২৯ আগস্ট ২০২৬, ২২:৩৯

তারুণ্যের মেধা, সমতা ও মূল্যবোধ: উচ্চশিক্ষায় নতুন প্রত্যয়

মাহবুব নাহিদ   © টিডিসি সম্পাদিত

শিক্ষা কোনো স্থবির বিষয় নয়; সময়ের চাহিদায় এটি নিত্য রূপান্তরশীল এবং একটি জাতির অগ্রযাত্রার প্রধানতম বাতিঘর। দীর্ঘ বৈষম্য ও অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে রক্তস্নাত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশে আজ উচ্চশিক্ষা খাতকে সামগ্রিকভাবে পুনর্গঠন করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। বর্তমান সরকারের এই শিক্ষা-পরিকল্পনা কোনো তাৎক্ষণিক ভাবনা নয়, বরং এটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বহু বছরের সুদূরপ্রসারী চিন্তা ও গভীর রূপকল্পের সুস্পষ্ট প্রতিফলন। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দূরদর্শী ‘ভিশন-২০৩০’, রাষ্ট্র মেরামতের ঐতিহাসিক ‘২৭ দফা’ ও ‘৩১ দফা’ রূপরেখা এবং নির্বাচনি ইশতেহারের মৌলিক দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই আজকের এই আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়াস চলছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আদর্শকে ধারণ করে নিরপেক্ষতা, সমতা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে উচ্চশিক্ষার গুণগত রূপান্তর নিশ্চিত করাই এই জাতীয় রূপকল্পের মূল সুর।

উচ্চশিক্ষার এই নতুন ভাবনায় দুটি মৌলিক স্তম্ভকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, সুনাগরিকের মানবিক মূল্যবোধ বিকাশ এবং বাস্তবমুখী দক্ষতা উন্নয়ন। শিক্ষাকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক সনদ অর্জনের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রিধারী একজন তরুণের মধ্যে গভীর সামাজিক দায়বদ্ধতা, সুনাগরিকের গুণাবলি ও নীতি-নৈতিকতা জাগ্রত করাই মূল লক্ষ্য। একই সাথে তরুণদের আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ ও কর্মক্ষম করে গড়ে তোলা হচ্ছে, যাতে তাঁরা কেবল সরকারি বা বেসরকারি চাকরির প্রত্যাশী না হয়ে আধুনিক উদ্ভাবনী চিন্তা নিয়ে নিজেরাই উদ্যোক্তা হয়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেন।

একটি বৈষম্যহীন ও সমতাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের প্রধান শর্ত শিক্ষা ক্ষেত্রে সমান সুযোগ সৃষ্টি করা। দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারীকে উচ্চশিক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দিতে স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অতীতে দেশনেত্রীর হাত ধরে প্রবর্তিত নারী শিক্ষার যে পথচলা দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছিল, তাকে স্নাতক পর্যন্ত উন্নীত করার মাধ্যমে নারীদের উচ্চশিক্ষার ভিত্তি আরও সুদৃঢ় করা হলো। এর পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও মেধার ভিত্তিতে ছাত্রীদের জন্য উপবৃত্তির সুযোগ বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সমকালীন বৈশ্বিক বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে পাঠ্যক্রমকে প্রতিনিয়ত আধুনিকায়ন ও পরিমার্জন করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। পাঠ্যক্রমের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যই হলো নিয়মিত সংযোজন ও বিয়োজন। এর অংশ হিসেবে মূল ডিগ্রির পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের তিন মাসের ব্যবহারিক মাইক্রো-কোর্স যেমন ডিজিটাল সাক্ষরতা, ফ্রিল্যান্সিং ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার সমান্তরালে আত্মকর্মসংস্থানের পথ তৈরি করতে পারেন। এর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পর্যায়ক্রমে বাংলা ও ইংরেজির বাইরে দুই থেকে তিনটি বিদেশি ভাষা শিক্ষার কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এই বহুভাষিক দক্ষতা আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা, বিদেশে মর্যাদাপূর্ণ কর্মসংস্থান এবং দেশে বসেই বৈশ্বিক বিপিও সেবা দেওয়ার এক বিশাল ক্ষেত্র উন্মোচন করবে।

কেবল পাঠ্যপুস্তকীয় শিক্ষায় সীমাবদ্ধ না রেখে তরুণদের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার বিকাশে শিক্ষা কাঠামোর সাথে সংস্কৃতি এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের নিবিড় সমন্বয় ঘটানো হচ্ছে। ক্রীড়া ও সংস্কৃতির শক্তিতে তরুণদের উজ্জীবিত করতে এবং রাজধানী থেকে শুরু করে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত সব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের একই মঞ্চে তুলে আনতে বছরজুড়ে আন্ত ও আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক উৎসব, বিতর্ক ও বিজ্ঞান ক্লাবের কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। একই সাথে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বগুণ ও সেবামূলক মানসিকতা তৈরিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিএনসিসি, স্কাউট ও গার্ল গাইডের মতো কার্যক্রম পুরোদমে সক্রিয় রাখার সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর তারুণ্যের জনসংখ্যাতাত্ত্বিক লভ্যাংশ। এই অমিত সম্ভাবনাকে কার্যকর জনসম্পদে পরিণত করতে ক্যাম্পাসের ভেতরেই শিক্ষার্থীদের জন্য খণ্ডকালীন কাজের প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ সৃষ্টির রূপরেখা তৈরি হচ্ছে। এছাড়া অতিরিক্ত ব্যয় ছাড়াই প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বের মাধ্যমে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যারিয়ার সেন্টার স্থাপন করে মানসম্মত জীবনবৃত্তান্ত তৈরি ও সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতির সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। একই সাথে প্রাঙ্গণে নিয়মিত ও বিনামূল্যে চাকরির মেলা আয়োজনের মাধ্যমে স্বনামধন্য শিল্পখাত ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে কার্যকর সেতুবন্ধন রচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

শিক্ষার মানোন্নয়ন ও বিশ্বমানের গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে তোলা এই শিক্ষা-রূপকল্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। মেধা পাচার রোধে সরকার একে মেধার আদান-প্রদান বা ‘ব্রেন সার্কুলেশন’-এ রূপান্তরের বাস্তবমুখী নীতি গ্রহণ করেছে। বিদেশে কর্মরত প্রখ্যাত গবেষক ও প্রবাসী শিক্ষাবিদদের অতিথি শিক্ষক হিসেবে বছরে দুই থেকে ছয় মাস দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে যুক্ত করে সরাসরি পাঠদান ও গবেষণার মান উন্নত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দেশে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার ও জার্নাল সুবিধা নিশ্চিতকরণ, সামার স্কুল সংস্কৃতি চালু এবং দেশ-বিদেশের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্রেডিট স্থানান্তর ব্যবস্থা সহজ করার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিংয়ে দৃশ্যমানভাবে এগিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হচ্ছে।

উচ্চশিক্ষার এই গুণগত রূপান্তর ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সংখ্যার চেয়ে শিক্ষার গুণগত মানের ওপর জোর দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রতিটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বাস্তবতায় নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দিতে সরকার বদ্ধপরিকর। দেশপ্রেম, তারুণ্যের মেধা এবং দূরদর্শী রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনার এই সমন্বিত প্রয়াস বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ অচিরেই বিশ্বমঞ্চে এক আত্মমর্যাদাশীল, বৈষম্যহীন ও জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক