শোক নয়; এটি একটি জাতির জন্য সতর্কবার্তা। কিশোর গ্যাংয়ের উত্থান আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, পারিবারিক বন্ধন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার গভীর সংকটকে নির্দেশ করে। এই সংকটের সমাধান কেবল পুলিশি অভিযান বা রাজনৈতিক বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে তা ব্যর্থ হবে। বরং নিউরোসায়েন্স, মনোবিজ্ঞান এবং সমাজবিজ্ঞানের আলোকে বোঝা দরকার যে, কিশোররা কেন গ্যাংয়ে জড়ায় এবং কীভাবে তাদের বিকল্প পথ দেখানো যায়। প্রকৃত সমাধান হলো—প্রতিরোধ, হস্তক্ষেপ এবং পুনর্বাসনের সমন্বিত মডেল, যেখানে পরিবার, স্কুল, কমিউনিটি, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এবং নীতি নির্ধারণীরা একসঙ্গে কাজ করবে। অন্যথায়, অপ্রতিমের মতো আরও অনেক শিশু এই ‘অসম বন্ধুত্ব’ এবং গ্যাং কালচারের শিকার হয়ে প্রাণ হারাবে—এবং একটি জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাবে।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ এবং পরিচালক, ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তর, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল: shiblu@nstu.edu.bd