বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে জাতীয় ক্যালেন্ডার এখন সময়ের দাবি
শিক্ষার্থীদের মূল্যবান সময় সাশ্রয় এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষা ক্যালেন্ডারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে ২০২৭ সালের এসএসসি ও সমমান এবং এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার সময়সূচি এগিয়ে এনেছে সরকার। আগামী ৭ জানুয়ারি থেকে এসএসসি এবং ৬ জুন থেকে এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হবে। শিক্ষার্থীদের সময়ের মূল্য বিবেচনায় নেওয়ার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ। এখন একই দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কার্যক্রমেও প্রয়োজন।
এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর শুরু হয় উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের নতুন অধ্যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে ভর্তি বিজ্ঞপ্তি, আবেদন, পরীক্ষা, ফল প্রকাশ, বিষয় নির্বাচন, মাইগ্রেশন ও চূড়ান্ত ভর্তির সময় আলাদা। ফলে পুরো প্রক্রিয়া দীর্ঘ হয়। শিক্ষার্থীদের অপেক্ষা করতে হয়। সময় ও অর্থও ব্যয় হয়।
বিষয়টি নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গত ২৬ এপ্রিল ইউজিসি ভবনে বিশ্ব মেধাস্বত্ব দিবসের অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি পরীক্ষা সমন্বয়ের জন্য ইউজিসির প্রতি আহ্বান জানান। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ভর্তি পরীক্ষার সময় নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি। শিক্ষার্থীদের মূল্যবান সময় যাতে অযথা নষ্ট না হয়, তাঁর বক্তব্যে সেটিই গুরুত্ব পেয়েছে।
এই ভাবনাকে একটি বাস্তব কাঠামো দেওয়া প্রয়োজন। এর একটি কার্যকর পথ হতে পারে জাতীয় ভর্তি ক্যালেন্ডার। জাতীয় ভর্তি ক্যালেন্ডারের অর্থ সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা একই দিনে নেওয়া নয়। বরং পুরো ভর্তি প্রক্রিয়ার জন্য একটি বাস্তবসম্মত সময়সীমা নির্ধারণ করা।
এইচএসসি ফল প্রকাশের পর কখন ভর্তি বিজ্ঞপ্তি হবে, কখন আবেদন শেষ হবে, কোন সময়ের মধ্যে ভর্তি পরীক্ষা হবে, কখন ফল প্রকাশ হবে এবং কখন চূড়ান্ত ভর্তি শেষ হবে—এসবের একটি জাতীয় সময়রেখা থাকতে পারে। এরপর নির্দিষ্ট সময়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা যেতে পারে।
চলতি বছরের অভিজ্ঞতা এ প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করেছে। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে জিএসটি গুচ্ছের ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয় ডিসেম্বর মাসে। পরে ভর্তি পরীক্ষা, ফল প্রকাশ, পছন্দক্রম ও ভর্তি কার্যক্রমের বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন হয়। কৃষি গুচ্ছের ভর্তি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয় নভেম্বর মাসে। ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় জানুয়ারিতে। এরপর চলে ফল, মেধাতালিকা, পছন্দক্রম ও ভর্তির বিভিন্ন ধাপ।
বিভিন্ন গণমাধ্যমের জুলাই ও আগস্ট মাসে জিএসটি ও কৃষি গুচ্ছভুক্ত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু এবং নবীনবরণ অনুষ্ঠানের খবর প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ ভর্তি কার্যক্রম শুরু থেকে নতুন শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে যেতে অনেক ক্ষেত্রে প্রায় ৯ থেকে ১০ মাস সময় লেগে যাচ্ছে।
এখানে শুধু ভর্তি পরীক্ষার সময়কে দায়ী করলে বিষয়টি পুরোপুরি বোঝা যাবে না। ফল প্রকাশ, পছন্দক্রম, মাইগ্রেশন ও চূড়ান্ত ভর্তি শেষ করতেও সময় লাগে। তাই ভর্তি পরীক্ষা দ্রুত আয়োজনের পাশাপাশি পুরো প্রক্রিয়াকে সময়ের মধ্যে আনা জরুরি। জাতীয় ভর্তি ক্যালেন্ডারে এ কারণেই শুধু পরীক্ষার তারিখ থাকলে হবে না। শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর তারিখও এর অংশ হতে হবে। তাহলে ভর্তি প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকবে।
এ ক্ষেত্রে গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার প্রায় সাত বছরের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। এই অভিজ্ঞতা এখন তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা দরকার। কত শিক্ষার্থী এতে অংশ নিয়েছেন, সময় ও ব্যয় কতটা কমেছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অভিজ্ঞতা কী এবং ভর্তি থেকে ক্লাস শুরু পর্যন্ত সময় কতটা কমানো গেছে—এসব বিষয় দেখা প্রয়োজন।
এই মূল্যায়নের উদ্দেশ্য কোনো ব্যবস্থা নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা নয়। বরং কোথায় ভালো ফল পাওয়া গেছে এবং কোথায় আরও সমন্বয় প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করা। প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে গুচ্ছ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার সুযোগ বিবেচনা করা যেতে পারে। বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব ভর্তি পরীক্ষারও একাডেমিক বাস্তবতা রয়েছে। সেটি পরিবর্তন করাই মূল বিষয় নয়। বরং এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার সময়সূচি কীভাবে জাতীয় সময়রেখার সঙ্গে সমন্বয় করা যায়, সেটি বিবেচনা করা যেতে পারে।
এ জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি, পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে আলোচনা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নিয়ে প্রথমে একটি পরীক্ষামূলক জাতীয় ভর্তি ক্যালেন্ডার করা যেতে পারে। অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরবর্তী বছরগুলোতে তা পরিমার্জন করা সম্ভব।
ইউজিসি এ ক্ষেত্রে সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে একটি বাস্তবসম্মত সময়সূচি তৈরিতে সহায়তা করা যেতে পারে। এতে সিদ্ধান্ত হবে অংশীজনভিত্তিক।
জাতীয় ভর্তি ক্যালেন্ডারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ক্যালেন্ডার। ভর্তি শেষ হওয়ার পর দীর্ঘ অপেক্ষা না রেখে নির্দিষ্ট সময়ে ক্লাস শুরু করা দরকার। একই সময়ে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর বিষয়টিও ভবিষ্যতে বিবেচনা করা যেতে পারে।
এতে শিক্ষার্থীরা আগে থেকেই জানতে পারবেন কখন তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শুরু হবে। অভিভাবকদের অনিশ্চয়তা কমবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও একাডেমিক কার্যক্রম পরিকল্পিতভাবে পরিচালনা করতে পারবে। বিষয়টি উচ্চশিক্ষার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সঙ্গেও যুক্ত করা যায়। ইউজিসির পাঁচ বছর মেয়াদি উচ্চশিক্ষা রূপান্তর কৌশলে ভর্তি কার্যক্রমকে সময়বদ্ধ করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এতে উদ্যোগটি এককালীন না হয়ে ধারাবাহিক নীতির অংশ হবে।
এখানে তরুণদের দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কয়েক মাস পিছিয়ে গেলে স্নাতক শিক্ষা শেষ করতেও সময় বাড়ে। কর্মজীবনে প্রবেশও পিছিয়ে যেতে পারে। তাই ভর্তি প্রক্রিয়ার সময় কমানো মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
প্রথম ধাপে তাই বড় কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা বোর্ডগুলো বসে একটি জাতীয় সময়সীমা নির্ধারণ করতে পারে। আগামী শিক্ষাবর্ষে সেটি পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে। বছর শেষে অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করে পরবর্তী বছরের ক্যালেন্ডার আরও কার্যকর করা সম্ভব।
এটি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাতন্ত্র্য কমানোর উদ্যোগ নয়। বরং সমন্বয়ের একটি কাঠামো। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেই এতে অংশ নিতে পারে।
গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষার অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভর্তি কার্যক্রমে সময়সূচিগত সমন্বয় এবং জাতীয় ভর্তি ক্যালেন্ডার—এই তিনটি বিষয়কে একই নীতির অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
সরকার শিক্ষার্থীদের সময় সাশ্রয়ের জন্য এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সময়সূচি পুনর্বিন্যাস করেছে। সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সময়ও কমানো দরকার।
কাজেই- পরীক্ষা থেকে ভর্তি, ভর্তি থেকে ক্লাস—পুরো প্রক্রিয়ার একটি সুস্পষ্ট সময়রেখা থাকা দরকার। শিক্ষার্থীদের সময়ের মূল্য আছে। সেই সময়ের মূল্য রাষ্ট্রের কাছেও থাকা উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে জাতীয় ক্যালেন্ডার তাই এখন সময়ের দাবি।
লেখক: সিনিয়র সহকারী পরিচালক, ইউজিসি