০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮:১০

বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কার: সমস্যা ও সম্ভাবনা

এম এ মতিন  © টিডিসি সম্পাদিত

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসে  বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আজ প্রায় ছাপ্পান্ন  বছর অতিক্রান্ত হতে চলেছে। সময়ের ব্যপ্ত পরিসরে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। ঔপনিবেশিক (বৃটিশ ও পাকিস্তান আমল) শিক্ষাব্যবস্থা থেকে  বের হয়ে স্বাধীন সার্বভৌম একটি দেশের জন্যে প্রযোজ্য  সুষ্ঠু ও কার্যকর শিক্ষা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তৎকালীন সরকার অতি বিজ্ঞতার পরিচয় দিয়ে ১৯৭২ সালে প্রখ্যাত বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ ড. কুদরত ই খুদা কে সভাপতি করে একটি শক্তিশালী  শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। কিন্তু ১৯৭৫ সন পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার পরও ওই সরকার কমিশন কতৃক গৃহীত সিদ্ধান্ত খুব কমই বাস্তবায়ন করতে পেরেছিলেন। ১৯৭৫ এর পরে দেশে দ্রুত সরকার পরিবর্তিত হতে থাকে। সেই সাথে একটি শিক্ষা ব্যবস্থা বা নীতির উপর স্থির না থেকে শিক্ষার উপর পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলতেই থাকে। লক্ষ্যণীয় যে, যে সরকার যখন ক্ষমতায় এসেছে তারাই এক বা একাধিক শিক্ষা কমিশন গঠন করে শিক্ষা ব্যবস্থার উপর ট্রায়েল এন্ড এরর পদ্ধতি প্রয়োগ করে শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কার আনার চেষ্টা করেছে। কিন্তু কোন পরিবর্তনই শিক্ষা সংস্কারে ঈপ্সিত ফালাফল আনয়ন করতে সক্ষম হয় নি। দেখা যায়,  কুদরত-ই-খোদা কমিশনসহ আজ আব্দি বাংলাদেশে মোট ৯ টি শিক্ষা কমিশন ও শিক্ষানীতি গঠিত হয়েছে। এগুলো হলোঃ

১। ড. কুদরক-ই- খুদা কমিশন (১৯৭২), ২। ড. আব্দুল মজিদ কমিশন (১৯৮০), ৩। ড. মফিজ উদ্দিন আহম্মদ কমিশন (১৯৮৭), ৪। ড. শামসুল হক কমিশন (১৯৯৭), ৫। ড. আব্দুল বারী কমিশন (২০০২), ৬।  ড. মনিরুজ্জামান কমিশন (২০০৩), ৭। ড. কবীর চৌধুরী কমিশন (২০০৯), ৮।  ২০১০ সালে  জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও সর্বশেষ ৯। ২০২১ সালে জাতীয় শিক্ষাক্রম প্রণয়ন ও চালু করা হয়। যা নিয়ে গোটা দেশে চরম বিতর্ক ও বিশৃংখলা তৈরি হয়। ২০২১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনেন। এই শিক্ষাক্রমে ধারাবাহিক মূল্যায়নের ওপর জোর দেওয়া হয় এবং প্রাথমিক স্তরে বার্ষিক ও অন্যান্য কেন্দ্রীয় পরীক্ষার গুরুত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে পাঠ্যক্রমে হাতে-কলমে কার্যক্রম, রান্না, কারুশিল্প, সাংস্কৃতিক চর্চা ও দৈনন্দিন জীবনদক্ষতাভিত্তিক বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষাও বন্ধ করে দেওয়া হয়। এসব পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে  অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষাবিদের মধ্যে তীব্র বিতর্ক ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। তাঁদের একাংশ অভিযোগ করেন যে, নতুন শিক্ষাক্রমে মৌলিক বিষয়ের ওপর গুরুত্ব কমেছে এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থা যথেষ্ট স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে সরকার দাবি করেছিলেন, এটি মুখস্থনির্ভর শিক্ষা থেকে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় রূপান্তরের উদ্যোগ। মূলতঃ যে বিষয়গুলো নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল সেগুলো হলোঃ

  • পরীক্ষা কমিয়ে ধারাবাহিক মূল্যায়ন (Continuous Assessment): শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রম, প্রকল্প ও অংশগ্রহণের ভিত্তিতে মূল্যায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়।
  • প্রকল্প ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা: রান্না, ভর্তা তৈরি, হস্তশিল্প, বিছানা/ঘর গোছানো, দলীয় কাজ, ইত্যাদি জীবনদক্ষতামূলক কার্যক্রম পাঠ্যক্রমে যুক্ত হয়।
  • বিষয় ও বইয়ের কাঠামো পরিবর্তন: প্রচলিত বিষয়বিন্যাস বদলে নতুন বিষয় (যেমন Wellbeing) এবং সমন্বিত শিখনপদ্ধতি চালু করা হয়।
  • মুখস্থের বদলে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা: সরকার এটিকে সৃজনশীল ও কর্মমুখী শিক্ষা হিসেবে উপস্থাপন করলেও অনেক অভিভাবক মৌলিক জ্ঞান দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
  • কিছু পাঠ্যবইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে বিতর্ক: বিশেষ করে সপ্তম শ্রেণির “শরীফার গল্প”সহ লিঙ্গ পরিচয়-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে ধর্মীয় ও সামাজিক মহলে ব্যাপক বিতর্ক দেখা দেয়।

এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের আগষ্ট  মাসে  প্রফেসর ড. মুহম্মদ ইউনুস এর নেতৃত্বে  অন্তর্বতী সরকার ক্ষমতায় আসেন এবং এই শিক্ষাক্রম স্থগিত ঘোষনা করে ইতিপূর্বেকার ২০১২ সালের সৃজনশীল শিক্ষাক্রম পুনরায় চালু করেন। এর মধ্যে নবম শ্রেণী থেকে বিষয় বিভাজন (মানবিক, বাণিজ্য ও বিজ্ঞান) ও সামষ্ঠিক পরীক্ষায় আগের মত বেশি নম্বর বরাদ্দ রাখা হয়। এরই মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শিক্ষা আইন, ২০২৬ প্রণয়ন করেন যা নির্বাচিত সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। যতদূর জানা যায় বি এন পি সরকার শিক্ষা আইন ২০২৬ অনুমোদন করেননি। কিংবা আজ  অব্দি শিক্ষা ব্যবস্থায় গুণগত পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে  কোন শিক্ষা কমিশন গঠন কিংবা গঠনের ঘোষনাও দেন নি। এরই মধ্যে একটি এইচ এস সি পরীক্ষা ও একটি এস এস সি পরীক্ষা হয়ে গেল। এইচ এস সি পরীক্ষায় পাশের হার ৫৭% এবং এস এস সি পরীক্ষায় ৬২%  – যা বিগত প্রায় দুই দশকের মধ্যে সর্বনিন্ম।  বিগত এই দুইটি পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল সমাজের সচেতন অংশকে বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছে।  এ বছর এস এ সসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়  এতে মোট সাত লাখ প্রার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। মোট পরীক্ষার্থী ছিল ১৮,৫৭,৩৪৪ জন। অকৃতকার্যের হার পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশ শতাংশ। এবারের সাত লাখ অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর পরিসংখ্য্যান আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি জলজ্যান্ত সতর্ক সংকেত । বিজ্ঞজনেরা মনে করেন রাষ্ট্রের এখন মূল কাজ হওয়া উচিত এই বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রী অকৃকার্য হওয়ার কারণ খুঁজে বের করা এবং  ঝরে পড়া এই শিক্ষার্থীদের বিকল্প কর্মসূচির সাথে ইতিবাচক মোটিভেশন দেওয়ার মাধ্যমে জীবনের মূল ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনা ।  তারা আরও মনে করেন - রাষ্ট্রকে আজ সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে দীর্ঘদিনের এই বহুমুখী ব্যর্থতার অর্থনৈতিক ক্ষতি বা ইকোনমিক লস আমাদের জন্য কত বিশাল। প্রতি বছর শিক্ষার মূল স্রোত থেকে এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর ছিটকে পড়া দীর্ঘমেয়াদে বিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের জাতীয় ক্ষতির সমতুল্য । এই ক্ষতি মোকাবেলা করতে মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কার এবং কারিগরি শিক্ষাকে শিল্পের সঙ্গে সংযুক্ত করার বাস্তবমুখী সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন । সেজন্যে শিক্ষা বিষয়ে নীতিমালা থাকা দরকার যা সাধারণত বিজ্ঞ জনদের দ্বারা গঠিত কোন কমিটি/কমিশন নিতে পারেন।

বি এন পি সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছেন মাত্র ৭ মাস হলো। শিক্ষা মন্ত্রণলয়ের দায়িত্বে আছেন ইতোপূর্বেকার শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন, পি এইচডি। তাঁর সহযোগী হিসেবে আছেন ড ববি হাজ্জাজ। প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে আছে ড. মাহদী আমিন। প্রত্যেকেই উন্নত বিশ্বে লেখাপড়া করা উচ্চশিক্ষিত সজ্জন ব্যক্তি। বয়সেও নবীন। দায়িত্ব গ্রহণের পর তাদের প্রতিটি বক্তব্য,  পদক্ষেপ দেশের মানুষ বিশেষ করে শিক্ষিত অংশ অতি আগ্রহ ও সতর্কতার সাথে লক্ষ্য করছেন এবং পত্রপত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইতিবাচক মন্তব্য করে যাচ্ছেন। দেশের শিক্ষিত সচেতন অংশ আশাবাদী বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় গুণগত একটি পরিবর্তন আসন্ন। তাদের দেয়া অতিসাম্প্রতিক দুই একটি বক্তব্য তুলে ধরে আমরা আমাদের ঈপ্সিত আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে চাই। 

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন হায়ার এডুকেশন অ্যাক্সিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রকল্পের আওতায় আয়োজিত দুই দিনব্যাপী (২১ -২২ আগস্ট ২০২৬) ‘ভাইস চ্যান্সেলর’স ডায়ালগ অন শেপিং দি ফিউচার অব হাইয়ার এডুকেশন’ শীর্ষক সন্মেলনে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। এতে অংশ নিয়েছেন  দেশের শীর্ষস্থানীয় সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭১ জন উপাচার্য। সন্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়েছে  রাজধানীর কোলাহলময় পরিবেশের বাইরে ছায়া সুনিবিঢ়, নয়নাভিরাম সাভারস্থ ব্রাক এর সেন্টার ফর ডেভেলমেন্ট ম্যানেজমেন্ট (সি ডি এম) নামীয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের আধুনিকতম মিলনায়তনে।  

সংলাপের প্রথম দিনে উচ্চশিক্ষার নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে মতবিনিময় সেশনসহ বিভিন্ন অধিবেশনে দেশের উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন, সুশাসন, গবেষণা ও উদ্ভাবন, ডিজিটাল রূপান্তর, আন্তর্জাতিকীকরণ, শিল্পখাতের সঙ্গে সহযোগিতা এবং স্নাতকদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।

সংলাপের প্রথম দিন(২১-০৮-২০২৬)  উচ্চশিক্ষার নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে মতবিনিময় সেশনে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন,  শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আব্দুল খালেক এবং বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ অংশ নেন। এ সেশনে দেশের উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ, গবেষণা ও উদ্ভাবন, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের সহযোগিতা এবং স্নাতকদের কর্মসংস্থানসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করা হয়।

 অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী উচ্চশিক্ষাকে কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরির সঙ্গে যুক্ত করা এবং নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, নতুন বিভাগ ও বিষয় চালুর ক্ষেত্রে সরকারের অগ্রাধিকার খাত, কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা ও উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন একইসঙ্গে অপরিকল্পিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের সুপারিশ না করার জন্য তিনি ইউজিসি চেয়ারম্যানেকে পরামর্শ দেন।

তিনি আরও বলেন, দেশের অর্থনৈতিক চাহিদা ও শ্রমবাজারের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উচ্চশিক্ষার বিষয় ও পাঠ্যক্রম নির্ধারণ করতে হবে। কেবল সনদ অর্জন কিংবা প্রদান নয়, শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার উপযোগী করে গড়ে তোলাও উচ্চশিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত।

তিনি বলেন,  সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে ভঙ্গুর অবস্থা থেকে স্থিতিশীল পর্যায়ে নিয়ে আসার উদ্যোগ নিয়েছে। অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও শিক্ষা খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বাজেট বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ পর্যায়ক্রমে মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না। এর কার্যকর ও স্বচ্ছ ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার মান, গবেষণা এবং শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগের প্রত্যাশিত ফল নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন বলেন, শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য শিক্ষার্থীদের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। এজন্য শিক্ষাক্রমে মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধসম্পন্ন বিষয়বস্তু যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। উচ্চ মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতাসম্পন্ন জনগোষ্ঠী ছাড়া দেশের অগ্রগতি টেকসই হবে না। তিনি বলেন, বৈষম্যহীন ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনে শিক্ষাক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, সমতা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আর্থসামাজিক অবস্থা, লিঙ্গ বা ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে কোনো শিক্ষার্থী যেন মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। বর্তমান সরকার এ লক্ষ্য অর্জনে কাজ করছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী স্নাতক তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে ড. মাহদী আমিন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিদ্যমান পাঠ্যক্রম নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ, প্রযুক্তি, ভাষা, সমস্যা সমাধান, নেতৃত্ব ও উদ্যোক্তা হওয়ার দক্ষতা বাড়াতে কর্মসংস্থানমুখী স্বল্পমেয়াদি কোর্স চালু করা যেতে পারে।

তিনি শিক্ষার আন্তর্জাতিকীকরণে শিক্ষার্থীদের তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ সৃষ্টি, মানসিক ও শারীরিক বিকাশে সংস্কৃতিচর্চা ও খেলাধুলার পরিসর বাড়ানো এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কার্যকর ক্যারিয়ার সেন্টার স্থাপনের পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে শিল্পখাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতা জোরদার এবং শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ ও হাতে-কলমে কাজ শেখার সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি আরও বলেন, দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক সম্ন্বিত স্তার্ট আপ ইকোসিস্টেম গড়ে তুল্বে সরকার। উচ্চশিক্ষার মানোণ্ণয়নে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উদ্ভাবন, গবেষণা ও উদ্যোক্তা তৈরির কেন্দ্র হিসেবে গড়েও তুলতা বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ইকোসিস্টেম হাব, ইঙ্কিউবেশন সেন্টার এবং সম্ন্বিত স্তার্ট আপ ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে চায় সরকার।

অনুষ্ঠানের সমাপনী দিনে (২২-০৮-২০২৬) প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন। তিনি তার ভাষণে বলেন, ‘দেশের মানহীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুজে বের করা হবে এবং সেগুলো বন্ধ করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। তিনি দেশে উচ্চশিক্ষার মান বৃদ্ধিকল্পে অচিরেই একটি পোস্ট গ্রাজুয়েট বিশ্ববিদ্যলয় প্রতিষ্ঠা করা হবে বলে জানান।

এর আগে (১৭-০৮-২০২৬) শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায় অবস্থিত বসিলার ফিরোজা বাশার আইডিয়েল স্কুল ও কলেজে ২০২৬ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছাত্রছাত্রীদের এক সংবর্ধনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে তার বক্তৃতায় বলেন, বসিলায় একটি আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে।

সর্বশেষে গত (২ সেপ্টেম্বর ২০২৬)  শিক্ষামন্ত্রী দেশে আর একটি আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষনা দিয়েছেন। সেটি হবে উত্তরবংগের বগুড়া জেলায় (দি ডেইলি ক্যাম্পাস)। সবচেয়ে কৌতুহলোদ্দীপক বিষয় হোলো – নির্বাচিত সংসদ সদস্যগণের অন্তত ১০ জন তাদের নির্বাচনী এলাকায় ১টি করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবী করেছেন চলতি অধিবেশনে (দি ডেইলি কায়ম্পাস, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬)।  প্রকৃতপক্ষে এগুলোর সবই পিসমিলভিত্তিক বিচ্ছিন্ন বক্তব্য – ঘোষিত কোন নীতি, আইন বা কমিশনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক নয়। সুতরাং এগুলোর বাস্তবায়ন কতটা নিশ্চিত তা বলা মুশকিল। আর এই বক্তব্যের মধ্যে পারস্পরিক বিরোধিতা বিদ্যমান বলে প্রতিয়মান হয়। উদাহরণতঃ অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী নূতন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন না দেয়ার জন্যে ইউ জি কে উপদেশ দিয়েছেন। অপরদিকে শিক্ষামন্ত্রী দেশে মানহীন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে পোষ্ট গ্রাজুয়েট  বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথা বলছেন। আর এক মন্ত্রী স্থান উল্লেখ করে নূতন আর একটি বিশ্ববিদ্যালয়য় স্থাপনের ঘোষনা দিয়ে দিয়েছেন।  এমনটি হতো না যদি দেশে শিক্ষা বিষয়ক একটি কমিশন কার্যকর থাকতো। কেননা, শিক্ষা বিষয়ে এ ধরণের জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ঐ কমিশনের। বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুল, মাদ্রাসা স্থাপন একটি ব্যয়বহুল বিষয়। অবশ্য ব্যক্তি উদ্যোগে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান বিদ্যমান সরকারী নীতিমালা মেনে হতেই পারে।

