১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২২:০৯

শিক্ষক মূল্যায়ন পদ্ধতি: বিশ্ববিদ্যালয়ের অলংকার নাকি দায়? 

নাজমুল হুদা আজাদ   © টিডিসি সম্পাদিত

মধ্যযুগের ইউরোপে শিক্ষা ও গবেষণার যে প্রতিশ্রুতি ও সম্ভাবনা নিয়ে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণার সূত্রপাত হয়েছিলো বাংলাদেশের বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় পরিমন্ডলটা সে প্রতিশ্রুতি থেকে সরতে সরতে এমন এক অবস্থায় অবনমিত হয়েছে যেন এসব আর বিশ্ববিদ্যালয় নয় বরং পঠন- পাাঠনসমৃদ্ধ কিন্ডারগার্টেন। বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞানজগতে নিত্যনতুন মৌলিক সংযোজনের মধ্য দিয়ে দেশ, জাতি ও সর্বোপরি মানবকল্যাণের নিমিত্তে জ্ঞান উৎপাদন ও জ্ঞান বিতরণের ধারা অব্যাহত রাখবে। একটা শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ অ্যাকাডেমিয়ার উন্নয়নে আমাদের শক্তিসামর্থ্যের অভাব আছে সত্য; কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের মুষ্টিমেয় সম্ভাবনাকে পুঁজি করে সেই অভাব উত্তরণের ন্যূনতম সদিচ্ছাটাও যেন আমাদের কারো নাই- না সরকারের, না ছাত্রজনতার।

গত দুএকদিন ধরে আলাপ চলছে ডাকসু সদস্য রাফিয়ার উদ্যোগে সৃষ্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের কর্তৃক শিক্ষক মূল্যায়নের ওয়েবসাইট নিয়ে। পক্ষে বিপক্ষে বাহারি মতামত চোখে পড়েছে- ছাত্রশিক্ষকের মধ্যে সচেতন অনেকেই মত দিচ্ছেন। আমরা আশা করেছিলাম শিক্ষকদের তরফ থেকে রাফিয়ার এই উদ্যোগের সমালোচনা না করে প্রশংসাসমেত প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের উদ্যোগের আশ্বাস শোনতে পাবো। কারণ এই উদ্যোগটা আরো আগে যেখানে শিক্ষকদের তরফ থেকে হওয়ার কথা ছিলো সেখানে এই সময়ে এসে শিক্ষার্থীদের তরফ থেকে সামনে আসাটা শিক্ষক সমাজের জন্যে লজ্জার।

মধ্যযুগের ইউরোপে যখন প্যারিস, বলোগনা বা অক্সফোর্ডের মতো বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের উত্থান ঘটছে ওই সময়টাতে শিক্ষার্থীরা যে পরিমাণে ক্ষমতায়িত ছিলো তা এখন কল্পনাতীত। সরলভাবে বললে তখন শিক্ষকদের রুটি- রুজির নাটাই ই ছিলো শিক্ষার্থীদের হাতে। বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে ক্রমেই চার্চ এবং স্টেটের প্রভাব বাড়তে থাকলে শিক্ষার্থীদের প্রভাব ধীরে ধীরে কমতে থাকে। শিক্ষার্থীদের এই প্রভাব কমলেও পশ্চিমের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অ্যাকাডেমিক দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে শিক্ষক- শিক্ষার্থীর মধ্যে একটা ভারসাম্যপূর্ণ বিদ্যায়তনিক চর্চা থাকলেও আমাদের এখানে নেই।

বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই চর্চার অংশ হিসেবে টিচিং ইভালুয়েশান বা শিক্ষার্থীদের কর্তৃক সিমেস্টার শেষে শিক্ষকের সামগ্রিক পারফরম্যান্স মূল্যায়নের ব্যাপারটা প্রচলিত আছে। সিমেস্টারের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রেফারেন্সসমেত কোর্স প্রোফাইল সরবরাহ, যথাসময়ে ক্লাস, কুইজ ইত্যাদি নেওয়া, যথাসময়ে যথাযথভাবে খাতা মূল্যায়নসহ রেজাল্ট প্রকাশ, ক্লাসের সামগ্রিক পারফরম্যান্স, শিক্ষার্থীদের সাথে সম্পর্ক ও ব্যবহারসহ বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষে বহুমাত্রিক ও প্রাসঙ্গিক রুবরিকস্ এর উপর ভিত্তি করে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের এই রেটিং বা মূল্যায়নটি করে থাকেন। অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এই রেটিং না করলে শিক্ষার্থীদের রেজাল্ট প্রকাশ করে না। ফলে সবাই এই রেটিং এ অংশগ্রহণ করে থাকেন। 

সিমেস্টার শেষে এই রেটিং এর ফলাফলটি স্ব স্ব শিক্ষকের হাতে প্রশাসন পৌঁছে দিয়ে থাকেন। এই ফলাফলটি পাবলিকলি ঘোষণা না করলেও এটা নিয়ে অফিসে বা সহকর্মীদের মধ্যে আলাপ- সালাপ এর একটা জায়গা তৈরি হওয়ার মাধ্যমে একটা ইতিবাচক ও সংশোধনমুখী পিয়ার ইম্প্যাক্ট তৈরি হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে পারফরম্যান্স অসন্তোষজনক হলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের নিয়ে পঠন- পাঠনের উপর কর্মশালা আয়োজন করতেও দেখা যায়। 

