মানিট্রাপ: রাজনীতির সর্বনাশা হাতিয়ার!
মানিট্রাপ বলতে সাধারণত বোঝায় এক ধরণের সুপরিকল্পিত আর্থিক প্রতারণা বা ফাঁদ, যেখানে অপরাধীরা কোনো ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক, বন্ধুত্ব গড়ে তুলে অথবা লোভনীয় কোনো ব্যবসায়িক অফারে মাধ্যমে নিজেদের জালে জড়ায় এবং পরবর্তীতে ব্ল্যাকমেইল, ভীতি প্রদর্শন, ভুয়া বিনিয়োগ অথবা হয়রানির মাধ্যমে তার কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়। মানিট্রাপ এখন সাধারন মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগের চেয়ে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যবহার করে যেমন দ্রুত সমৃদ্ধ হওয়া যায়, একইসাথে দীর্ঘ মেয়াদি এবং নিরাপত্তার সাথে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
রাজনীতিতে মানিট্রাপ বোঝায় কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় আর্থিক সহয়তা করে, বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে নেতা তৈরি করতে অর্থ দিয়ে, ডকুমেন্টস রেখে পরবর্তীতে নেতাকে ব্ল্যাকমেইলিং করে কমিটি বাণিজ্য, বহিষ্কার, কিংবা রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমে বিভিন্ন সুবিধা আদায় করা। এক্ষেত্রে সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা কোনো উদীয়মান, প্রভাবশালী নেতা টার্গেট করা হয়। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং মিছিল মিটিং করতে গিয়ে অর্থের প্রয়োজন হয়, এই অর্থ প্রাপ্তি এবং ব্যয়ের সঠিক কোনো হিসাব এবং জবাবদিহিতা অনুপস্থিত। আর্থিকভাবে প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা চক্র নেতাদের আর্থিক অসচ্ছলতা কিংবা অর্থ ব্যয় করতে হীনমন্যতার সুযোগ নিয়ে তার সমাধান নিশ্চিত করে।
সিন্ডিকেটের মনোনীত ব্যক্তি নেতা হলে তাঁকে গাড়ি, অফিস ব্যবহারের সুযোগ, সেখানে বিভিন্ন খরচ নিশ্চিত করা হয়। নেতার বাসার বাজার, আত্মীয় -পরিবার-সন্তানদের বিভিন্ন খরচ, দেশ-বিদেশে বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ, নেতার জন্য দেশ-বিদেশে বাড়ি, স্ত্রী-রক্ষীতাদের গহণা, মোবাইল, শাড়িসহ অনেক কিছুই নিশ্চিত করা হয়। একইসাথে অবৈধ অর্থ নিরাপদে সংরক্ষণ এবং ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। এইসব অফিসে আসা পদ প্রত্যাশী অধস্তন নেতা-কর্মীদের টার্গেট করা হয় তাদের পদ নিশ্চিত করার বিষয়ে। এক্ষেত্রে পদ প্রত্যাশী নেতাকর্মীরা সিন্ডিকেটের সান্নিধ্য পেতে উঠেপড়ে লেগে যায়। তারাও চায় নেতা কার কথা শুনবেন, কার মাধ্যমে লেনদেন করলে আর্থিক লেনদেনের নিরাপত্তা ও পদ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা থাকবে। শুধুমাত্র যে পদ প্রাপ্তি তা নয় অনেক ক্ষেত্রে জেলা, মহানগর, উপজেলা, পৌরসভা অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন দপ্তরের নেতাকর্মীদের মধ্যে যারা সিন্ডিকেটের অনুসারী নয় তাদের বহিষ্কারও করা হয় অপর পক্ষ থেকে বিশেষ উৎকোচ গ্রহনের মাধ্যমে।
আর্থিকভাবে সচ্ছল এবং যোগ্য নেতাদের মধ্যে যাদের নিজেদের খরচ করার মানুষিকতা আছে, খরচ করতে অভ্যস্ত তাদের অনেক সময় এই ফাঁদে ফেলতে ব্যর্থ হয়। তখন টার্গেট করা হয় তার বিশ্বস্ত এক/একাধিক কর্মীকে। তাকে গোপনে সকল প্রকার সহযোগিতা করা হয়, যাতে কোনো সাধারন নেতাকর্মী কিংবা অন্য সোর্স থেকে টাকা নিয়ে কলুষিত হতে না হয়। তার কাজ শুধু নেতার মতের সাথে থেকে ও মিল রেখে ইয়েস, নো, ভেরিগুড, এরচেয়ে ভালো কোনো সিদ্ধান্ত হতেই পারেনা এই জাতীয় চাটুকারিতা করা। নেতাও তার মতের সাথে মিল হওয়ায় সাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এই চাটুকাররা একইসাথে ঐ দাতা সিন্ডিকেটকে তথ্য দিয়ে নেতার আশেপাশের এক একজনকে নানান সময়, নানান কাজে ব্যবহার করে কমিটি বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ফায়দা লোটায়। এগুলো করতে গিয়ে একজনের বড় ধরনের সমস্যা হলে তাঁকে মাইনাস করতে নেতাকে উদ্বুদ্ধ করাও তার কাজ। পরবর্তীতে এভাবে আরেক জনকে নেতার সান্নিধ্য দিয়ে তাকে ব্যবহার করা। এগুলো চক্রাকারে চলতেই থাকে।
এই মানিট্রাপের কৌশলে যুক্ত না হয়ে হারিয়ে যায় অনেক যোগ্য নেতাকর্মী। এজন্যই নেতাই জনগণের প্রত্যাশা বোঝা এবং তা সমাধানের চেষ্টা দূরে থাকুক, কর্মী তৈরি না করে, কর্মীর ভালো-মন্দ, বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ায় না। তারা বিশ্বাস করে এবং জানেন কমিটি টাকা দিয়ে অথবা সিন্ডিকেটের অনুসারী হয়েই কিনতে হবে। এক্ষেত্রে কর্মীর পেছনে ব্যয় করে কিংবা সাধারন মানুষের কল্যাণে কাজ করে কোনো লাভ নেই। সবাই নেতা এবং কমিটি কেনার দৌড়ে মারিয়া হয়ে ছুটছে। একবার দায়িত্ব পেলে ক্ষমতাসীন দলে বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি কাজের ভাগবাটোয়ারার সোনার হরিণ অর্জন করা যায়। ফলে সুসময়ে কর্মীর অভাব হয় না, কঠিন মুহূর্তে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড দূরে থাকুক নিরাপত্তার জন্য বাসায়ও পাওয়া যায় না। রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করতে, যে কোনো রাজনৈতিক দলের ভিত্তি মজবুত করে জনগণের প্রত্যাশা পূরণের রাজনীতি করতে এই মানিট্রাপ বন্ধ করার বিকল্প আছে কী?
লেখক: সাবেক ছাত্রদল নেতা