উপরে দেশের মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার বর্তমান অবস্থা, শিক্ষাবিষয়ক অভিভাবকদের চিন্তাভাবনা সম্পর্কে তাদের দেয়া বক্তব্যের ভিত্তিতে কিছুটা আলোকপাত করা হলো। এবারে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পর্কে আলোকপাত করা যাকঃ

জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশে শিশু অধিকার আইন, ২০১৩ সংসদে গৃহীত হয়েছে। এ আইনে নয় বছরের কম বয়সের শিশুকে গ্রেফতার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাংলাদেশে শিশুশিক্ষা অবৈতনিক ও সার্বজনীন। শিক্ষার জন্য বছরের প্রথম দিন সব ছাত্রকে বিনামূল্যে বই দেয়া হয়। প্রাথমিক শিক্ষা পর্যায়ে ৯০ শতাংশের অধিক শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। শিশুদের ব্যক্তিত্ব বিকাশে, স্বাস্থ্য ও সচেতনতা বৃদ্ধিতে এবং সামাজিক দক্ষতা অর্জনে স্কুলের একাডেমিক শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে কো-কারিকুলার শিক্ষা একান্ত প্রয়োজন।

এ পর্যায়ের শিক্ষা-প্রশিক্ষণের মধ্যে রয়েছে- ১. খেলাধুলা, ২. সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড অর্থাৎ সুর-চর্চা, নৃত্য-চর্চা, ছবি-আঁকা, শিশু-নাটক, আবৃত্তি, বক্তৃতা-উপস্থাপনা, বিতর্ক ইত্যাদি; এবং ৩. সামাজিক কর্মকাণ্ড যথা পথশিশুদের সাহায্য করা, দরিদ্রদের সহায়তা দান, শিশু সমাবেশ, শিশু পার্লামেন্ট, নিরক্ষর শিশুদের পাঠদান, ফার্স্ট এইড, বাগান করা, গাছ লাগানো, শিশু অধিকার আদায়ের জন্য সচেতনতা সৃষ্টি, ইত্যাদি।

স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তদুপরি সন্তানদের প্রাইভেট কোচিং এবং ‘এ-প্লাস’ পাওয়ার ব্যাপারে পিতা-মাতার উন্মাদনায় শিশুরা কো-কারিকুলার শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। খেলাধুলার অভাবে শারীরিক গঠনে ঘাটতি থাকছে।

অন্যদিকে সামাজিক-সাংস্কৃতিক শিক্ষার অভাবে মানস-গঠন ভীষণভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তদুপরি আধুনিক স্মার্টফোন শিশুদের মারাত্মকভাবে নেশায় ডুবিয়ে আত্মকেন্দ্রিক করে তুলছে। সব মিলিয়ে বিরাটসংখ্যক শিশু অসামাজিক রোবট হয়ে গড়ে উঠছে।

এ অবস্থায় শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে কো-কারিকুলার শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি। আগামী প্রজন্মের শারীরিক-মানসিক গঠন ও বিকাশের জন্য এটি অপরিহার্য।

জানুয়ারি, ২০০৩ সালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগমন্ত্রণালয়ে পরিবর্তিত হয়ে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়’ (Ministry of Primary and Mass Education- MOPME) এ পরিণত করা হয়। এই মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সরকারের সচিব। আর সচিবকে সহায়তা করার জন্য ২ জন যুগ্ম সচিব, ৪ জন উপ-সচিব, ১ জন উপ-প্রধান, ৯ জন সিনিয়র সহকারী সচিব বা সহকারী সচিব, ১ জন সিনিয়র সহকারী প্রধান, ২ জন সহকারী প্রধান, ১ জন পরিসংখ্যান কর্মকর্তা এবং ৫৬ জন কর্মচারী নিয়োজিত থাকেন। প্রাথমিক এবং উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার নীতিমালা প্রণয়ন, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং সার্বিক তত্ত্বাবধান করাই এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। তবে বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের জন্য গৃহীত সকল প্রকল্পই এই মন্ত্রণালয়ের অধীন PEDP-II এর অন্তর্ভুক্ত থেকে বাস্তবায়িত হচ্ছে। কিন্তু দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর অবকাঠামোগত, পরিবেশগত এবং আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি পর্যালোচনা করলে হতাশাব্যঞ্জক দৃশ্য ফুটে উঠে। বিশেষ করে শিক্ষক স্বল্পতার বিষয়টি ভয়াবহ।