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের যে কৌলিন্যের চর্চা এই চর্চার বিরুদ্ধে অন্যতম শক্তিশালী চ্যালেঞ্জ হতে পারে এই টিচিং ইভালুয়েশান বা শিক্ষক মূল্যায়ন। 

প্রথমত, পাবলিকের শিক্ষকদের শিক্ষার্থীদের সামনে যে অবতারতুল্য ভাবমূর্তি যে তাকে প্রশ্ন করা যেন ঔদ্ধত্যের বহিঃপ্রকাশ বা শিক্ষকদের একচেটিয়া ক্ষমতার চর্চা- এই চিন্তার মাঝে যদি শিক্ষক মূল্যায়নের উদ্যোগ সামনে আসে, তাও আবার শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে; তবে এই ব্যাপারটা তাদের অনেকের পক্ষেই মেনে নেওয়া কঠিন। 

দ্বিতীয়ত, যে সমস্ত শিক্ষকদের অ্যাকাডেমিক যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায় বা যোগ্যতা প্রশ্নসাপেক্ষ হওয়ার পরও নিয়োগ পরবর্তী নিজের মানোন্নয়নের ন্যূনতম সদিচ্ছা নাই, তাদেরও এই উদ্যোগটা মাথাব্যাথার কারণ হওয়াটা স্বাভাবিক। 

তৃতীয়ত, যে সমস্ত শিক্ষকবৃন্দ বিভাগের সময় দেওয়ার চেয়ে শিক্ষক রাজনীতিতে সময় দেওয়া বেশি পছন্দ করেন তাদের জন্য দুভাবে এই বিষয়টা উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

এক- রাজনীতি করার পরও তাঁর ভাবমূর্তি বজায় রাখা নিয়ে আশঙ্কা, দুই- বিভাগে বা পঠন- পাঠনে সময় দিতে না পারলে এই কম্পিটিটিভ অ্যাকাডেমিয়ায় তাঁর পিছিয়ে পড়ে রেটিং অবনমনের মাধ্যমে বিব্রতকর অবস্থার সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা। 

চতুর্থত, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সমস্ত শিক্ষকরা নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কাজকারবারকে ফেলে রেখে ব্যক্তিগত অর্থ সংযোগ ঘটাতে প্রাইভেটে সময় দেওয়াকে বেশি পছন্দ করেন এবং নিজের কর্মস্থলের কাজকারবারের প্রতি যথেষ্ট উদাসীন থাকেন, তাদের এই উদ্যোগটা পছন্দ হওয়ার কথা না।

তবে, এই উদ্যোগটা পরিপূর্ণভাবে শিক্ষার্থীদের হাতে ছাড়াটাও ঝুঁকিপূর্ণ। এককভাবে শিক্ষার্থীদের কোন বিশেষ অংশ দ্বারা এটি প্রচলিত থাকলে ডাটা টেম্পারিং এর অবকাশ রয়ে যায়। এক্ষেত্রে কোন বিশেষ শিক্ষক বা শিক্ষিকা টার্গেটে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। শিক্ষার্থীদের তরফ থেকে উদ্যোগটা আসা প্রশংসনীয় হলেও যদি তা ছাত্র- শিক্ষক উভয় অংশী সমর্থিভাবে আনুষ্ঠানিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না পায়, তবে এই উদ্যোগটা টেকসই হবে না।

অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজ, এমআইটি, হারভার্ড বা স্ট্যানফোর্ডের মত বিশ্বের নামীদামি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে টিচিং ইভালুয়েশান বা শিক্ষার্থীদের কর্তৃক শিক্ষক মূল্যায়নের পদ্ধতিটি বহুলভাবে প্রচলিত। প্রচলিত এই মডেলগুলোর আদলে আমাদের দেশীয় বাস্তবতাও বিবেচনায় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের সংশ্লিষ্ট অংশীসমূহের সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটা সর্বসম্মত  মডেল গ্রহণ করে এই উদ্যোগটাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যায় এবং তা খুব জরুরি।

বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের মানোন্নয়নে সরকার, দেশি- বিদেশি সরকারি- বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সংগঠন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সিভিল সোসাইটিসহ অপরাপর প্রাসঙ্গিক ব্যক্তি, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সার্বিক পার্টনারশিপ বা সমন্বয় সাধন খুব জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে কার্যকরী 'কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্স সেল' চালু করারও কোনো বিকল্প নাই। এই কোয়ালিটি অ্যাসিওরেন্স এর অন্যতম ও কার্যকরী অনুষঙ্গ হতে পারে এই টিচিং ইভালুয়েশান বা শিক্ষার্থী কর্তৃক শিক্ষক মূল্যায়ন।

লেখক: শিক্ষক, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি