বিসিএসে কি মেধার সংকট নাকি প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতায় পদ শূন্য?
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষার ফল প্রকাশের পরপরই ইদানীং একটি পরিচিত দৃশ্য দেখা যায়—বিজ্ঞাপিত পদের একটি বড় অংশ শূন্য থেকে যাচ্ছে। বিশেষ করে বিষয়ভিত্তিক ও কারিগরি (টেকনিক্যাল) ক্যাডারগুলোতে যোগ্য প্রার্থী খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না বলে আলোচনা ওঠে। রাষ্ট্রযন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্য মেধা পাওয়া যাচ্ছে না—এমন ধারণাই সাধারণ মানুষের কাছে বার্তা হিসেবে পৌঁছায়। পদ শূন্য থাকায় চিকিৎসা, প্রকৌশলীসহ পেশাগত ক্যাডারে আবেদনকারীগণ কি মেধাবী নয়? এমন প্রশ্ন শুনে যেকোনো বিবেকবান মানুষ অবশ্যই অবাক হবেন। কারণ ছোট বেলা থেকেই এদেশের অধিকাংশ শিশুরা স্বপ্ন দেখে দেখে বড়ো হন যে, তারা বড়ো হয়ে একদিন ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হবেন।
কিন্তু সম্প্রতি বিসিএসের ফলাফল নিয়ে যেভাবে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে যে, পেশাগত পদে বা ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার পদে যোগ্য লোক পাচ্ছে না পিএসসি। অথচ হাজার হাজার প্রার্থী পদগুলোতে আবেদন করেও চাকরি পাচ্ছে না। আবেদনকারীগণ কি মেধাবী নয়? অথচ ভুল ধারণা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, মেধাবীগণ এসব পদে আবেদন করছে না বা এসব পদ মেধাবীদের আকর্ষণ করছে না। বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এই সংকট প্রার্থীদের মেধার ঘাটতিজনিত নয়; বরং সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সাম্প্রতিক কিছু অবিবেচনাপ্রসূত, প্রক্রিয়াগত ও নীতিগত পরিবর্তন এবং কৌশলী কাঠামোর সীমাবদ্ধতার প্রত্যক্ষ ফল।
ক) নীতিগত পরিবর্তন: ৩৮তম থেকে ৪৯তম বিসিএসের পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ
৩৮তম বিসিএস থেকে ৪৯তম বিসিএস পর্যন্ত পিএসসির প্রিলিমিনারি ফলাফলের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কমিশন কীভাবে তাদের সুদীর্ঘকালের প্রতিষ্ঠিত ও পরীক্ষিত ধারাবাহিকতা থেকে হঠাৎ সরে এসেছে। প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় পাসের হার এবং উত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীর অনুপাত কমানোর এই আকস্মিক নীতিই পদ শূন্য থাকার মূল কারণ।
অতীতে পিএসসি বিজ্ঞাপিত মোট পদসংখ্যার ৮ থেকে ১০ গুণ প্রার্থীকে প্রিলিমিনারিতে পাস করাতো। নিচে এই ধারাবাহিকতার স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরা হলো:
৩৮তম বিসিএস: মোট পদ ছিল ২,০২৪টি। প্রিলিমিনারিতে পাস করানো হয় ১৬,২৯৬ জনকে, যা মোট পদের ৮.০৫ গুণ।
৪০তম বিসিএস: ১,৯০৩টি পদের বিপরীতে ২০,২৭৭ জন উত্তীর্ণ হয়, যা বিজ্ঞাপিত পদের ১০.৬৬ গুণ।
৪১তম বিসিএস: ২,১৩৫টি পদের বিপরীতে ২,০৫৬ জন পাস করে, যা পদের ৯.৮৬ গুণ।
৪৩তম বিসিএস: ১,৮১৪টি পদের বিপরীতে ১৫,২২৯ জন কৃতকার্য হয়, যা মোট পদের ৮.৪০ গুণ।
৪৪তম বিসিএস: ১,৭১০টি পদের বিপরীতে ১৫,৭০৮ জনকে উত্তীর্ণ করা হয়, যা পদের ৯.১৯ গুণ।
এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, ৪৪তম বিসিএস পর্যন্ত পিএসসি একটি ধারাবাহিক নীতি বজায় রেখেছিল, যার ফলে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত প্রার্থীর পুল তৈরি হতো এবং বিষয়ভিত্তিক পদে শূন্যতার হার কম ছিল।
তবে এই সুস্থ ধারাবাহিকতায় হঠাৎ ছেদ পড়ে ৪৫তম বিসিএস থেকে। কোনরূপ গঠনমূলক পর্যালোচনা ছাড়াই পিএসসি প্রিলিমিনারিতে উত্তীর্ণের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমিয়ে আনে:
৪৫তম বিসিএস: ২,৩০৯টি পদের বিপরীতে পাস করানো হয় ১২,৭৮৯ জনকে, যা কমে দাঁড়িয়েছে ৫.৫৪ গুণে।
৪৬তম বিসিএস: ৩,১৪০টি পদের বিপরীতে ২১,৩৯৭ জন পাস করে, যা মোট পদের ৬.৮১ গুণ।
৪৭তম বিসিএস: ৩,৪৮৭টি পদের বিপরীতে উত্তীর্ণের সংখ্যা নেমে আসে মাত্র ১০,৬৪৪ জনে, যা পদের ৩.০৫ গুণ।
৪৯তম বিসিএস (বিশেষ): ৬৮৩টি পদের বিপরীতে লিখিত পরীক্ষায় মাত্র ১,২১৯ জন উত্তীর্ণ হয়, যা মোট পদের মাত্র ১.৭৮ গুণ।
খ) পাসের হার হ্রাস ও পদ শূন্য থাকার গাণিতিক রসায়ন
এক বছরে বিসিএস পরীক্ষা সম্পন্ন করা'—পিএসসির এই আপাত-আকর্ষণীয় ও গতিশীল লক্ষ্যই মূলত পুরো জটিলতার কেন্দ্রবিন্দু। এক বছরে প্রক্রিয়া শেষ করার কৌশল হিসেবে পিএসসি লিখিত ও ভাইভা পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের খাটুনি কমাতে প্রিলিমিনারি পাসের সংখ্যা ব্যাপকভাবে ছেঁটে ফেলেছে। কিন্তু এই কাটছাঁট করতে গিয়ে পিএসসি বিসিএসের মেধা বাছাইয়ের কাঠামোগত বাস্তবতাকে উপেক্ষা করেছে।
১. প্রিলিমিনারির সাধারণ প্রকৃতি ও টেকনিক্যাল পদের বলি:
বিসিএস প্রিলিমিনারি পরীক্ষা মূলত একটি সাধারণ জ্ঞানভিত্তিক প্রাক-বাছাই পরীক্ষা, যেখানে সাধারণ জ্ঞান , ভূগোল, বাংলা, ইংরেজি ও সাধারণ গণিতসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ২০০ নম্বরের প্রশ্ন থাকে। এটি কোনো বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষা নয়। একজন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ বা নির্দিষ্ট বিষয়ে পড়া শিক্ষার্থী সাধারণ জ্ঞানের এই প্রতিযোগিতায় একজন সাধারণ ব্যাকগ্রাউন্ডের প্রার্থীর চেয়ে কয়েক নম্বরে পিছিয়ে পড়তে পারেন।
২. বিষয়ভিত্তিক পৃথক কাট-অফ নম্বরের অনুপস্থিতি:
পিএসসি প্রিলিমিনারিতে কেবল একটি সর্বমোট নির্ধারিত কাটা-অফ মার্কস বজায় রাখে। কারিগরি ও বিষয়ভিত্তিক ক্যাডারগুলোর জন্য প্রিলিমিনারিতে কোনো পৃথক পাসের নম্বর বা বিষয়ভিত্তিক কোটা-ভিত্তিক পাসের ব্যবস্থা রাখা হয় না।
৩. ফিল্টারিং-এর বিপরীতমুখী প্রভাব:
যখন বিজ্ঞাপিত পদের প্রায় ১০ গুণ প্রার্থী পাস করতো, তখন প্রিলিমিনারি পার হয়ে বিষয়ভিত্তিক বা টেকনিক্যাল প্রার্থীরাও বিপুল সংখ্যায় লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেতেন। লিখিত ও ভাইভায় তারা নিজস্ব সাবজেক্টের দক্ষতার পরিচয় দিয়ে উত্তীর্ণ হতেন। কিন্তু প্রিলিমিনারি পাসের হার কমিয়ে মাত্র ১.৭৮ থেকে ৩ গুণে নামিয়ে আনায়, প্রিলিমিনারির গণ-বাছাই প্রক্রিয়াতেই অধিকাংশ টেকনিক্যাল বা বিষয়ভিত্তিক প্রার্থী বাদ পড়ে যাচ্ছেন। এর ফলে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার মঞ্চে পৌঁছানোর জন্য বিষয়ভিত্তিক ক্যাডারে পর্যাপ্ত প্রার্থীই অবশিষ্ট থাকছে না। দিনশেষে ভাইভা বোর্ডে পদের সংখ্যা বেশি হলেও যোগ্য প্রার্থীর অভাবে পদ শূন্য রেখে ফল প্রকাশ করতে হচ্ছে।
গ) দ্রুততার মোহে সঠিক মূল্যায়নের পথ রুদ্ধ
এক বছরের মধ্যে একটি বিসিএস শেষ করা অবশ্যই একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারতো, যদি তা পরীক্ষার্থীদের যোগ্যতার সঠিক মূল্যায়নের ভিত্তিতে হতো। কিন্তু মূল প্রক্রিয়াকে উন্নত না করে কেবল পাস করানো প্রার্থীর সংখ্যা অর্ধেক বা দুই-তৃতীয়াংশ কমিয়ে দিয়ে 'দ্রুত বিসিএস' বাস্তবায়নের চেষ্টা পুরো নিয়োগ ব্যবস্থাকেই একটি অকার্যকর চক্রে ঠেলে দিয়েছে।
কমিশনের এই সিদ্ধান্তের ফলে একদিকে যেমন রাষ্ট্র তার নির্ধারিত টেকনিক্যাল খাতে দক্ষ ও যোগ্য ক্যাডার কর্মকর্তা পাচ্ছে না, অন্যদিকে বছরের পর বছর ধরে প্রস্তুতি নেওয়া হাজার হাজার বিষয়ভিত্তিক মেধাবী শিক্ষার্থী প্রিলিমিনারির এই যান্ত্রিক ফিল্টারিংয়ের শিকার হয়ে ছিটকে যাচ্ছেন। এতে সমাজে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে যে, বর্তমান প্রজন্ম বা প্রার্থীরা হয়তো "অযোগ্য", যা সত্যের চরম অপলাপ।
ঘ) উত্তরণের উপায়: পিএসসির করণীয়
বিসিএস ব্যবস্থার এই জটিলতা নিরসন করে স্বচ্ছ ও বৈষম্যহীন নিয়োগ নিশ্চিত করতে পিএসসিকে তাদের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের দ্রুত পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। প্রস্তাবিত সমাধানসমূহ:
প্রিলিমিনারিতে পাসের অনুপাত পুনর্নির্ধারণ: ৪৪তম বিসিএস পর্যন্ত অনুসরণ করা ধারাবাহিকতা ফিরিয়ে এনে প্রিলিমিনারি পাসের হার পদের বিপরীতে ন্যূনতম ৭ থেকে ১০ গুণ করা উচিত।
বিষয়ভিত্তিক পাসের শর্ত ও পৃথক বিবেচনা: প্রিলিমিনারি পরীক্ষা সাধারণ ক্যাডারের জন্য যেভাবে মূল্যায়ন হয়, টেকনিক্যাল ও পেশাগত ক্যাডারের প্রার্থীদের ক্ষেত্রে সাধারণ নম্বরের পাশাপাশি নিজ নিজ বিষয়ভিত্তিক অংশের জন্য নির্দিষ্ট যোগ্যতা নম্বর বা পৃথক স্ট্রিম নির্ধারণ করা যেতে পারে।
নির্দিষ্ট পাস নম্বর বা কাট-অফ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা: পিএসসির ইচ্ছামাফিক বা আকস্মিক পাসের সংখ্যা নির্ধারণের পরিবর্তে একটি যৌক্তিক ও পূর্ব-নির্ধারিত স্বচ্ছ মানদণ্ড প্রয়োগ করা প্রয়োজন।
প্রশাসনিক কাঠামোর দীর্ঘসূত্রতা দূর করা প্রশংসনীয় উদ্যোগ, তবে তা যেন নিয়োগ প্রক্রিয়ার মৌলিক নীতি ও মেধাবীদের সঠিক মূল্যায়নের অধিকারকে বলি না দেয়। বিসিএসে পদে পদে শূন্যতা প্রার্থীর মেধার ঘাটতির প্রমাণ নয়, বরং পিএসসির অপরিকল্পিত ও যান্ত্রিক পদ্ধতির সীমাবদ্ধতার খতিয়ান। সময় এসেছে পিএসসিকে তার ভুল সংশোধন করে পরিসংখ্যান ও বাস্তবতার আলোকে নীতিমালা সংশোধন করার, যাতে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ক্যাডার পদগুলো শূন্য না থেকে যোগ্য ও মেধাবী জনবলে সমৃদ্ধ হতে পারে।
এক বছরে বিসিএস শেষ করার প্রতিযোগিতায় সঠিক মূল্যায়ন পদ্ধতি যেন বলি না হয়। পিএসসিকে দ্রুত তাদের এই সিদ্ধান্তের পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে, যাতে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো উপযুক্ত মেধাভিত্তিক জনবল থেকে বঞ্চিত না হয়।
লেখক: বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা)
ইমেইল: mohiuddin.du79@gmail.com