২০২৬ সালের সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৬৫,৪৫৭ টি এবং  শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় প্রায় ১ কোটি। অনুমোদিত শিক্ষক পদ প্রায় ৩ লাখ ৯০ হাজার।

 

সহকারী শিক্ষকসহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে মোট শূন্য পদের সংখ্যা প্রায় ৪৩–৪৫ হাজার। এর মধ্যে শুধু প্রধান শিক্ষকেরই শূন্য পদ রয়েছে ৩৪ হাজার ১৫৯টি। অর্থাৎ দেশের অর্ধেকেরও বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বর্তমানে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। ফলে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, শিক্ষকদের সমন্বয় এবং সামগ্রিক একাডেমিক নেতৃত্বে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতি।

একই চিত্র দেখা যাচ্ছে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসাগুলোতেও। দেশে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৫১৯টি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসায় প্রায় ৩ লাখ ১০ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য অনুমোদিত শিক্ষক পদের সংখ্যা ৯ হাজার ১১৪টি হলেও কর্মরত শিক্ষক রয়েছেন ৬ হাজার ৫০০ জন। ফলে প্রায় ২ হাজার ৬০০ শিক্ষক পদ শূন্য পড়ে আছে। অর্থাৎ অনুমোদিত শিক্ষক পদের প্রায় ২৮–৩০ শতাংশই বর্তমানে খালি। শিক্ষক সংকটের এই উচ্চ হার সরাসরি পাঠদানের মান ও শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সুযোগকে ব্যাহত করছে। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ইবতেদায়ি মাদ্রাসা—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এই দীর্ঘস্থায়ী জনবল সংকট স্পষ্টতই দেখিয়ে দিচ্ছে, অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি পর্যাপ্ত ও যোগ্য শিক্ষক নিশ্চিত করাও শিক্ষাব্যবস্থার জন্য সমান জরুরি। এই সমস্যা পাশ কাটিয়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগণ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়নের জন্যে ভিন্নরূপ কথা বলছেন – যা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষক বিশেষ করে প্রধান শিক্ষকের পদ শুন্য রেখে এগুলো ছাত্রছাত্রীদের পাঠদানে কতটা সফলতা অর্জন করতে পারছেন – সে বিষয়ে সচেতন মহল উদবিঘ্ন, উৎকণ্ঠিত। প্রাথমিকের এই ঘাটতি পাঠদান আমাদের মাধ্যমিক ছাত্রছাত্রীদের উপর প্রভাব বিস্তার করছে বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের  অবস্থাও যে খুব ভাল নয় তা তো সাম্প্রতিক ফলাফল থেকেই বুঝা যাচ্ছে।

স্মর্তব্য, বৃটিশ সরকার ১৯১৭ সালে ড মাইকেল আর্নেষ্ট স্যাডলার –এর সভাপতিত্বে ‘কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন’ গঠন করেন (স্যাডলার কমিশন)। কমিশনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের  শিক্ষার গুণগত মানের ঘাটতির কারণ নিরূপণ করা। কমিশন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার ঘাটতির জন্যে দেশের ঐ সময়কার মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার ঘাটতিকে দায়ী করেন। এবং ঐ ঘাটতি পূরণে দেশের উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ প্রদান করেন। বর্তমান এস এস সি এবং এইচ এস সি কাঠামোর ঐতিহাসিক ভিত্তি অনেকাংশে স্যাডলার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতেই হয়েছিল। যেমন – মাধ্যমিকের পর দুই বছরের উচ্চমাধ্যমিক যা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয় এবং  অদ্যাবধি চলমান। বাংলাদেশে (পশ্চিমবঙ্গসহ) মাধ্যমিক ও উচচমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড স্থাপন স্যাডলার কমিশনের সুপারিশের ফল। তিন বছরের স্নাতক ডিগ্রী স্যাডলার কমিশন সুপারিশ করেছিলেন।  যা পরবর্তিতে চার বছর করা হয়। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য় স্থাপন স্যাডলার কমিশনের সুপারিশের ফল।  এত কথা বলার উদ্দেশ্য হলো – বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাল ফল পেতে হলে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক কে অবহেলা করে তা কখনও সম্ভব নয়। সেই সাথে প্রাথমিক কে অবহেলা করে মাধ্যমিকে সুফল আশা করা বৃথা। তাই শিক্ষায় সুফল পেতে হলে শিক্ষার প্রতিটি স্তরকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। এবং এই গুরুত্বের বিষয়টি নির্ধারণ করা কোন মন্ত্রীর কাজ নয়। একটি বিজ্ঞ কমিশনের কাজ। মন্ত্রণালয় এবং বিভাগের কাজ হচ্ছে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করা।

 

 

 

গুণগত শিক্ষা ও উন্নয়ন অংশীদারদের প্রত্যাশা

মনে রাখা দরকার, বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে সর্বজনীন  অন্তর্ভুক্তিমূলক  গুণগত শিক্ষা বাস্তবায়নে আঙ্গীকারাবদ্ধ। সহস্রাব্দ বাস্তবায়ন লক্ষ্যমাত্রা (এম ডি জি ২০০০-২০১৪) বাস্তবায়নে সরকার কাজ করেছে। কিন্তু এম ডি জি আশানুরূভাবে সফল হয় নি। অতপর ২০১৫–২০৩০ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়নযোগ্য টেক- সই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্র (এস জি ডি) বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে চলছে। বলা দরকার এস জি ডি’র লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হলে ২০২৬ (করোনার জন্যে প্রাপ্ত গ্রেস ২০২৭ সাল পর্যন্ত) সাল নাগাদ বাংলাদেশের উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের সনদ পাওয়া দুষ্কর হয়ে উঠতে পারে। সে জন্যে এস ডি জি’র লক্ষ্যমাত্রা ৪ -এ প্রদত্ত সকল লক্ষ্য অর্জনের জন্যে আমাদের সচেষ্ট হতে হবে। এস জি ডি’র লক্ষ্যমাত্রা – ৪ অর্জন করতে হলে বিশেষজ্ঞদের মত হলোঃ ১. মানসম্মত শিক্ষকের সংখ্যা বাড়াতে হবে; ২. যুগোপযোগী শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করতে হবে; ৩.  মানসম্মত বই ও শিখন সামগ্রী সরবরাহ ও ব্যবহার করতে হবে; ৪. শিখন-শেখানো পদ্ধতির ও কৌশলের কার্যকর ব্যবহার; ৫.  নিরাপদ ও সহযোগিতামূলক শিখন পরিবেশ নিশ্চিত; ৬.  উপযুক্ত মূল্যায়ন ব্যবস্থা; ৭.  প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মকর্তার ও কর্মচারীর সুসম্পর্ক; ৮.  শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নের জন্যে প্রয়োজনীয় সুযোগসুবিধা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা; ৯.  শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সুবিধা বৃদ্ধি করাসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজ ও সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের যে দাবী আজ আমরা এখানে তুলছি তার মূল প্রতিপাদ্য এস ডি জি’র লক্ষ্যমাত্রা ৪ –এ মোটামুটিভাবে বিধৃত হয়েছে। আমাদের দাবী - গুণগত ও মানসম্মত শিক্ষা বাস্তবায়নের এ সকল উপাদান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকারকে অবশ্যই কার্যকর প্রাধিকারভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

এজন্যে শিক্ষা বিষয়ে যে কোন সংস্কার, পরিবর্তন, পরিমার্জন, সংযোজন, বিয়োজন, যাই হোক না কেন সকল বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ প্রদানের জন্যে অভিজ্ঞ, দেশপ্রেমিক, নিঃস্বার্থ ব্যক্তিদের নিয়ে একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন থাকা উচিত। তাদের পরামর্শ ছাড়া দেশে কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হবেনা, শিক্ষাক্রমে কোনকিছু সংযোজন বিয়োজন হবে না। উপরে উল্লেখিত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের যে পরস্পর বিরোধী বক্তবের উদাহরণ দেয়া হলো দেশে স্থায়ী শিক্ষা কমিশন থাকলে তা কখনও হতে পারতো না। তাই বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের লক্ষ্যে একটি স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠন এখন সময়ের দাবী। 

লেখক: উপদেষ্টা, গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান বিভাগ ও প্রক্টর, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এবং প্রাক্তন পরিচালক, বাংলাদেশ লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিপিএটিসি)
ই-মেইলঃ amatin@aub.ac.bd